পর্যবেক্ষণ

ঝরে গেল অসংখ্য প্রাণ

প্রকাশ : ২০ জুন ২০১৭, ০০:০০

মো. ওসমান গণি

প্রতি বছর বর্ষাকাল এলেই আমাদের দেশে পাহাড়ধসে মানুষের মৃত্যু একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। যেন দেখার কেউ নেই। যখন মানুষ মরে তখন কয়েক দিন খুব হইচই থাকে। অথচ যখন সমাজের রাঘববোয়ালরা পাহাড় কাটার উৎসবে মেতে ওঠে তখন কেউ রা করে না। তখন সংশ্লিষ্ট মহল কোথায় থাকে? পাহাড় কাটার সচিত্র সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার হলেও প্রশাসনের কর্তাবাবুরা তখন কোনো ব্যবস্থা নেন না। তাহলে মানুষ মারা গেলে কেন এত আফসোস? পাহাড় কাটার আগে যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো তাহলে এ ধরনের ঘটনা ঘটত না, এত লোকের জীবনও শেষ হতো না। পাহাড় নেই পাহাড়ের জায়গায়। একেকটি পাহাড়-টিলা ছয় মাস, এক বছর, দুই বছরের ব্যবধানে ‘সমতল’ হয়ে যাচ্ছে।

পাহাড় হচ্ছে ভূমির ‘পিলার’। সে বাস্তবতায় পাহাড় ভূমিকে রক্ষা করে। বাংলাদেশে পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বাক্যটি আইনে আছে, প্রয়োগে নেই! পাহাড়কে ঘিরে অহরহ চলছে দখল-বেদখলের ভয়ানক খেলা। অবাধে কেটে-খুঁড়ে খাওয়া হচ্ছে পাহাড়ের হৃৎপি-। এর পেছনে বরারবই বুক ফুলিয়ে তৎপর ভূমিদস্যু চক্র। ওরা থাকে সবসময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ নির্বিকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ? আর এমনিভাবেই দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত বন্দর নগরী বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত সবার চোখের সামনেই পাহাড়-টিলার ধ্বংসলীলা চলছে। পাহাড়, বনভূমি সাগর ও সবুজ উপত্যকায় গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম অঞ্চলটি হচ্ছে প্রকৃতির সুনিপুণ হাতে গড়া, যাকে বলা হয় ‘প্রাচ্যের রানী’। কিন্তু তার অনেকটাই এখন মলিন ও লুপ্তপ্রায়। এ ধরনের বিরল ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অঞ্চলকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘পরিবেশ-প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল)’ হিসেবে সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশে সেই উদ্যোগ অনুপস্থিত। ব্রিটিশ আমলে দেড়শ’ বছর পূর্বে বন্দরনগরীর কেন্দ্রস্থলে প্রতিষ্ঠিত চিটাগাং ক্লাবের পাহাড় সুরক্ষায় চা বাগান ও বন সৃজন করা হয়। নগরীর টাইগার পাস পাহাড়ের গভীর বনে তখন বাঘ দৌড়ে বেড়াত। চট্টগ্রামের এসব পাহাড়ের চিহ্ন আজ মুছে যেতে বসেছে। শুধু চট্টগ্রাম নয়, পাহাড়, টিলা, পাহাড়ের উপত্যকাসমূহ একের পর এক নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে সিলেট, মৌলভীবাজার এবং কুমিল্লায়ও। আগ্রাসী ভূমিদস্যুরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দিনে এনে দিনে খাওয়া ছিন্নমূল নিরীহ গরিব মানুষকে ঠেলে দিয়েছে, ন্যাড়া ও কেটে-খুঁড়ে দীর্ণ-বিদীর্ণ নাজুক হয়ে থাকা পাহাড়-টিলার গায়ে কিংবা পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসের মধ্যেই। বিনিময়ে ‘ভাড়া’ আর ‘চাঁদা’র নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তার ভাগ চলে যাচ্ছে অসৎশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের পকেটে। মাঝেমধ্যে বিশেষত বর্ষা মৌসুম এলে কোথাও কোনো পাহাড়-টিলা ধসে গিয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটলে কিছুদিন চলে হইচই দৌড়ঝাঁপ। তারপর আবার সবকিছু জাদুর কলকাঠির জোরে ‘ম্যানেজ’ হয়ে যায়। কোনো ‘সমস্যা’ হয় না পাহাড়খেকো ভূমিদস্যুদের। চট্টগ্রাম অঞ্চলে নির্বিচারে পাহাড়-টিলাগুলোকে বিক্ষত-বিক্ষত করে ফেলা হয়েছে। এর জন্য সরাসরি দায়ী অতিলোভী ও অপরিণামদর্শী একশ্রেণির মানুষের ধ্বংসের কালোহাত। কেননা একটি পাহাড় বা টিলার স্বাভাবিক ‘ভূমিরূপ’ বা গঠন বৈশিষ্ট্য কেটে-খুঁড়ে পরিবর্তন করা হলেই সেখানে পরিবেশগত ভারসাম্য বিপন্ন হয়ে পড়ে। আর সেই ধ্বংসলীলার কারণেই ভারসাম্যহীন পাহাড় তথা প্রকৃতি তার আপন নিয়মের ধারায় উল্টো প্রতিশোধে নিচ্ছে। নির্মম হলেও পাহাড়ধস, ভূমিধস তার অন্যতম এবং স্বাভাবিক নজির। তা আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্র ও বেসরকারি সংস্থা সূত্রমতে, বন্দর নগরীসহ সমগ্র বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বর্তমানে একশ’রও বেশি পাহাড়ে অন্তত ১৮ লাখ মানুষ বিপজ্জনক অবস্থায় বসবাস করছে। যাদের বেশিরভাগই নিম্নআয়ের ছিন্নমূল মানুষ। তারা অধিকাংশই জানে না পাহাড়-টিলা ধ্বংস করে কৃত্রিমভাবে সমতল করা হলেও তা মনুষ্য বসতির ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এমনকি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এতে করেই জরাজীর্ণ ও বিদীর্ণ করে দেওয়া পাহাড়ের কোলে নেমে আসছে ভয়াবহ বিপর্যয়। সম্প্রতি পার্বত্য এলাকায় তেমনই বিপর্যয়ের শিকার হয়ে ঝরে গেল অসংখ্য প্রাণ।

পাহাড় বা প্রকৃতিকে ‘প্রাকৃতিক’ থাকতে না দিয়ে ধ্বংস করে দিলে সে তো প্রতিশোধ নেবেই। পাহাড়কে তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী রক্ষা করতেই হবে। এর জন্য সব সরকারি দফতরের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। আমাদের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। তাছাড়া পাহাড় কেটে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসরত নিম্নআয়ের মানুষদের বিপদ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। এর দায় আমাদের সবার। পরিবেশ আইনে পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদ-, এক কোটি টাকা অর্থদ-, পাহাড় কাটলে হাতেনাতে আটক যন্ত্র-সামগ্রী জব্দ, নিষেধাজ্ঞা, পাহাড়কে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিধি-বিধান রয়েছে। তবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে সীমিত ও পরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটার সুযোগ রয়েছে। আর সেই সুবাদে পাহাড়খেকো ভূমিগ্রাসীরা কাটছে পাহাড়।

পাহাড়-পর্বতকে তাদের মতোই ‘প্রাকৃতিক’ থাকতে দিতে হবে। ধ্বংস নয়, পাহাড়গুলোর পরিকল্পিত সুরক্ষা জরুরি। সরকারি-বেসরকারি সব মহলকে মিলিতভাবে সেই উদ্যোগ গ্রহণে এগিয়ে আসতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্বত সংস্থার (ইসিমোড) সদর দফতর বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ নেপালের কাঠমান্ডুতে। এ সংস্থা সদস্যভুক্ত দেশসমূহের পাহাড়-পর্বতমালার পরিবেশ-প্রতিবেশ সুরক্ষা, উন্নয়ন, পাহাড়ের বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নয়নে সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপখাইয়ে চলার দিকনির্দেশনা ইত্যাদি বিষয়ে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বিনিময়কে অগ্রাধিকারমূলক বিবেচনায় নিয়ে কাজ করে থাকে। পাহাড়-পর্বত ও টিলারাশি সুরক্ষায় এমনকি উন্নয়নে বিশ্বে অতুলনীয় এক নজির স্থাপন করেছে ‘পাহাড়-পর্বতের দেশ’ ও ‘হিমালয় কন্যা’খ্যাত নেপাল। দেশটিতে পাহাড় রক্ষা সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়ে থাকে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের প্রচুর মৌসুমি ফল-ফসল, ক্ষেত-খামার এবং বনায়ন করা হয়েছে। যে কারণে সে জায়গার মাটি আলগা হচ্ছে না বা সরছে না। বরং মাটিক্ষয় কার্যকরভাবে রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। উত্তাপ অতিক্রম করে বৃষ্টির পানি নিচের দিকে অপসসারণ হচ্ছে। সল্টের কারণে পাহাড় রক্ষার পাশাপাশি এর সুফল ভোগ করছে প্রান্তিক জনগণ তথা কৃষক। সল্টের সফল অভিজ্ঞতায় নেপালে বর্ষায় পাহাড় ধসের ঘটনা নেই বললেই চলে। পাহাড় বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালে পাহাড় সুরক্ষার কৌশল বাংলাদেশের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। এর ফলে পাহাড় ও পাহাড়ি উঁচু-নিচু ভূমি সংরক্ষণ সহজতর হবে। আমরা নেপালের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামেও দেখেছি, পাহাড়-পর্বতের ভূ-গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে খাপখায় এমনভাবেই উপজাতীয় জনগোষ্ঠী তাদের ঘরবাড়ি নির্মাণ করে থাকে। যা মূলত কাঠ ও বাঁশের তৈরি যথেষ্ট হালকা কাঠামো দ্বারা তৈরি। আবার তা হয় টং ঘরের আদলে। ফলে ঝড়-বর্ষায়ও এসব ঘর টেকসই এবং নিরাপদ। এগুলো ধসে পড়ে না। কিন্তু ব্যতিক্রম বাদ দিলে কোথাও ঝড়-বর্ষায় কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বাড়িঘর ধসের কথা শোনা যায় না। তারা নিজেদের লাগসই ও টেকসই কৌশলে বসতি তৈরি করে। কিন্তু পাহাড় কেটে ভারসাম্যহীন অবস্থায়নির্মিত ভারী কাঠামোর অনিরাপদ বাড়িঘর ধসে গিয়ে বিপদের আশঙ্কাই থেকে যায়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Email : ganipress@yahoo.com

"