ধর্ম

...সহাবস্থান করতে পারে না

প্রকাশ : ১৯ মে ২০১৭, ০০:০০

মাহমুদ আহমদ

যে ধর্মের ঐশীগ্রন্থ নিজ সূচনায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা দিয়েছে ‘আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ তথা সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক-প্রভু আর যে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক ঘোষিত ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন’ (সূরা আম্বিয়া, আয়াত-১০৭) তথা ‘সমস্ত জগতের জন্য মূর্তিমান কৃপা’, সেই ধর্মের সঙ্গে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের সম্পর্কটা ঠিক আলোর সঙ্গে আঁধারের সম্পর্কের মতো। জলে-তেলে মিশলেও মিশতে পারে, কিন্তু ইসলাম ও জঙ্গিবাদ কখনো সহাবস্থান করতে পারে না। এই ধর্মের ঘোর সমালোচকরাও অকপটে এর অদম্য আত্মিক আকর্ষণের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, ইসলাম ধর্মের মূল শিক্ষাই হচ্ছে মনুষ্যত্ব। গুটিকয়েক উন্মাদের বিকৃত মানসিকতার কারণে সেই মনুষ্যত্বের ধর্মকে আজ জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় আসামি হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে!

এসব ভ- উন্মাদরা ইসলামের কলঙ্ক। এরা ইসলামের দোহাই দিয়ে মানুষকে আহ্বান জানালেও ইসলামের সঙ্গে এদের কোনো মিল নেই। নিরীহ মানব হত্যা এদের প্রধান কাজ। ইসলাম বলে, ‘যে ব্যক্তি নরহত্যা অথবা দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির ঘোরতর অপরাধ ছাড়া কোনো নিরীহ মানুষকে হত্যা করে, সে যেন গোটা মানবজাতিকেই হত্যা করল। আর যে একটি প্রাণও রক্ষা করে, সে যেন গোটা মানবজাতিকে নবজীবন দান করল।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত- ৩২)। অন্যায়ভাবে মানবহত্যার ব্যাপারে এত স্পষ্ট সাবধানবাণী থাকা সত্ত্বেও এবং মানুষের প্রাণ রক্ষার এত জোর তাগিদ থাকা সত্ত্বেও উগ্র-ধর্মান্ধরা কিভাবে ইসলামের নামে রক্তের হোলি খেলে, তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে! লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে মানুষটি মুসলমান কিনা, তা যাচাই করার কথা বলা হয়নি। কেবল বলা হয়েছে, নিরীহ মানুষকে বধ করা গোটা মানবজাতিকে হত্যার সমতুল্য আর একজন মানুষকে রক্ষা করা সমস্ত মানবজাতিকে রক্ষার মতো পুণ্যকর্ম। এখনকার জঙ্গিবাদ অবলীলায় মানুষকে হত্যা করা শেখায়। অথচ ইসলাম মানুষকে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান ও সম্মানিত সৃষ্টি বলে ঘোষণা করেছে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আমি আদমসন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং জলে-স্থলে তাকে (চলাচলের জন্য) বাহন দান করেছি।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত- ৭০)। যে ক্ষেত্রে স্বয়ং ¯্রষ্টা মানুষকে সম্মানে ভূষিত করেছেন, সেক্ষেত্রে সেই ¯্রষ্টার নামে মানুষকে নির্বিচারে গরু-ছাগলের মতো জবাই করা আর যা-ই হোক, কোনো মানুষের, বিশেষ করে কোনো মুসলমানের কাজ হতে পারে না। আল্লাহতায়ালা এ বিষয়ে আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আর তোমরা আল্লাহ কর্তৃক সম্মানিত ও হারাম ঘোষিত কোনো মানুষকে হত্যা করো না। তবে আইনগত এবং বৈধ কারণ থাকলে তার কথা ভিন্ন।’ (সূরা আল-আন্আম, আয়াত- ১৫১)। এত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও এসব জঙ্গি ইসলামের নামে কিভাবে মানুষকে ঠা-া মাথায় হত্যা করতে সাহস পায়, তা ভাবতেও অবাক লাগে!

জঙ্গিবাদীদের একটি উদ্ভট যুক্তি হলো, এরা অর্থাৎ পশ্চিমা জাতিগুলো আমাদের মুসলিম ভাইদের ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান ও লিবিয়ায় হত্যা করেছে, তাই আমরা এর প্রতিশোধস্বরূপ পশ্চিমাদেরকে যেখানে পাবো, কিসাসের বিধান অনুযায়ী হত্যা করব। গণমাধ্যমে জঙ্গিরা এ ধরনের বক্তব্যই উপস্থাপন করেছে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন! এদের এই খোঁড়া যুক্তি তর্কচ্ছলে যদি কয়েক মুহূর্তের জন্যও মেনে নেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, তাহলে তোমরা কেন উত্তর ইরাক, উত্তর সিরিয়া আর লিবিয়ার মাটিতে মুসলমান হয়ে মুসলমানকে নিধন করছ? কেন তোমরা তাহলে রেস্টুরেন্টে মুসলমানদের হত্যা করলে? এর সহজ অর্থ হলো, এরা মুসলমানদের সঙ্গে ভাওতাবাজি করছে। একদিকে এরা বাহ্যত মুসলমানদের সুহৃদ সাজে, আবার স্বার্থের দ্বন্দ্ব হলে বা মতের অমিল হলে তৎক্ষণাৎ মুসলমানদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করে তাদেরকে হত্যা করে! সাবধান, এরাই নব্য খারেজিদের দল, যারা প্রকৃতপক্ষে অন্তর্যামী হওয়ার দাবিদার! এরাই প্রাথমিক যুগে মুসলমানদের ঐশী খিলাফত ধ্বংসের কারণ হয়েছিল। এখন এরাই আবার ভিন্নরূপে মুসলমানদের জন্য মহাবিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে।

জঙ্গিবাদের হোতারা কিছু পারুক বা না পারুক, সমাজে নৈরাজ্য আর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে সিদ্ধহস্ত। আর এর মাধ্যমে তারা নাকি আল্লাহ এবং তাঁর রসূল (স.)-এর সেবা করে যাচ্ছে! অথচ আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে বার বার বলে দিয়েছেন, ‘ফিতনা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর অপরাধ। আর আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না।’ ‘ফিতনা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর অন্যায়।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত- ১৯১, ২০৫ ও ২১৭)। ‘এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে যেও না। আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে ভালোবাসেন না।’ (সূরা কাসাস, আয়াত- ৭৭)।

জঙ্গিরা আত্মহত্যার মতো হারাম ও নিষিদ্ধ কাজের নাম রেখেছে মহান আত্মত্যাগ ও প্রাণ উৎসর্গীকরণ! এই কাজ করে এরা নাকি সরাসরি জান্নাতে চলে যাচ্ছে! বিষয়টি ‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন’ রাখার মতোই একটি হাস্যকর ব্যাপার। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘...আর তোমরা আত্মহত্যা করবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অতিশয় দয়ালু। আর যে-ই সীমালঙ্ঘন ও অনাচারের পথ ধরে এই কাজ করবে, আমি তাকে নির্ঘাত আগুনে দগ্ধ করব। আর এই কাজটি আল্লাহর জন্য অতিব সহজ।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত- ২৯-৩০)। জঙ্গি মোল্লারা মগজ ধোলাই করে বলে, আত্মহত্যা করলে জান্নাতে যাবে, আর মহান আল্লাহ বলেন, আত্মহত্যা করলে মানুষ জাহান্নামে যাবে।

সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে একবার এমন একজনের লাশ বয়ে নিয়ে আসা হয়, যে তীরের ফলা দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) দয়ার সাগর হওয়া সত্ত্বেও তার জানাজা পড়াননি। (মুসলিম, কিতাবুল জানায়েয)। যুদ্ধের মাঠে মুসলমানদের পক্ষে বীরত্বের সঙ্গে লড়তে লড়তে এক ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়। শেষ পর্যন্ত ক্ষতের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে সেই ব্যক্তি যুদ্ধক্ষেত্রেই আত্মহত্যা করে। তার সম্বন্ধেও মহানবী (স.) জাহান্নামি হওয়ার আগাম সংবাদ দিয়েছিলেন। সরলমনা মুসলমানদের যখন এসব ইসলামী শিক্ষা ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হবে, তখন সমাজে আত্মহত্যাকারীও সৃষ্টি হবে না আর আত্মঘাতী বোমারুও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

প্রতিষ্ঠিত সরকার বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ইসলাম ধর্মে একেবারে নিষিদ্ধ। অথচ এই কাজটিই অবলীলায় করে যাচ্ছে জঙ্গিবাদীরা! বিদ্রোহ করতে নিষেধ করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়সুলভ, অনুগ্রহসুলভ ও আত্মীয়সুলভ আচরণ করার নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন যাবতীয় অশ্লীলতা ও অসৎকর্ম সাধন এবং বিদ্রোহ করতে, তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।’ (সূরা আন-নাহল, আয়াত- ৮৯)। মহানবী (স.) শত কষ্ট সহ্য করেও মক্কা নগরীতে নবুওয়াতের ১৩টি বছর অবস্থান করেন, কিন্তু কখনো প্রতিষ্ঠিত সরকারব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি। যখন মক্কাবাসীদের অত্যাচার-অনাচার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখনো তিনি কোনো ধরনের বিদ্রোহ না করে নীরবে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় গিয়ে একটি নগররাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তিনি যে আইনটি ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন, তা ছিল- রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যেন কেউ কখনো বিদ্রোহ না করে। সর্বাবস্থায় প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার আনুগত্য করতে শিখিয়েছেন রাসূল (স.)।

উগ্র-সন্ত্রাসী জঙ্গিবাদীদের দমন করতে চারটি কাজ করণীয়- ১. তাদের নেতাকর্মীদের ওপর কড়া নজরদারি ২. তাদের অর্থের সব উৎস বন্ধ করা ৩. তাদের অস্ত্র সরবরাহ একেবারে বন্ধ করা ৪. তাদের বিকৃত মতবাদ আর ইসলামের অপব্যাখ্যা ইসলামের মূল উৎস থেকে তুলে ধরে এদেরকে জনবিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। প্রথম তিনটি কাজ সরকার ও প্রশাসনের। চতুর্থ কাজটি সমাজের। আদর্শিক যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য পবিত্র কোরআন, মহানবী (স.)-এর পবিত্র জীবনাচরণ এবং সঠিক ও নির্ভুল হাদিসগুলো বার বার জনসমক্ষে তুলে ধরা একান্ত প্রয়োজন। অনেকের কাছে আমার এই বক্তব্য পছন্দ নাও হতে পারে। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, জঙ্গিবাদ নামক ইবোলা ভাইরাসের খপ্পর থেকে সমাজ ও দেশকে রক্ষা করতে সর্বপ্রথম নিজেদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। এরপর তা ছড়িয়ে দিতে হবে সমাজের প্রতিটি স্তরে। তাই ধর্মের সঠিক শিক্ষা নিজেদের এবং নিজেদের পরিবারকে শেখাতে হবে সর্বাগ্রে। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে প্রকৃত ইসলামের আদর্শে জীবন পরিচালনার তৌফিক দান করুন, আমিন।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

ই-মেইল : masumon83@yahoo.com

"