ধর্ম

নাজাতের দশকে লাইলাতুল কদর

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০১৭, ০০:০০

মাহমুদ আহমদ

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বিশেষ কৃপায় আমরা পবিত্র মাহে রমজানের ২০তম রোজা রাখার তৌফিক লাভ করেছি, আলহামদুলিল্লাহ। দেখতে দেখতে আমাদের মাঝ থেকে রহমত ও মাগফিরাতের দিনগুলো অতিবাহিত হয়ে প্রবেশ করব নাজাতের দশকে। কাল নাজাতের দশকের প্রথম রোজা। প্রথম রোজা শুরু হয়েছে পবিত্র জুমার পরদিন। অনেকেই নাজাতের এই দশ দিন আল্লাহতায়ালার নৈকট্য অর্জনে একনিষ্ঠভাবে ইবাদতে রত থাকার জন্য মসজিদে এতেকাফ করবেন। সারা রমজানকে বিদায় দিতে গিয়ে আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-এর এমনটি হয়ে থাকত যে, আধ্যাত্মিক বসন্ত নিজের চমক দেখিয়ে যখন বিদায় নেওয়ার ক্ষণে পৌঁছে যেত; তখন তিনি (সা.) কোমর বেঁধে নিতেন আর রমজানের কল্যাণরাজিতে নিজ ডালি ভরে নিতে কোনো ত্রুটি করতেন না। হজরত রাসুল করিম (সা.)-এর শেষ দশকের ইবাদত সম্পর্কে হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত একটি হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি রমজানের শেষ দশকে প্রবেশ করলে তিনি (সা.) কিভাবে কোমর বেঁধে নিতেন অর্থাৎ খুবই তৎপর হতেন এবং নিজ রাতগুলো ইবাদতের মাধ্যমে জীবিত করতেন। সঙ্গে সঙ্গে তার (সা.) পরিবার-পরিজনকেও জাগাতেন (বোখারি, কিতাবুস সওম)।

শেষ দশকে হুজুর (সা.) এতেকাফে বসতেন এবং লাইলাতুল কদরের অন্বেষণে রাতগুলো ইবাদতের মাধ্যমে জাগিয়ে রাখতেন। এতেকাফের আভিধানিক অর্থ হলো কোনো স্থানে আবদ্ধ হয়ে যাওয়া বা অবস্থান করা। ইসলামী পরিভাষায় ‘ইবাদতের সংকল্প নিয়ে রোজা রেখে মসজিদে অবস্থান করার নাম এতেকাফ’ (হিদায়া, বাবুল ইতিকাফ)। রমজান মাসের শেষ দশকে এতেকাফে বসা সুন্নতসম্মত। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিস থেকে জানা যায়, হুজুর (সা.)-এর মৃত্যুর পর তার (সা.) পবিত্র স্ত্রীরাও এ সুন্নতের অনুসরণ করতেন (সহি মুসলিম, কিতাবুল ইতিকাফ)। হুজুর (সা.) রমজান মাসে ১০ দিনই এতেকাফে বসতেন। উল্লেখ্য, হজরত নবী করিম (সা.) জীবনের শেষ রমজানে ২০ দিন এতেকাফ করেছিলেন।

২০ রমজান ফজরের নামাজের পর এতেকাফ শুরু করা উচিত। এজন্য ১৯ রমজান বাদ মাগরিব এতেকাফস্থলে এসে যাওয়াই অনেকে ভালো মনে করে থাকেন। এতেকাফে বসে মুতাকিফরা একাগ্রচিত্তে ব্যক্তিগত দোয়া ছাড়াও সবার জন্য সময়োপযোগী দোয়া করেন। এতেকাফের জন্য উপযুক্ত স্থান হলো জামে মসজিদ। এ প্রসঙ্গে কোরআন করিমে উল্লেখ রয়েছেÑওয়া আনতুম আকিফুনা ফিল মাসাজিদ অর্থাৎ তোমরা মসজিদে এতেকাফ কর (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)। হাদিসেও নির্দেশ এসেছে হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘লা ইতিকাফা ইল্লা ফিল মাসজিদুল জামে’ অর্থাৎ জামে মসজিদ ছাড়া এতেকাফ নেই। (আবু দাউদ, কিতাবুল ইতিকাফ, পৃ. ৩৩৫)। ইমামরা এ বিষয়ে ঐকমত্য সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, বিভিন্ন অসুবিধার কারণে এতেকাফ যেকোনো মসজিদে বা অপারগতার কারণে মসজিদের বাইরেও এতেকাফ হতে পারে। মহিলারা ঘরে নামাজের জন্য একটি বিশেষ স্থান নির্ধারণ করে সেখানে এতেকাফে বসা তাদের জন্য উত্তম (হিদায়া, বাবুল ইতিকাফ, পৃ. ১৯০)।

এতেকাফকারী দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে যেন তিনি তার অভীষ্ট মনোবাসনা পূর্ণ করে, তবে এতেকাফ থেকে উঠতে পারেন। এটা কঠিন সাধানার বিষয়। তাই মুতাকিফকে এমন কোনো কাজকর্ম বা আচার-আচরণ করা উচিত নয়, যাতে তার এ সাধনা ব্যাহত হয় বা প্রশ্নবিদ্ধ হয় অথবা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায় বা তার মনোবাসনা অপূর্ণ থেকে যায়। একজন তাপস সাধনের ন্যায় একাগ্রতা ঐকান্তিকতা শৃঙ্খলা ও পবিত্রতার লাগাম যেন হাতছাড়া হতে না দেন।

রমজানের এই শেষ দশকের একটি রাতে এসে থাকে লাইলাতুল কদর। লাইলাতুল কদর বা সৌভাগ্য রজনী লাভ বোধকরি মুমিনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। সারা জীবন কঠোর সাধনা, ত্যাগ ও তিতিক্ষার মাধ্যমে শয়তানি প্রবৃত্তিরূপে দৈত্যকে নিধন করার পর মুমিনের কাছে আসে সেই মুহূর্তটি-সেই পাওয়ার মুহূর্তটি, যা আল কোরআনের সুরা কাদরে ‘লাইলাতুল কদর’ নামে আখ্যায়িত হয়েছে। হাজার মাসের চেয়েও উত্তম এ মুহূর্তটি।

লাইলাতুল কদর বলতে আমরা সাধারণত একটি রাতকে মনে করে থাকি। ভৌগোলিক কারণে সারা দুনিয়ায় যেহেতু একই সময়ে রাত থাকে না, সেজন্যে লাইলাতুল কদরকে আমাদের গণনার একটি রাত নির্ধারণ করা সঠিক বলে মনে হয় না। লাইলাতুল কদর এমন একটি সময় মুমিনের ব্যক্তিগত জীবন বা জাতীয় তথা মিল্লাতি জীবনে রাতের ন্যায় কাজ করে থাকে। মুমিন সাধনার শেষ লগ্নে তার প্রভুর দিদার বা দর্শন ও সান্নিধ্য লাভ করে বাক্যালাপে ভূষিত হয়। এ মুহূর্তটিই আসলে তার জীবনে লাইলাতুল কদর। তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, এ মুহূর্তটি অবশ্যই মুমিনের জীবনে আসে রমজানের কঠোর সাধানার শেষ দশকে। রোজার সাধনার মাধ্যমে মুমিন পানাহার ত্যাগ করে, নিদ্রাকে কম করে দিয়ে এবং নিজের প্রজননকে সাময়িকভাবে হলেও স্বীকার করে আল্লাহর রঙে রঙিন হয়। তাই সে আল্লাহর সঙ্গে নিজ নিজ সামর্থ্যানুযায়ী বাক্যালাপ করার সৌভাগ্য লাভ করে।

হাদিস পাঠে জানা যায়, হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুল করিম (সা.) কদরের রাত্রি সম্বন্ধে বলেছেন, ‘রমজান মাসের শেষের দশ রাত্রিসমূহে লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান কর’ (বোখরি)। তিনি (সা.) আরো বলেছেন, ‘তোমাদের কাছে রমজান এসেছে। রমজান মোবারক মাস। এর রোজা আল্লাহ তোমাদের প্রতি ফরজ করেছেন। এ মাসে বেহেশতের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত করা হয়েছে আর দোজখের দ্বারসমূহ বন্ধ করা হয়েছে এবং দুস্কৃতকারী শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়েছে। এ মাসের একটি রাত্রি, যা হাজার মাস থেকে উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত, সে সকল প্রকার কল্যাণ থেকে বঞ্চিত’ (বোখারি)। হাদিস থেকে আরো জানা যায়, হজরত আয়েশা (রা.) নবী করিম (সা.)-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আমি লাইলাতুল কদর লাভ করলে কি করব? হজরত নবী করিম (সা.) তাকে নিম্নোক্ত দোয়া পাঠ করতে বললেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি অর্থাৎ হে আল্লাহ! নিশ্চয় তুমি মার্জনাকারী। মার্জানাকে তুমি ভালোবাস। অতএব তুমি আমাকে মার্জনা কর।’ (তিরমিজি)

আমাদের এই শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোয় লাইলাতুল কদরের অন্বেষণ করতে হবে। আর রমজান মাসের শেষ দিনগুলোয় আমাদের সবার বেশি বেশি উপরোক্ত দোয়াটিও করা উচিত। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এ দোয়াই করি, তিনি যেন এই পবিত্র রমজানে আমাদের সবাইকে নাজাত দান করেন এবং তার রহমতের ছায়ায় আবৃত করে রাখেন। আমিন।

লেখক : ইসলামী গবেষক ও কলাম লেখক

masumon83@yahoo.com

"