উন্নয়ন

প্রতিবন্ধকতার অবসান কাম্য

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৭, ০০:০০

ইফতেখার আহমেদ টিপু

বিশ্বপরিসরে বিদেশি বিনিয়োগে মন্দা চললেও গত বছর বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ ৪.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া স্বস্তিকর। তবে গত বছর পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানের তুলনায় বাংলাদেশে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ হলেও তা ভারতের চেয়ে প্রায় ২০ ভাগের একভাগ। গত বছর ভারতে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬৪০ কোটি ও বাংলাদেশে ২৩৩ কোটি মার্কিন ডলার।

জাতিসংঘের ব্যবসা সম্পর্কিত সংস্থা আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই সময়ে পাকিস্তানে ১২৮ কোটি, শ্রীলঙ্কায় ৬৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। পাকিস্তানের বিদেশি বিনিয়োগ মাত্র এক বছরে প্রায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছে। চীনা বিনিয়োগের কারণেই খাদের শেষ প্রান্তে অবস্থান করা পাকিস্তান তাদের অবস্থান উন্নীত করতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশের চেয়ে তারা এখনো অনেক পিছিয়ে। ২০১৬ সাল বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মন্দার বছর হিসেবে ইতোমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে দুই শতাংশ। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগে কার্যত ধস নেমেছে। এসব দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। বাংলাদেশও যেহেতু উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি, সেহেতু মহামন্দার দুঃসময়ে ৪.৪ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি প্রত্যাশিত মানের না হলেও খুব একটা হতাশার নয়। তবে ভারতের চেয়ে বিশাল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকার বিষয়টি অস্বস্তিদায়ক। প্রতিবেশী দুটি দেশের একটিতে রমরমা বিনিয়োগ হবে আর অন্য দেশটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলবে তা যৌক্তিক নয়। আশার কথা চলতি বছর বাংলাদেশে গত বছরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বিদেশি বিনিয়োগের আশা করছে আঙ্কটাড। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে নজর দিতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য সহজে শুরু করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের ‘সহজে ব্যবসা’র সূচকে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। এ দুর্নাম কাটিয়ে উঠতে ব্যবসা ক্ষেত্রের প্রতিবন্ধকতা অপসারণে সরকারকে ব্রতী হতে হবে।

রাষ্ট্রের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি শিল্প খাত। তেমনি আবার শিল্প খাতের অপরিহার্য চালিকাশক্তি বিদ্যুৎ। শিল্প খাতের প্রসার ও শিল্প-উৎপাদন বাড়িয়ে শিল্প খাতের সুদিন ফেরাতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে চলেছে। বাংলাদেশ যে ক্রমশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতির স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেছে তার বড় উদাহরণ বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতা অর্জন। সে সক্ষমতার সুবাদেই আজকে শিল্প খাত সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অর্থনীতির সব সূচক যখন ভালো অবস্থানে রয়েছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে, এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশÑএটা আমাদের জন্য অবশ্যই আশার খবর।

এটা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই যে, আছে অনেক বাধা, আছে বিপুল বিঘœ তবু এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। আছে শত্রুতা, আছে উল্টোগাড়ির অপচালক, তবু সঠিক পথে অগ্রসরমান আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ কিংবা ‘বাংলাদেশ একটি উন্নয়নের পরীক্ষাগার’- এ জাতীয় শ্লেষ ও বিদ্রƒপ গায়ে না মেখে মানুষ আত্মশক্তি অর্জনের পথে এগিয়ে বিশ্বমানচিত্রে মর্যাদার আসনে স্বদেশকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের ক্রমোন্নতির বিষয়টির স্বীকৃতিও মিলেছে।

নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। বিশেষ করে গ্যাস, বিদ্যুৎ, তৈরি পোশাকশিল্প এবং টেলিকমিউনিকেশন খাতে আগের তুলনায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। ফুড প্রোডাক্ট এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে কী উপায়ে আরো বিনিয়োগ আনা যায়, এ বিষয়ে উদ্যোগী হওয়ার সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। এছাড়াও আরো কয়েকটি খাত শনাক্ত করে পরিকল্পিতভাবে সম্ভাবনার দিকটি তুলে ধরে উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে সেসব খাতেও বিনিয়োগ আনা অসম্ভব হবে না। বর্তমান সরকার প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে এবং অধিকতর বৈদেশিক বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করছে। তাই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্টভাবে কোন বিষয়গুলোকে প্রতিবন্ধকতা বলে গণ্য করছে সেগুলো শনাক্ত হওয়া জরুরি। সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে নিয়ে অপপ্রচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো। বিনিয়োগের জন্যও যে এটি সুবর্ণ সময়, এই যুক্তিগুলো ছোট ও বড় সব স্তরের বিনিয়োগকারীর সামনে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার বিকল্প নেই।

লেখক : চেয়ারম্যান ইফাদ গ্রুপ

Email : chairman@ifadgroup.com

"