বিশ্লেষণ

করোনা-ঝুঁকিতে বন্যাক্রান্ত মানুষ

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২০, ০০:০০

আতিক সিদ্দিকী

দেশে বর্ষার ভরা মওসুম চলছে। থই থই পানিতে ভাসছে দেশের কোটি মানুষ। ঘরবন্দি দুর্বিসহ জীবন কাটাচ্ছে বানভাসি এসব মানুষ। করোনায় কর্মহীন পানিবন্দি মানুষ তাদের গৃহপালিত পশু হাঁস-মুরগি আসবাবপত্র নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে খেয়ে না খেয়ে। বর্ষার এ সময়টায় বন্যাক্রান্ত মানুষ সাধারণত তীব্র জ্বালানি সংকটে ভোগে। পাশাপাশি পানীয়জল ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেয় তাদের মধ্যে। আমরা জানি যে, এ সময় স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন সম্ভব হয় না কোনোভাবেই। আমাদের কারই অজানা নেই যে নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের বানভাসি মানুষ বন্যার এ সময়টায় স্বল্প পরিসরে পরিবার-পরিজন ও তাদের আসবাবপত্র হাঁড়ি-পাতিল গরু-বাছুর, হাস-মুরগি নিয়ে একসঙ্গে গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি করে কোনো রকমে সময় পার করে থাকে। এ প্রেক্ষাপটে করোনাকালে বন্যাক্রান্ত দেশের মানুষ কীভাবে সমাজিক দূরত্ব বা শারীরিক দূরত্ব মেনে চলবে। পা বাড়ালেই পানি, সাঁতার জানে না কোলের এমন শিশু নিয়ে বাড়তি ঝামেলা তো রয়েছে প্রায় প্রতি পরিবারেই। মাচাঙে বা ঘরের চালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে পানিবন্দি মানুষ। এসব কারণে অভিজ্ঞজনদের ধারণা, বন্যাক্রান্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি করোনা ঝুঁকিতে।

সারা দেশে আষাঢ়ের অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে। আবহাওয়া অধিদফতর বলেছে, ঢাকাসহ দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাত দিন পর্যন্ত এক টানা বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় অতিবাহিত করে বৃষ্টি কিছুটা কমে এলেও সপ্তাহখানেক পরে আবার তা শুরু হতে পারে। টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা ধরলা ব্রহ্মপুত্র ও সুরমা নদীর পানি বিপ॥সীমার ীপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে সবগুলো নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের বহু মানুষ পানিবন্দি হয়ে অমানবিক জীবনযাপন করছে। করোনাভাইরাসে কার্যত অচল অর্থনীতির কারণে কর্মহীন মানুষ বিগত ৪ মাসে তাদের হাতের সব পুঁজি হারিয়ে এখন শূন্য হাতে অনাগত ভবিষ্যতের দুঃস্বপ্নে বিভোর। কী করবে কোথায় যাবে? চাল নেই চুলা নেই। মাথা গোঁজার মতো সামান্য আশ্রয় তাতে থাকা কতটুকুইবা ঘর-গৃহস্থালি এসবও বানের পানির তোড়ে ভেসে যেতে বসেছে। সেখানে করোনায় স্বাস্থ্যবিধি মানা কতটা সম্ভব কেবল ভুক্তভোগী ছাড়া বলা সম্ভব নয়। এই একই কারণে বন্যাক্রান্তদের করোনা ঝুঁকি অনেক বেশি। বন্যার এ কমাস এমনিতেই বন্যাপ্রবণ এবং প্লাবণভূমি এলাকায় মানুষের হাতে কাজ থাকে না। মৎস্যজীবী-অমৎস্যজীবী মিলে মাছ শিকার করে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ হয় তাদের। করোনাকালে বন্যাক্রান্তদের প্রতি মানবিক সাহায্যের খুব প্রয়োজন। সরকারিভাবে অথবা দেশের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার এখনই সময়। এ ছাড়া এসব হতদরিদ্র বন্যাক্রান্ত দেশের জনগণকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে। জাতিসংঘ বলেছে বিশ্বে প্রতি ৯ জনে একজন ক্ষুধার্ত। যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম তাদের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলেছে, সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যে পরিমাণ লোক মারা যাবে, তার চেয়ে বেশি লোক মারা যাবে ক্ষুধায়। যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় টেলিগ্রাফ পত্রিকায় এ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। করোনায় দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার লোক মারা গেছে, সেখানে ক্ষুধায় মৃত্যু হবে ১২ হাজার মানষের। প্রতিবেদনটিতে অক্সফাম আরো বলেছে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে লকডাউনে মানুষ গণহারে বেকার হয়ে পড়ে। তাদের আয় কমে যায়। খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়। মানবিক সাহায্য কার্যক্রমও কমে যায়। আর এসবের পুরো প্রভাব গিয়ে পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। সারা বিশ্বে গত বছর ৮২ কোটি ১০ লাখ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। এদের মধ্যে আবার ১৫ লাখ মানুষ অতিমাত্রায় খাদ্যাভাবে ছিল। এ বছর করোনা মহামারিতে বৈশ্বিক অর্থনীতি এতটাই গতিহীন হবে। যে কারণে করোনা-পরবর্তী বিশ্ব চরম অর্থনৈতিক স্থবিরতায় দিশাহারা হয়ে পড়বে; যাহোক বেঁচে থাকতে হলে লড়াই করতে হবে এবং সব প্রতিকূলতায় লড়াই করেই বাঁচতে হবেÑ এমন বাস্তবতায় প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি। করোনাকালে অত্যন্ত দক্ষতায় মহা ঘূর্ণিঝড় আম্পান মোকাবিলা সম্ভব হয়েছে। এখন করোনা ও বন্যা পাশাপাশি চলছে।

বন্যা ক্রমেই রুদ্রমূর্তি ধারণ করছে। ভফুনে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা। কাঁচা-পাকা সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ব্যারাজ রক্ষায় সবগুলো গেট খুলে দেওয়ায় তিস্তার পানিতে লালমনিরহাটের বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের সবকটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নিম্ন্াঞ্চল ও চরাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উজানের পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে বৃষ্টির একাকার হয়ে বন্যা পরিস্থিতির এতটাই অবনতি হয়েছে যে, দ্রুত সেখানে ত্রাণ পৌঁছানো দরকার। বিশেষ করে শুকনো খাবার যত দ্রুত সম্ভব সেখানে পৌঁছানো দরকার। পানির চাপ এতটাই প্রবল হয়েছে ব্যারাজের সবগুলো গেট খুলে দিয়েও পানির চাপ রক্ষা করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ব্যারাজ এলাকায় ইতোমধ্যেই রেড অ্যালাট জারি করা হয়েছে। তিস্তার নদীতীরবর্তী লালমনিরহাটের ৫ উপজেলা বন্যাক্রান্ত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ঘাঘট করতোয়া নদীর পানি দ্বিতীয়বারের মতো বেড়ে ওঠায় গাইবান্ধার বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। জেলার সদর উপজেলাসহ সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ভারতের পাহাড়ি ঢলে এমন পরিস্থিতিতে লালমনিরহাটের প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি। তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ১৫ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রতিদিনই দেশের সবগুলো নদ-নদীর পানি বাড়ছে। অতিবর্ষণে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বাড়ছে। সিরাজগঞ্জের চৌহালি, কাজিপুর ও শাহাজাদপুর উপজেলা জেলার অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকা হওয়ায় এই তিন উপজেলায় ইতোমধ্যেই আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যায় জামালপুরের বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্টে যমুনার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার সরিষাবাড়ি, দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জে দ্বিতীয় দফায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সেখানে সুরমা নদীর পানি বাড়ছে হু হু করে। জেলার ১১ উপজেলার সবকটি উপজেলা বানের পানিতে ভাসছে। এসব উপজেলায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। অবিরাম বর্ষণে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা পার্বত্যাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। ভারী বর্ষণে ভূমিধসের দুশ্চিন্তায় তাদের বর্ষার এ সময়টা কাটে আতঙ্কের মধ্য দিয়ে।

বানের পানিতে পলি আসবে মাটি উর্বর হবে। সে মাঠে নানা ফসল ফলায়ে কৃষক মহা-আনন্দে তার গোলা ভরবে। নাকে সোনার ফুল কানে দুল আর নতুন শাড়িতে কৃষানির মুখ হাসিতে ভরে উঠবে। নানা স্বাদের ফলে বাজার টুইটুম্বুর। হাটে গেলে যে করেই হোক ঝাকাতে ইলিশ আর কাঁঠাল এ দুটো তুলতেই হবে কৃষককে। বর্ষা নিয়ে কবিদের আবেদন অন্যরকম নানা জাতের নানা ফুল বিশেষ করে কদম ফুল, মেঘ, বৃষ্টি, ঝড় এবং এ সবের স্পন্দন চমৎকার এক অনুষঙ্গ কবিকে লেখার প্রেরণা জোগায়। বর্ষা ঘিরে কবিরা তাদের কবিতায় নানাভাবে বর্ষা বন্দনা করে থাকেন। বর্ষাকে নিয়ে প্রচুর লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। লিখেছেন, গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা। কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা। রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হলো সারা, ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা। কাটিতে কাটিতে ধান এলো বরষা। প্রকৃতি ও কৃষককে কৃষিজকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। এখন বর্ষা মানেই দুর্যোগ। প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব দিন দিন মানুষের আগের সেই জীবনবোধকে পাল্টে দিচ্ছে। অনেক আগে বানের সময় মানুষ কিছুটা দুর্ভোগ, কিছুটা আকাল যে অনুভব করেনি এ কথা সত্য নয়, তবে এখনকার মতো এতটা নয়। পরিবেশের এই ভারসাম্যহীনতার জন্য আমরাই দায়ী।

বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল। ইংরেজি মধ্য জুন থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বর্ষা থাকে। কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে বর্ষা শুরু হয় জুন থেকে এবং এর স্থায়িত্ব হয় অক্টোবর পর্যন্ত। এ সময়েই দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বইতে থাকে বৃষ্টিপাত হয়। প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এ সময়টায়। বছরের অন্য সময় এমনটা বৃষ্টি হতে দেখা যায় না। দেশে সারা বছর যে পরিমাণ বৃষ্টি হয় তার ৮০ ভাগ বৃষ্টি হয় এ সময়। বর্ষার এ সময়ে নদী নালা খাল বিল হাওড় জলে অথৈ জলে থই থই করে। এ সময় বানের পানিতে প্লাবনভূমি প্লাবিত হয়ে যায়। পণ্য ও কন্যা নিয়ে নৌকা ছুটে চলে এ গ্রাম থেকে সে গ্রামে। বিশাল জলপ্রান্তরে জেলেদের নৌকা ভাসতে দেখা যায়। বানের এ পানি কত দিন থাকবে, তা স্থানীয়ভাবে বর্ষার পানির গভীরতার ওপর নির্ভর করে। সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও পাবনা জেলার হাওর, বিল, ঝিলের মতো নিচু এলাকাগুলোতে বর্ষা ৬ মাসের বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়। আমাদের দেশের মধ্য অংশে এর স্থায়িত্ব খুবই কম, সর্বোচ্চ তিন মাস। বন্যা আমাদের দেশের কৃষক মৎস্যজীবীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে তারা ধানের বীজতলা ও জমি প্রস্তুত করে। মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের জন্য বর্ষা মাছ শিকারের মৌসুম হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এতসবের মাঝেও দেশের বন্যাক্রান্ত মানুষের এ সময়টা কাটে আতঙ্কের মধ্যে। সহায়-সম্বলহীন অসহায় মানুষের যার যেটুকু আছে সেখানেও ভয় তাড়া করে, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনাতঙ্ক। বন্যাক্রান্ত এসব পানিবন্দি মানুষের সাধারণ স্বাস্থ্যের যেখানে এতটুকু নিশ্চয়তা নেই, সেখানে করোনাভাইরাসের মতো অপ্রতিকারযোগ্য রোগের সঙ্গে প্রতিরোধ যুদ্ধ কতটা সম্ভব। এজন্যই করোনা প্রতিরোধে বন্যাক্রান্ত এলাকায় বিশেষ নজর দেওয়া খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"