প্রকৃতির প্রতিশোধ

মানুষের লোভ-পাহাড়ের ক্ষোভ

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৭, ০০:০০

এস এম মুকুল

প্রাকৃতিক দুর্যোগে সম্প্রতি দেশে ঘটে গেছে বিপর্যয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ভারী বর্ষণ ও পাহাড় ধসের ঘটনায় ১৫৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এতে দেশব্যাপী শোকের ছায়া নেমে আসে। এই নির্মমতা প্রকৃতির প্রতিশোধ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আর এজন্য কেবল মানুষই দায়ী। কারণ প্রকৃতিরও একটা নিয়ম আছে। সে আঘাত সইতে সইতে একসময় হুঙ্কার দিয়ে গর্জে ওঠে, ভয়ংকর প্রতিশোধ নেয়। আমরা জানি, পাহাড় হচ্ছে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষাকারী পিলার। পবিত্র কোরআনে পাহাড়কে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষাকারী ‘পেরেক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরাও স্বীকার করে নিয়েছেন যে, পাহাড় হলো পৃথিবীর ‘পিলার। তাই পাহাড় প্রকৃতিকে তার মতো থাকতে না দিলে প্রতিশোধ সে নেবেই। এই প্রতিশোধ কেবল পাহাড় ধস, ভূমিধস নয় এর ভয়াবহতা আরো ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কারণ মানুষ তার সীমাহীন লোভ ও লাভের লালসায় পাগলপারা হয়ে অকাতরে পরিবেশ নষ্ট করছে। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন এসব ঘটনা কি সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টির আড়ালে হচ্ছে? নিশ্চয়ই নয়। পাহাড় কেটে বসতি, আবাসন, কটেজ বাণিজ্য এমনকি খামারও করা হচ্ছে। এসব কাজ হঠাৎ করে লোকচক্ষুর অন্তরালে করা সম্ভব নয়। প্রশাসন জেনেও কেন নিশ্চুপ থাকছে। বন পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ আইন এবং আমাদের পরিবেশবাদী সংগঠনের নজরের বাইরে কিছুই হচ্ছে না। তার মানে যারা করছেন তারা সরকার যন্ত্রের চেয়েও ক্ষমতাধর। স্থানীয় প্রশাসন কি তাদের কাছে নিতান্তই অসহায়? তথ্য-তালাশে জানা গেছে, চট্টগ্রামের জনৈক জনপ্রিয় বিরোধীদলীয় নেতা পাহাড় কেটে খামার তৈরি করেছেন। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সে দলের বলয়ে বড় বড় নেতাসহ সাঙ্গোপাঙ্গরা প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এসব অপকর্ম করে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিনষ্ট করছেন। আর তার খেসারত দিচ্ছে হতদরিদ্র সাধারণ মানুষ।

নির্মম বাস্তবতা হলো পাহাড় নেই পাহাড়ের জায়গায়। পাহাড়ের উপত্যকা নেই, টিলা নেই। অতিবৃষ্টিজনিত পাহাড়ি ঢল ছাড়াও পাহাড় কেটে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন ও গাছপালা উজাড় করার কারণে ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেই চলেছে। পাহাড় ধসে কেবল মানুষের প্রাণহানি ঘটছে যে তা নয়-পাহাড় কাটা, গাছ কাটা, জঙ্গল উজাড় করা, বৃষ্টিতে পাহাড় ক্ষয়ে পানির ঢল নামার কারণে নদীর পানি ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। কাটা পাহাড়ের মাটি ও বালি নেমে এসে ভরাট হচ্ছে নালা-নর্দমা-খাল। রাস্তা নির্মাণে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বিবেচনা না করা, পর্যটনের জন্য কটেজ, সরকারি বেসরকারি অফিস, এমনকি খামার ও কারখানাও তৈরি হয়েছে এই পাহাড়ে। কিন্তু এই পাহাড় থাকার কথা শুধুই গাছপালার বনবনানী, পশুপাখি, ফলমূল, ভেষজ অরণ্য-উদ্যান। তার চেয়েও দুঃখের ব্যাপারটি হলো-পাহাড়িরা পাহাড় থেকে বিতাড়িত হয়েছে। অথচ তারাই ছিল পাহাড়ের প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই জীবনধারণে অভ্যস্ত। এখন তাদের সরিয়ে দখলবাজরা গাছ লাগিয়ে লিজের নামে দখল প্রতিষ্ঠা করেছে। পাহাড়খাদকরা বাঁচার আশা দিয়ে সমতলের উদ্বাস্তুদের পাহাড়ে বসতির সুযোগ নিয়ে বাণিজ্য করছে। কিন্তু সমতলের বাঙালিরা তো পাহাড়ে জীবনযাপনের কায়দা-কানুন জানে না। তারা কি মাটি আর পাহাড়ের আচরণবিধি বুঝতে না পারার কারণে বা পাহাড়ের ভাষার সঙ্গে নিজেদেরও মানিয়ে নেওয়ার আগেই এসব প্রাণবিধ্বংসী দুর্ঘটনা ঘটছে। আমাদের বাংলাদেশে প্রায় ২৬ ভাষাভাষীর ৪৫ জাতিসত্তার প্রায় এক মিলিয়ন ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী রয়েছে। এদের মধ্যে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মনিপুরি, কুকি, রাখাইন, গারো, সাঁওতাল, হাজং, বম ও ত্রিপুরা জাতি রয়েছে। বংশানুক্রমে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর লোকেরা পাহাড়ি এলাকাতে বসবাস করে আসছিল। পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে এদের জীবন, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতির মিলমিশ রয়েছে। কারণ তাদের জন্ম ও জীবন প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা। পাহাড় তাদের কাছেই বরং নিরাপদ ছিল।

ভাবতে অবাক লাগে প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধভাবে পাহাড়ে বসতি গড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ভাড়া দিচ্ছে প্রভাবশালী চক্র। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ঘর বানানো থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংযোগ দিয়েও পাহাড়ে বসবাসকারীদেরও নিয়ন্ত্রণ করছে। উল্টো রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবে পাহাড় দখলমুক্ত করতে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। পাহাড়ি এলাকা নির্বিচারে কেটে বনজঙ্গল ধ্বংস করা হচ্ছে। পাহাড় কেটে সমতল বসতি স্থাপন করা হচ্ছে। এসব বিধ্বংসী কার্যকলাপের ফলে পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ বন্ধন শক্তি অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়ছে। মূলত এই দুর্বলতার কারণেই বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বান্দরবানসহ অন্যান্য পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় ধসে পড়ছে; ঘটছে প্রাণহানি এবং অনেক ক্ষয়ক্ষতি। ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে এই ক্ষতিটি শেষ ক্ষতি নয়-এটি মানবসমাজের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সূত্রপাত মাত্র। কেননা পাহাড়, সাগর, ও সমতল এগুলো প্রকৃতির সৃষ্টি। মানুষ চাইলেও পাহাড় তৈরি করে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে না। কারণ এটি মহান আল্লাহতায়ালার অপরিসীম মহিমার সৃষ্টি-যা কেবল তিনিই জানেন কিভাবে মাটি, পানি, পাহাড় আর আকাশের ভারসাম্য ঠিক থাকবে। মোটকথা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পাহাড় ব্যবস্থাপনায় যে ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা আমাদের কাজ ছিল, আমরা তা করতে পারিনি। মানুষের লোভের লালসায় মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে পাহাড়ের অপব্যবহারের কারণে আজ ক্ষুব্ধ হয়ে মানবজাতির ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে পাহাড় প্রকৃতি। যদিও পাহাড়ধস শুধু বাংলাদেশের একক দুর্যোগ নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তথা কানাডা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, তাজিকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাহাড় ধসের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৯৯ সালে ভেনিজুয়েলাতে মাটিধসে প্রায় দশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ২০১১ সালে ব্রাজিলের রিওডি জেনিরোতে ভূমি ধসে ৬১০ জনের মৃত্যু হয়। আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে-দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত, বাংলাদেশ, নেপালে পাহাড়ধস উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব অপকর্মের মূলে রয়েছে মানুষের লোভ। অর্থের লালসার রাক্ষুসী ক্ষুধা। কথায় আছে লোভে পাপ-পাপে মৃত্যু। এখানে লোভীর পাপে তার নিজের মৃত্যু হয় না। কিছু লোভী মানুষের পাপের ফল ভোগ করে অন্যরা। তারচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিণতি হয়তোবা অপেক্ষা করছে দেশবাসীর জন্য। কেননা প্রকৃতির ভারসাম্যতা নষ্ট হলে ভূমিকম্প বা পাহাড় ধসের মতো বড় বিপর্যয় থেকে পরিত্রাণ পাবে না কেউই। জানা গেছে, শুধু প্রভাবশালী ও বিত্তবানরাই নয় বিভিন্ন সরকারি সংস্থা যেমন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প করপোরেশনও বিপুল পরিমাণ পাহাড় কেটে রাস্তাঘাট ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান তৈরি করছে। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়ের মতো প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতি এই অবিচার সামাল দিতে পারবে তো পাহাড়ি এলাকার মানুষরা। পত্রিকার পাতায় পাহাড়ের ধসে মানুষের মৃত্যুর খবরে দেশবাসী আতঙ্কিত ও সোচ্চার। কিন্তু সরকার, প্রশাসন কেন নীরব? বিরোধী দলের ভূমিকা কী? পরিবেশবাদীরা কী করছেন? মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী? ওইসব পাহাড়ে সেনা ক্যাম্প রয়েছে, তাদের চোখও কি এড়িয়ে ঘটছে এসব কার্যক্রম? এমন অনেক জিজ্ঞাসা সাধারণ মানুষের মনে। বাংলাদেশে পরিবেশ আইনে পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদ-, এক কোটি টাকা অর্থদ-, পাহাড় কাটলে হাতেনাতে আটক যন্ত্র-সামগ্রী জব্দ, নিষেধাজ্ঞা, পাহাড়কে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিধিবিধান রয়েছে। তবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে সীমিত ও পরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটার সুযোগ রয়েছে।

পাহাড় রক্ষায় পাহাড়গুলোর ওপর এই অবিচার বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ের পাদদেশের বাসিন্দাদের সরিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলে বসতি স্থাপন বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে প্রচুর গাছ লাগিয়ে ঘন বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে। পাহাড়ে ফলদ, ঔষধি বৃক্ষ হতে পারে অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্র। পাহাড় আছে এমনসব দেশের মতো পাহাড়ের স্তরে স্তরে টিলা কাটিং ‘স্লোপ’ পদ্ধতিতে পাহাড়ের ওপর থেকে পানি নিসরণের ব্যবস্থা নিলে ধসের ঘটনা ঘটবে না। আমরা জানি, পাহাড়-পর্বত ও টিলারাশি সুরক্ষায় উন্নয়নে বিশ্বে অতুলনীয় এক নজির স্থাপন করেছে পাহাড়-পর্বতের দেশ নেপাল। দেশটিতে উঁচু পাহাড়-পর্বতের শানুদেশ ও ঢালুতে সিঁড়ির ধাপের মতো ‘স্লোপ’ সৃষ্টি করেছে। নেপালে স্লোপ অ্যাগ্রিকালচার ল্যান্ড টেকনোলজি বা ‘সল্ট’ হিসেবে পরিচিত। সেখানে বিভিন্ন ধরনের প্রচুর মৌসুমি ফল-ফসল, খেত-খামার এবং বনায়ন করা হয়েছে। এতে করে স্লোপের মাটি আলগা বা সরছে না। বরং মাটিক্ষয় কার্যকরভাবে রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। স্লোপ অতিক্রম করে বৃষ্টির পানি নিচের দিকে অপসারণ হচ্ছে। সল্টের কারণে পাহাড় রক্ষার পাশাপাশি এর সুফল ভোগ করছে প্রান্তিক কৃষকরা। তাই পাহাড়ের দেশ নেপালে বর্ষায় পাহাড় ধসের ঘটনা নেই বললেই চলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক ধরনের গুল্মজাতীয় গাছ যার গুচ্ছ শেকড় মাটির অনেক গভীরে ছড়িয়ে পড়ে মাটির বন্ধন শক্তিকে আরো মজবুত করে তোলে। এ ধরনের গাছ লাগানোর পাশাপাশি আমাদের দেশীয় তালগাছ লাগানোর কথাও ভাবা যেতে পারে। তালগাছের শেকড়ও মাটির বন্ধন শক্তি বাড়ায়। এছাড়াও তালগাছ বজ্রপাত নিরোধক।

লেখক : বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

writetomukul36@gmail.com

"