বিশ্লেষণ

সুস্থ মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২০, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

দুর্নীতি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম অন্তরায়। দুর্নীতি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে দুর্বল করে। দুর্নীতির ফলে মানুষ তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। দুর্নীতি আইনের শাসনের পরিপন্থি। দুর্নীতির ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সরকার ও মৌলিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থার অবনতি হয়। বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টিসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহীত বিশেষায়িত নিরাপত্তাবেষ্টনী কার্যক্রমেও অনিয়ম প্রকট আকার ধারণ করেছে। অবৈধ অর্থ প্রদানের সামর্থ্য চাকরিতে নিয়োগপ্রাপ্তির উপায়, মেধা বা যোগ্যতা আর তেমন কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। অন্যদিকে ২৪ এপ্রিল ২০১৩ রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ২০০ অধিক নিরাপরাধ শ্রমিক-কর্মীর নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, দুর্নীতির কারণে মানুষকে প্রাণও দিতে হয়। রানা প্লাজা ধসের পেছনে দুর্নীতির প্রভাব ছিল দিবালোকের মতো পরিষ্কার। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ ক্ষমতাবানদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে অবৈধভাবে দখলকৃত জমিতে অবৈধ প্রক্রিয়ায় আইন ও বিধিমালা অমান্য করে নির্মিত ভবনে অবৈধভাবে পরিচালিত পোশাক কারখানায় ঝুঁকি চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও কাজে উপস্থিত থাকতে বাধ্য করে দ্রুত মুনাফার লোভে শ্রমিকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এ ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিটি স্তরে ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার।

দুর্নীতি এবং উন্নয়ন বিপরীত অনুপাত সম্পর্কযুক্ত। একটির বৃদ্ধি অপরটি হ্রাসের নির্দেশক। এ কারণে উন্নয়নশীল বিশ্বের উন্নয়নের যেসব অন্তরায়কে চিহ্নিত করা হয়েছে দুর্নীতি তাদের মধ্যে অন্যতম। আজকাল অনেককেই দুর্নীতির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলোর উন্নয়নের সম্পর্ক না থাকা নিয়ে ‘অযাচিত’ মন্তব্য করতে দেখা যায়, সেটা বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক। ধরে নিচ্ছি, যারা বুঝে মন্তব্য করেন, তাদের এক ধরনের রাজনৈতিক ধান্ধা আছে। হয় তারা দুর্নীতিবাজদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত অথবা সামনে কিছু সুবিধা পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। এ রকম আরো কত কিছু। যাক আসা যাক মূল কথায়। দেশের যেসব লোক ইয়াবার ব্যবসা করে বা মানব পাচার করে মুনাফার অর্থে ঘর ভরে ফেলেছেন কিংবা যেসব কর্মকর্তা উপার্জন করেছেন বস্তা বস্তা টাকা, তারাও নামে-বেনামে ব্যাংকে সঞ্চয় করেন। দেশের ব্যাংকে সব টাকা রাখা সম্ভব না হলে ভিনদেশি ব্যাংকের শরণাপন্ন হন। যেমন সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে আমাদের সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা গচ্ছিত আছে। বাংলাদেশি হিসেবে এ আমাদের অহংকার করার মতো ঘটনা। বিশ্ববাসী জানল বাংলাদেশিরা সত্যি বড়লোক। প্রায় সব ব্যাপারে আমরা তলানিতে থাকলেও টাকা-পয়সা পাচারের ক্ষেত্রে আমাদের রোল নম্বর একেবারে ওপরে।

গত মাসে প্রকাশিত সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারত প্রথম। বাংলাদেশের পরে রয়েছে পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা। সুইজারল্যান্ড বা অন্য কোনো দেশের ব্যাংকে কেউ টাকা রাখলেই সে টাকা অবৈধ, তা হয়তো নয়। কিন্তু বৈধর সঙ্গে অবৈধ টাকাও আছে কি না এবং সে টাকা কার এবং সেখানে কী প্রক্রিয়ায় গেল, সে তথ্য জোগাড় করা খুব বেশি কঠিন নয়। সেই কাজটি আমাদের রাষ্ট্র করেছে কি না, সাধারণ মানুষের সেটাই জিজ্ঞাসা। আইনকানুন মেনে জনশক্তি রফতানির ব্যবসা অসম্মানজনক নয়। কিন্তু অবৈধ মানব পাচার অতি অমর্যাদাকর ফৌজদারি অপরাধ। ব্যবসা-বাণিজ্য আর প্রতারণা দুই জিনিস। যে কাজ দেওয়ার শর্তে একজন যুবক বা যুবতীকে বিদেশে নিয়ে গেছেন, বিদেশে সেই কাজ ও মজুরির শর্ত ভঙ্গ করা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। পত্রিকার প্রতিবেদনে জানা গেল, ভিটেমাটি বিক্রি করে একজন টেকনিশিয়ানের চাকরি পাবেন, এই শর্তে গিয়েছিলেন কুয়েতে। গিয়ে পেলেন সুইপারের কাজ। যে বেতনের প্রতিশ্রুতি তাকে দেওয়া হয়েছিল, দেওয়া হলো তার তিন ভাগের এক ভাগ। প্রতিবাদ করার সুযোগটিও সেখানে নেই। গত জানুয়ারিতে এ রকম একটি খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৭ হাজার ৬৪৭টি পথশিশু ও কর্মজীবী শিশুর হিসাব খোলার তথ্য পাওয়া যায়। তাদের হিসাবে জমানো অর্থের স্থিতির পরিমাণ সাড়ে ৩৮ লাখ টাকা। অথচ পথশিশুরা শিক্ষার আলো পায়নি। এমনকি ব্যাংকের ফরম পূরণ করা দূরের কথা, নাম দস্তখতটা পর্যন্ত করতে পারে না। পথশিশুদের পক্ষে ১৫টি এনজিও তাদের হিসাব পরিচালনা করে। এখন মোট ১৯টি ব্যাংক পথশিশুদের হিসাব পরিচালনা করছে। ঋণখেলাপিরা ব্যাংক থেকে যে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ফেরত দেননি, তার মধ্যে পথশিশুদের ৩৮ লাখ টাকার কিছু অংশও আছে।

বিদেশে টাকা পাচার করা বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির একটি উপসর্গ মাত্র, রোগ নয়। যারা বিদেশি ব্যাংকে টাকা সঞ্চয় করেন, তারা নিঃসন্দেহে ধনী লোক। ধনী লোককে মানুষ সমীহ করে। সুইস ব্যাংকে টাকা আছে, সে কথা তারা বুক ফুলিয়ে বললে আমাদেরও ভালো লাগে। কিন্তু তারা যেহেতু তা চক্ষুলজ্জাবশত বলবেন না, সুতরাং রাষ্ট্রের কর্তব্য তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া এবং সেই সৌভাগ্যবানদের জীবনবৃত্তান্ত দেশবাসীকে অবগত করানো। কেউ নিজের টাকা ব্যাংকে রাখবেন, না বাঁশের খোলের ভেতরে রাখবেন, না তোশকের ভেতরে রাখবেন, তা তার ব্যাপার। অন্য কারো তা নিয়ে মাথা ঘামানো অসমীচীন। কিন্তু টাকা কী উপায়ে অর্জিত হলো, তা জানতে চাওয়া দোষের নয়। টাকা পাচার রোগ নয়, রোগ হলো নষ্ট রাজনীতিপ্রসূত দুর্নীতি। অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেয় নষ্ট রাজনীতি। নষ্ট রাজনীতি রাষ্ট্রের কর্মচারীদেরও দুর্নীতিতে অভ্যস্ত করে। রাষ্ট্রের কর্মচারীদের সহযোগিতা না পেলে অর্থপাচারী বা আদমপাচারীরা খুব বেশি দূর যেতে পারে না। একা পাচারীর পক্ষে ভিসা-বাণিজ্য করা সম্ভব নয়, দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। অন্যদিকে প্লেনভর্তি আদম সন্তান পাচার হলো, প্রজাতন্ত্রের কেউ জানে না, তা বিশ্বাস্য নয়। ব্যাংকের খারাপ ঋণের জন্য ঊর্ধ্বতন ব্যাংক কর্মকর্তারা দায় এড়াতে পারেন না। আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিদিনই হুঙ্কার দেয়, ‘কাউকে ছাড়’ দেওয়া হবে না। তাদের কর্মকর্তারা ছুটছেন ৪০ বস্তা ত্রাণের চাল আত্মসাৎকারী ইউপি মেম্বারের বাড়িতে বা দোকানে। মানবপাচারীদের তারা পাকড়াও করেছেন, এমন খবর পাওয়া যায় না। শুধু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একার কাজ নয়, এই শ্রেণিকে নজরদারির মধ্যে রাখা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনেরও কর্তব্য। প্রতিটি সংশ্লিষ্ট সংস্থার বারো আনা কাজ তো মিডিয়াই করে দিচ্ছে।

যে টাকা পাচার হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ ফতুর হবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতিও ভেঙে পড়বে না। কিন্তু অন্যখানে ক্ষতি সীমাহীন। শুধু অর্থনীতি দিয়ে সবকিছু বিচার্য নয়। একজন সৎ ব্যবসায়ী দুবাই, জেনেভা, ফ্রাঙ্কফুর্টে গিয়ে তিন তারা হোটেলে থাকেন। আর একজন অর্থ ও আদমপাচারী থাকেন বিলাসবহুল পাঁচ তারা হোটেলের সুইটে। অবৈধ ও অনৈতিক উপায়ে অর্জিত অর্থবিত্তশালী নষ্ট মানুষদের চাপে ভালোরা প্রান্তে সরে যাবে। উন্নত সমাজ গঠনের পথে তা বাধা। দুর্নীতির প্রকোপ এত ব্যাপক ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নাগরিক অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না, তাই হরহামেশাই বলা হচ্ছে, দুর্নীতির কারণেই আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে অপরাধ বৃদ্ধির দরুন জনসাধারণের মৌলিক অধিকার আজ বিপন্ন; ফলে লাঞ্ছিত হচ্ছে মানবতা, পদদলিত হচ্ছে দেশের মর্যাদা।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"