মুক্তমত

কেজি স্কুলগুলোকে বাঁচানো প্রয়োজন

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২০, ০০:০০

গোপাল অধিকারী

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, দেশে এখন উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ১৪ লাখের বেশি। গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শিক্ষিতদের এক-তৃতীয়াংশই বেকার। বিআইডিএসের গবেষণা অনুযায়ী, সার্বিকভাবে শিক্ষিতদের মধ্যে ৩৩ শতাংশের বেশি বেকার। আর এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যারা প্রথম শ্রেণি পেয়েছেন, তাদের মধ্যে বেকারত্ব সাড়ে ১৯ থেকে সাড়ে ৩৪ শতাংশ। বিশেষ করে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রথম শ্রেণি প্রাপ্তদের মধ্যে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশই বেকার। স্নাতক পর্যায়ে এমন মেধাবীদের বেকারত্বের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, কাজ প্রত্যাশীদের মধ্যে সপ্তাহে ন্যূনতম এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজের সুযোগ না পেলে বেকার হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশে এমন বেকার ২৭ লাখ।

বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। ফলে বেকার সমস্যা একটি বড় সমস্যা বলা যায়। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া এই জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরের কোনো উপায় নেই। আর প্রশিক্ষণ দিতে গেলেও শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাই বলা হয়, শিক্ষাই জাতরি মেরুদন্ড। যে জাতি যত শিক্ষিত, সেই জাতি তত উন্নত। তাই শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকারও শিক্ষাবান্ধব বলেই সমাদৃত। সরকারের সেই লক্ষ্য বা পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে কাজ করছে কিন্ডারগার্টেন বা কেজি স্কুলগুলো। আজকের যে শিক্ষার্থী সে আগামীর সম্পদ বা সম্বল। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যেই কেউ হবে চিকিৎসক, কেউ শিক্ষক আবার কেউ হবে রাষ্ট্রনায়ক। তাইতো বলা হয়, শিক্ষক জাতি গঠনের কারিগর। একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের কারিগর ছাড়া যেমন একটি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যেতে পারে না; ঠিক তেমনি শিক্ষকদের ছাড়াও একটি সুন্দর জাতি গঠনের পথ সুগম হতে পারে না। তাই বর্তমান সরকারের সময়ে শিক্ষকরা রয়েছে সর্বোচ্চ সম্মান ও সম্মানীর আসনে। এখানে সর্বোচ্চ সম্মানী বলতে আগের সব সম্মানীর থেকে বেশি। তবে বড়ই দুঃসময়ে রয়েছে কিন্ডারগার্টেনগুলোর শিক্ষকরা। স্বাভাবিক সময়েই এই বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকমন্ডলী ও কর্মচারীরা কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করে চলে তারপর এই করোনাকালীন একদিকে ভবন ভাড়া; অন্যদিক প্রাইভেট বন্ধ করে নীরব বসে থাকা। সবকিছু মিলিয়ে তাদের বড়ই দুঃসময় চলছে।

তথ্যমতে, কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর বেশির ভাগ শিক্ষক জীবিকা নির্বাহ করেন প্রাইভেট পড়িয়ে। অনেকে আছে সেই আয়েও চলে না জীবন। কোনো রকম সম্মানের সঙ্গে বসবাস করতে চালিয়ে যান পেশাটি। কারণ প্রাপ্তির জায়গা একটাই সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা। জগতে এখনো এমন মানুষ আছে যারা শুধু সম্মানের জন্য বেঁচে আছেন। যে কারণে টিকে আছে শিক্ষাব্যবস্থা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ এইভাবেই জীবনযাপন করে। তারা বিপথে যায়নি, তারা অন্যায় কাজের সঙ্গে যুক্ত নন। এই বেকারসংখ্যার অনেকেই কাজ করছেন একজন কেজি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে। বেকারত্ব্রে বৃদ্ধির কারণেই সমাজে বেড়ে যায় অপরাধ। ঝরে যায় অসংখ্য প্রাণ। বেড়ে যায় সন্ত্রাস ও মাদকের ছোবল। এমনই শিক্ষিত অনেক বেকার জীবন পাড়ি দিচ্ছে এই মহান পেশায়। বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের সভাপতি ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেছেন, করোনার ক্রান্তিলগ্নে প্রায় ৬০ হাজার প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ২০ লাখ শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিবার মানবেতন জীবনযাপন করছে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আমরা কোনো টিউশন ফি আদায় করতে পারিনি। তাই শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। কিন্ডারগার্টেন জাতীয় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই ভাড়াবাড়িতে পরিচালিত হয় (৯৯ শতাংশ) কিংবা একটু সচ্ছল অথচ বেকার কোনো ছেলে বা মেয়ে নিজের বাসার একটি রুমে হয়তো এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান চালু করেন। করোনাকালীন বন্ধেও প্রতিষ্ঠানগুলোর বাড়িভাড়া ঠিকই দিতে হয় যদিও শিক্ষার্থী বেতন নেই এই কয় মাস। অন্যান্য বিলও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিক হারে পরিশোধ করতে হয়, যা এখনো অব্যাহত আছে। এমতাবস্থায় দিশাহারা জাতি গঠনের এই কারিগররা।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, এসব স্কুলের প্রণোদনা বিষয়ে এ আবেদন তারা সরকারের কাছে করেছেন। একজন এই সংকটময় সময়ে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে সরকারের দাঁড়ানো উচিত। কারণ এই প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান। শিক্ষকরা দেশপ্রেম শেখায়, শিক্ষকরা শেখায় নীতিনৈতিকতা। বেকারত্ব কমাতে শিক্ষাব্যবস্থা উন্নতির লক্ষ্যে সরকারি প্রণোদনা বিশেষ প্রয়োজন বলেই মনে হয়। কারণ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি। যুগের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার তাল মেলাতে, সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার কৌশলগত সমস্যার কারণেই কেজি স্কুলে চলমান প্রক্রিয়া। তাছাড়া সরকার যেভাবে ঘরে ঘরে শিক্ষা বিলিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে বেসরকারি স্কুল ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেই জায়গা বা শিক্ষক কোনটাই নেই। সব মিলিয়ে কিন্ডারগার্টেনগুলো সরকারি ইশতেহার বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের অবশ্যই দৃষ্টিপাত এই সেক্টরে দেওয়া উচিত। এরই মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে সরকার এই বেসরকারি শিক্ষকদের প্রণোদনা দেবেন বলে জানা যায়। এই বেসরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষকমন্ডলী ও কর্মচারী তারা বাংলাদেশের বৈধ নাগরিক। তাদের দেশের প্রতি দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত। তারা দেশের প্রচলিত আইন মেনে চলে, তারাও সরকারকে নিয়মিত কর দেয়। সুতরাং নাগরিকতার বৈধ জায়গা থেকে তাদের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। কারণ প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা থেকে চাকর সবার প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে। সরকারকে বলব, বেকার সমস্যা সমাধানে এখনই এই সেক্টরকে বাঁচান উচিত বলেই বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তাই এই দুর্যোগকালীন সরকারের কাছে যুগোপযোগী সিদ্ধান্তই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"