দর্শন

রমজানে ক্রেতারা সংযমী হলে...

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৭, ০০:০০

এস এম নাজের হোসাইন

পবিত্র মাহে রমজান আসার আগেই আমাদের দেশে ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়ে জনজীবনে দুর্বিষহ পরিবেশ তৈরি করে থাকেন। রমজানকে সামনে রেখে প্রতি বছর অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মজুদদারের আবির্ভাব ঘটে। এসব ব্যবসায়ী রমজান উপলক্ষে চিনি, ছোলা, ডাল, চাল, সয়াবিন, খেজুর, পাঞ্জাবি, শাড়ি ইত্যাদি পণ্যের পসরা সাজিয়ে থাকেন। অনেকে আবার ডিও (এসও) ব্যবসার ন্যায় পণ্যদ্রব্যের আমদানি ও বাজারজাত করেন। কথিত আছে এসব ব্যবসায়ী নাকি বলেই থাকেন রমজানে এক মাস ব্যবসা করব, আর সারা বছর আরামে কাটাব। রমজান মাস উপলক্ষে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রমজানের ব্যবহার্য পণ্যসামগ্রী এবং পবিত্র বড়দিন উপলক্ষে ইউরোপে ও আমেরিকার দেশগুলোতে পণ্যসামগ্রীর বাজারে বিশাল মূল্যহ্রাস প্রথা চালু থাকে। আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতেও পুজোর সময় মূল্যহ্রাসসহ নানা উদ্যোগ থাকে। বিপরীতে আমাদের দেশে পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টো। রমজান, ঈদ বা পুজো এলেই আমাদের দেশের খুচরো থেকে মাঝারি ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা সাধারণ ভোক্তাদের পকেট কাটার উৎসবে মাতোয়ারা হন। ফলে সাধারণ মানুষের জীবন এ মাসে কঠিন হয়ে পড়ে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেই আমরা প্রায়ই সরকারকে দোষারোপ করে থাকি। এটি ঠিক যে, সরকারের যথাযথ বাজার মনিটরিংয়ের দুর্বলতার সুযোগে আর দ্রব্যমূল্য মনিটরিংয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাদের খামখেয়ালিপনার কারণে কিছু মুনাফাখোর, মজুদদার, সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য জীবন-জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন ও অনেকাংশে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ালেও ওই পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য কমলেও তারা আর কমায় না। সঙ্কট আরো ঘনীভূত হয়। বছর চারেক পূর্বে ভারতে পেঁয়াজের দাম হাঠৎ করে বৃদ্ধি হলে, পুরো ভারত বর্ষের ভোক্তারা পেঁয়াজ কেনায় সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে এবং বিকল্প ব্যবহার শুরু করে। ফলে একপর্যায়ে ভারতে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি স্তমিত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে পেঁয়াজের মূল্য এত কমে যায় যে, পেঁয়াজ বিক্রি করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত অনেক ব্যবসায়ীকে বিপুল পরিমাণ লোকসান গুনতে হয়েছে। এ অবস্থা আমাদের দেশেও হয়েছে। ছোলা ও খেজুরের দাম বৃদ্ধির কারণে গত বছর অনেকে বেশি করে আমদানি করেন। কিন্তু পরবর্তীতে দাম অনেক কমে যায় এবং অনেক ব্যবসায়ীর কপালে হাত পড়ে। সম্প্রতি গরুর মাংস বিক্রেতারা হঠাৎ দাম বৃদ্ধি করে। অলৌকিকভাবে এই মূল্যবৃদ্ধির এখনো কোনো প্রতিকার হয়নি এবং হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই।

অধিকার ভোগ করতে গিয়ে আমাদের ওপর যে দায়িত্বগুলো বর্তায় তা কিন্তু অনেকে একেবারেই ভুলে যাই। একজন ক্রেতা-ভোক্তা হিসেবে সবার রয়েছে কিছু অধিকার। এর মধ্যে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মৌলিক চাহিদা পূরণের অধিকার জাতিসংঘ স্বীকৃত। একই সঙ্গে আমাদের রয়েছে পাঁচটি দায়িত্ব। সেগুলো হলো-পণ্য বা সেবার মান ও গুণাগুণ সম্পর্কে সচেতন ও জিজ্ঞাসু হওয়া; দরদাম যাচাই করে সঠিক পণ্যটি বাছাই করা; আপনার আচরণে অন্য ক্রেতা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন সে ব্যাপারে সচেতন থাকা; পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় সচেতন ও সক্রিয় হওয়া; ক্রেতা-ভোক্তা হিসেবে অধিকার সংরক্ষণে সোচ্চার ও সংগঠিত হওয়া। উপরোক্ত বিষয়গুলো জাতিসংঘ স্বীকৃত ক্রেতা-ভোক্তা অধিকার ও দায়িত্ব হলেও বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ প্রতিনিয়তই এবং পদে পদে এসব অধিকার থেকে যেমনি বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি দায়িত্ব সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ ও অনাগ্রহী থেকেছে। সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, জাতীয়, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বহুজাতিক দাতা গোষ্ঠী দুর্নীতি হ্রাস, সুশাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষায় সরব থাকলেও জনগণের নিত্যনৈমত্তিক এ অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে তাদের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। অথচ এই ক্রেতা-ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা না গেলেই তৃণমূল পর্যায় থেকেই মানবাধিকার সুরক্ষার স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে। কারণ ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত না হলে মানুষের স্বাভাবিক জীবন-জীবিকা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

আমরা আমাদের অধিকার ও দায়িত্বগুলো সম্পর্কে সচেতন বলে দাবি করি, তাহলে ব্যবসায়ীরা কিভাবে সিন্ডিকেট ও মজুদদারির মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে! পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে ভোক্তারাই পণ্যের প্রধান নিয়ামক। কারণ ভোক্তারা পণ্যটি ক্রয় ও ব্যবহার করলেই উৎপাদক, আমদানিকারক ও খুচরা-পাইকারি বিক্রেতারা লাভবান হবে। সে কারণে উন্নত দেশগুলোতে ভোক্তাদের বলা হয় ‘ক্রেতা সম্রাট’। আর উৎপাদক ও আমদানিকারকরা সব সময় ভোক্তাদের পছন্দ-অপছন্দের কথা মাথায় রেখে পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করে থাকে। আমরা অনেকেই জানি বাংলাদেশ থেকে রফতানি করা গার্মেন্ট পণ্য ক্রয়ের সময় ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারা গার্মেন্ট পণ্যটি স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে প্রস্তুত কি না তা সরেজমিনে দেখার জন্য প্রায়ই বাংলাদেশের বিভিন্ন গার্মেন্ট পরিদর্শন করতে আসে। ক্রেতাদের সরেজমিনে পরিদর্শনের পর আস্থা অর্জন হলেই বিক্রেতারা সেখানে বাংলাদেশি পণ্যগুলো বাজারজাত করতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে পরিস্থিতি তার উল্টো। ক্যাবের অনুসন্ধানে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর ও বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করা, ফল, মাংস ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য আমদানিতে কোনো প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বাজারে প্রবেশ করছে। কারণ কাস্টমস, বিএসটিআই, কৃষি, মৎস্য, প্রাণীসম্পদ এবং খাদ্য বিভাগের পরীক্ষার জন্য কোনো আধুনিক ব্যবস্থা ও লোকবল পর্যন্ত নেই। ব্যবসায়ীরা এক দিকে যেমন পণ্য-দ্রব্যের মূল্য বেশি নিয়ে সাধারণ জনগণের পকেট কাটছে, অন্যদিকে দুধ, মাছ, ফলমুলে বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশিয়ে বাজারজাত করছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিগত রমজানের সময় প্রতিটি আমদানি করা খেজুর ও ফলে ফরমালিন পাওয়া গেছে। অথচ এ খেজুর ও ফল দিয়ে রোজাদারা ইফতারি করে থাকেন। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা এ খেজুরে ও ফলমূলে জীবন বিধ্বংসী ফরমালিন মিশ্রণ করে মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে। ভোক্তা হিসেবে এগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আমাদের কি কোনো দায়িত্বই নেই? আমাদের উচিত বিদেশ থেকে আমদানি করা খেজুর, আপেল, কমলা, মালটা ইত্যাদি কেমিক্যাল মিশ্রণ ফলমূল বয়কট করা।

রমজান উপলক্ষে ক্যাব থেকে সম্মানিত ক্রেতা-ভোক্তাদের কাছে আবেদন, দয়া করে একজন ক্রেতা-ভোক্তা হিসেবে আমরা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলো সম্পর্কে সচেতন হই, নিজেরা দায়িত্ববান হই। একসঙ্গে মাসের বাজার না কিনে সপ্তাহের জন্য কিনি। পণ্য ক্রয় করার সময় দাম ও পণ্যের মান যাচাই করে কিনি। কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তা কেনা ও মজুদের জন্য হন্যে হয়ে না পড়ে আগে খোঁজখবর নিই। প্রয়োজনে বিকল্প হিসেবে অন্য পণ্য কিনি এবং ওই পণ্যটির ব্যবহারে সাশ্রয়ী হই। প্রায়ই দেখা যায়, রমজানের সময় ছোলা, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, বেগুনি ও শসার দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়। কিন্তু রমজানে এগুলোর ব্যবহার সীমিত করলে রমজানের কোনো পবিত্রতা নষ্ট হবে না বা তৃপ্তিতে কোনো বিঘœ ঘটবে না। তাহলে কেন আমরা রমজানের সময় বিনাকারণে এসব উপাদানের পেছনে উন্মাদের মতো ছুটছি? বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। তবে সবচেয়ে যেটা বেশি প্রয়োজন তা হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিকল্প উৎস বের করা এবং কোনোভাবেই একক পণ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল না হওয়া। সরকারের ও উচিত এসব ভোগ্যপণ্য আমদানির ভার এককভাবে মুষ্টিমেয় কয়েক ব্যবসায়ীর হাতে ছেড়ে না দিয়ে মনোপলি ব্যবসা বন্ধ করা। একই সঙ্গে উৎস দেশ হিসেবে সব কিছুর জন্য কোনো নির্দিষ্ট একক দেশের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে অন্য দেশগুলোর ওপরও গুরুত্বারোপ করা। এছাড়াও যেসব উৎপাদক, আমদানিকারক, ব্যবসায়ী তিনি পায়কারি ও খুচরা হোক না কেন, যারাই ইচ্ছাকৃতভাবে বাজারে কৃত্রিমভাবে পণ্য কেনা-বেচায় সঙ্কট তৈরি করছে, তাদের বাজারজাতকৃত পণ্য বয়কট এবং তাদেরও সামাজিকভাবে বয়কট করা। মনে রাখতে হবে, ভোক্তা হিসেবে আমরাই সব পণ্যের নিয়ামক হই। কোনোভাবেই কোম্পানি ও বাজারজাতকারী খুচরা ব্যবসায়ীরা যেন পণ্যের মূল নেয়ামকে পরিণত না হয় সে জন্য আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে, সচেতন হতে হবে। প্রতিটি রমজান ও পুজো-পার্বণ উপলক্ষে দেশে কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ীর আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু যারা প্রকৃত ব্যবসায়ী সারা বছর বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ করে আমাদের চাহিদা মিটিয়ে থাকেন, এসব মৌসুমি ব্যবসায়ীর উৎপাতে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের করণীয় তেমন থাকে না। তাই মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বিষয়ে সতর্ক হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।

লেখক : ভাইস প্রেসিডেন্ট

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ

nazer.cabbd@gmail.com

"