নারী উন্নয়ন

চাই সম-অধিকার ও ক্ষমতায়ন

প্রকাশ : ২০ মে ২০১৭, ০০:০০

শফিকুল ইসলাম খোকন

সাংবাদিকতা বা গণমাধ্যম। এ দুটি শব্দের সঙ্গে আমরা সবাই ভালোভাবেই পরিচিত। পাশাপাশি নারীর অধিকার বা পুরুষের সঙ্গে নারীর সম-অধিকারের বিষয়ও দেশের সর্বস্তরের মানুষ এখন অবগত। নারী আন্দোলনকারী ব্যক্তি, সংস্থা বা সরকার এমনকি এনজিও কর্মীরা নারীর সম-অধিকার নিয়ে কাজ করছে। এখন প্রতিটি স্তরে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমানভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সাংবাদিকতায় নারীদের অংশগ্রহণ থাকলেও ইতোপূর্বে গণমাধ্যমে নারীর সম-অধিকারের বিষয়ে কাউকে তেমন সোচ্চার হতে দেখিনি।

একবিংশ শতাব্দীতে সাংবাদিকতা আকর্ষণীয় একটি পেশা হিসেবে ইতোমধ্যেই পরিচিতি লাভ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি আর প্রতিযোগিতার এই যুগে গণমাধ্যমগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সবার আগে সংবাদ পৌঁছে দেওয়া। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো এই কাজটি বেশ সফলতার সঙ্গেই করছে। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। আর এই সফলতার পেছনে পুরুষের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জের দাবিদার নারীরাও। নারীদের বিশাল অবদান থাকা সত্ত্বেও গণমাধ্যমে তাদের তেমন অধিকার বা ক্ষমতায়ন দেখা যায় না। তবে একটি কথা না বললেই নয়- সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ ব্যবধান হওয়া উচিত নয়।

গত ১০ বছরে সাংবাদিকতায় নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে লক্ষণীয় হারে। এ পেশার পরিধি এখন শুধু সংবাদপত্র, রেডিও এবং টেলিভিশন চ্যানেলেই সীমাবদ্ধ নেই; সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এফএম রেডিও, কমিউনিটি রেডিও এবং অনলাইন মিডিয়া। প্রতিটি গণমাধ্যমই এখন নারী সাংবাদিকদের দীপ্ত পদচারণায় মুখর। তবে সাংবাদিকতায় এখনো নেতৃত্ব পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত পিআইডি গাইড হিসেবে পরিচিত টেলিফোন নির্দেশিকার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইংরেজি, বাংলা ও অনলাইন পত্রিকাসহ প্রায় ২০০ গণমাধ্যমে কর্মরত নারী সম্পাদক রয়েছে মোট ছয়জন। এদের সবাই সম্পাদক হয়েছেন মালিকানা সূত্রে, সাংবাদিকতার সূত্রে নয়। আর তালিকাভুক্ত ২৫টি টেলিভিশনের মধ্যে নারী সিইও রয়েছেন একটিতে, নারী বার্তাপ্রধান রয়েছেন দুটিতে। যেভাবে নারীরা এখন সাংবাদিকতায় আসতে শুরু করেছে, আগামীতে সাংবাদিকতার শীর্ষ পদগুলোতেও নারীর সংখ্যা বাড়বে এতে সন্দেহ নেই। এমনকি সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোতেও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। নূরজাহান বেগম, সেলিনা পারভীন ও লায়লা সামাদের মতো সাংবাদিকদের পথ অনুসরণ করে নারীরা প্রমাণ করেছেন, আগামীতেও করবেন।

এখন প্রতিটি স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ বা নারী নেতৃত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধী দলের নেতাও একজন নারী, দেশ স্বাধীনের পর সম্প্রতি প্রথম নারী নির্বাচন কমিশনার, জাতীয় সংসদের স্পিকার, মন্ত্রী, এমপি, সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদ অলঙ্কৃত করছেন নারীরা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতি বা উন্নয়ন হয়েছে ঈর্ষণীয় পর্যায়ের। এত কিছুর পরও নারীর উন্নয়ন বা নেতৃত্বের ক্ষমতায়ন বাড়েনি। তেমনি গণমাধ্যমে নারী সাংবাদিকতার অংশগ্রহণ ক্রমান¦য়ে বাড়লেও নেতৃত্ব বা ক্ষমতায়ন বাড়েনি। নারী নেতৃত্ব দেখা যায় মাত্র ১ থেকে ২টি পত্রিকা, টিভি সম্পাদনা বা পরিচালনায়। সে হিসেবে এখনো গণমাধ্যমে সমান অংশে নারীর ক্ষমতায়ন বাড়েনি। এ ক্ষেত্রে নারীদেরও এগিয়ে আসা উচিত।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে এক-তৃতীয়াংশ নারীকর্মী নিয়োগ দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি নীতিমালার পাশাপাশি প্রতিটি পত্রিকা অফিসের নিজস্ব নীতিমালা থাকতে হবে। প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে এক-তৃতীয়াংশ নারীকর্মী নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। এ বিষয়ে প্রতিটি হাউসে তদারকির মাধ্যমে খোঁজখবর নিতে হবে।’ তথ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ‘গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের বিষয়ে অনেক কাজ করছি। ইতোমধ্যে ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগ রয়েছে। সেখানে প্রচুর মেয়ে লেখাপড়া করছে। সরকারিভাবেও নারী-পুরুষ সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নারী ও পুরুষ সাংবাদিকদের মধ্যে বৈষম্য দূর করতে হবে। আর তা দূর করতে হলে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে সাংবাদিকদেরই।’ (সূত্র : বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর.কম, ৫ মার্চ ১৬)।

আমরা শুধু মুখে খই ফুটিয়ে বলছি- নারীর অধিকার, নারীর সমঅধিকার ইত্যাদি। কিন্তু এখনো দেখা গেছে, কর্মস্থল থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষ্যম্য। গণমাধ্যম বা সাংবাদিককে বলা হয় চতুর্থ রাষ্ট্র কিংবা জাতির আয়না। যারা জাতির নিয়ম-অনিয়ম সমস্যা-সম্ভাবনা জাতির কাছে তুলে ধরেন। সেই সাংবাদিকরাই সব সময় থাকেন অবহেলা আর বৈষম্যের পাত্র হিসেবে। আর নারীর অবস্থান তো বলার অপেক্ষায়ই রাখে না। তারপরও মন্দের ভালো বলতেই হবে। নারীদের অংশগ্রহণ যেমন বাড়ছে, নারীদের প্রতি বৈষম্যও কমছে, তেমনি নারীদের প্রতি সম্মানও বাড়ছে। সবশেষ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারীদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বিচারকার্যের শুরুতে আটজনকে মামলার শুনানিতে বিশেষ সুযোগ দেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ। এই আটজন আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীই ছিলেন নারী। সংসদে ১৪তম অধিবেশনেও নারী এমপিদের দিয়ে শুরু করেন স্পিকার। আরো একটি সুসংবাদ হলো, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ বলে সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন।

পরিশেষে বলতে চাই, সব মিলিয়ে নারী উন্নয়নে জয়জয়কার। নারী এখন পিছিয়ে নেই। নারীরা দেখিয়ে দিচ্ছে তারা পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব কিছুতেই এগিয়ে থাকছে। নারী সর্বক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। সবশেষে নারীরা উড়ালেন বিশেষ বিমান। এমনিভাবে সাংবাদিকতায় হোক নারীদের সমান অংশে দখল। যেখানে থাকবে না কোনো বৈষম্য। গণমাধ্যমে সম্পাদক বা বার্তা প্রধানেও সমান অংশে পদচারণা থাকতে হবে। এক-তৃতীয়াংশ নয়, থাকতে হবে শতভাগ নারীকর্মীর অংশগ্রহণ বা প্রতিনিধিত্ব। গণমাধ্যমেও চাই নারী সমঅধিকার।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

"