নিবন্ধ

আত্মপ্রশংসা বনাম আত্মসমালোচনা

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২০, ০০:০০

অলোক আচার্য

পৃথিবীতে মানুষ জন্মগ্রহণ করার পরপরই তার ভেতর দুই ধরনের গুণের সন্নিবেশ ঘটতে থাকে। ভালো এবং খারাপ। তার পারিপাশির্^ক অবস্থা এবং ব্যক্তি নিজে এই দোষ ও গুণ নিজের ভেতর লালন করে। কেউ ধরে মনুষ্যত্ব আবার কেউ মনুষ্যত্ব বিসর্জন দেয়। কেউ চাটুকারিতাপ্রবণ হয় আবার কেউ হয় সত্যবাদী। তবে ইতিবাচক মানসিকতার মানুষ আজ সমাজে বেশ কমই দেখতে পাওয়া যায়। এভাবেই আমাদের সমাজ গড়ে উঠছে। এভাবে সমাজের ধারা প্রবাহিত হচ্ছে বংশ থেকে বংশানুক্রমে। সবাই যখন হুজুর হুজুর করতে গিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে তখন হুজুরের মিথ্যা প্রলাপ যে কতখানি ভুল তা ধরিয়ে দেওয়ার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

সমাজ আধুনিক হচ্ছে। পোশাক আধুনিক হচ্ছে। কিন্তু মন আধুনিক না হয়ে অধঃপতিত হচ্ছে। এই যে চারদিকে তেলবাজির এক ধারা তৈরি হয়েছে তাতেও কিন্তু নিজেকে রক্ষা করার বা নিজেকে আরও উঁচু পদে আসীন করার একটা হীন কৌশলই প্রকাশ পায়। এটা ছাড়া তো আজকাল আবার ওপরের সিঁড়িতে ওঠাই দায় হয়ে যায়। এটাই আজ পরিবর্তিত সমাজের রীতিনীতি। এই রীতিনীতি ধরেই কত স্পষ্টভাষী আজ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। মানে তার জি হুজুর বলতে দ্বিধা করেছিলেন। বিপরীতে যারা তা বলতে পেরেছেন তারা আজ হুজুরদের সমকক্ষ হয়েছেন। বাংলা প্রবাদে একটা কথা প্রচলিত আছে। নিজের ঢোল নিজে পেটানো। আজকের যুগে এই প্রবাদটি সত্যিই আমাদের আচরণের সঙ্গে মিলে যায়। নিজের ঢোল নিজে পেটানোর কাজটা এত সুচারুরূপে করে চলেছি যে অন্য কেউ ঠিক বিশ^াস করে। এই ঢোল পেটানোর প্রবাদকে শুদ্ধ কথায় আত্মপ্রচার বলে। কথায় বলে প্রচারেই প্রসার। প্রচার না করলে নিজের গুণের প্রসার হবে কি উপায়ে! এর বিপরীত প্রবাদও রয়েছে। খালি কলস বাজে বেশি। আজকের যুগে আত্মপ্রচার করাটা দোষের নাকি তা সত্যিই প্রয়োজন তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। মানুষের এত সময় কোথায় যে, অন্যের প্রচার করে বেড়াবে! ফলস্বরূপ নিজের ঢোল নিজেকেই বাজাতে হচ্ছে। হঠাৎ দু-একজনকে খুঁজে পাওয়া যাবে যে নিজেকে সারা জীবন আড়ালে রাখে। আড়ালে থেকে সারা জীবন মানুষের জন্য, দেশের জন্য কাজ করে যায়।

মাঝেমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে মানুষকে সাহায্য করার বহু ছবি দেখি। যেখানে যতটা না মানুষকে সাহায্য করা উদ্দেশ্য থাকে তার চেয়ে বেশি থাকে নিজের প্রচার করার। এটা হরহামেশাই ঘটছে। আত্মপ্রচার যে মাঝেমধ্যে মানুষের জন্য বিরক্তির উদ্রেক করে বা আমরা আপনাতেই হাসির পাত্র হই। তাতেও বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ হয় না। মূর্খ মাত্র বুঝতেই সক্ষম হয় না যে বিষয়টি লজ্জার না আত্মতৃপ্তির। অধিকাংশই আত্মতৃপ্তি নিয়ে বসে থাকি। কারণ চক্ষুলজ্জা করলে তো আর প্রচার হয় না। আর প্রচার না হলে খ্যাতি পাওয়া যায় না। মানুষের কাছে পরিচিতি পাওয়া যায় না। মানুষের কাছে পরিচিতি পাওয়াই তো মুখ্য উদ্দেশ্য! তা যেকোনো উপায়েই হোক। অতিরিক্ত আত্মপ্রচার মাঝে মাঝে সামাজিক ব্যাধির রূপ নিয়েছে। এই যেমন আমি কোন বেলায় কি খাচ্ছি, কোন নতুন মডেলের জামা কিনছি, কোথায় যাচ্ছি, আমি কি করতে পারছি প্রতিটি খুঁটিনাটি দিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছি। আর প্রতি মুহূর্তে খোঁজ নিচ্ছি তাতে কতটি লাইক পড়ছে, কতবার সেই পোস্টটি শেয়ার হচ্ছে। যে পোস্ট যতবার দেখা হয় বা শেয়ার হয় তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তত হিট ব্যক্তি। তার মানে ঢোল বাজানোর কাজটা আমরা বেশ ভালোই রপ্ত করেছি। আজকাল দেখতে পাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একশ্রেণির উঠতি নেতারা নিজেদের বড়মাপের কোনো নেতার সঙ্গে ছবি তুলে পোস্ট করে। তারপর সে নিজেই বড় নেতা হয়ে যায়। ওই যে তার পরিচিতি! সব ঢোল পেটানোর ব্যাপার। অনেকে আবার একধাপ এগিয়ে। সেই ছবি রাস্তার মোড়ে ঝুলিয়ে দেয়। নিজেকে বড় নেতা প্রমাণ করতে হবে তো! সবাই যে আত্মপ্রচার পছন্দ করে তা যে নয় তা আগেই বলেছি। কিন্তু তাদের ভালো কাজগুলো আমাদের সমাজকে প্রতিনিয়ত আলোকিত করে চলেছে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সেই ভালো মানুষগুলো পরিবারের ঘরেই নিয়মিত আলো জ¦লে না। অথচ তারা সমাজকে আলোকিত করার ব্রত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এরাই মানুষ। প্রকৃত মানুষ।

এ রকম মানুষ আজকাল খুব কমই আছে। যা আছে তার চেয়েও আমরা তাদের খোঁজ কম পাই। প্রকৃতপক্ষে কোনো প্রকৃত ভালো কাজের উদ্দেশ্য প্রচার করা থাকে না। থাকে সমাজের সেবা করে যাওয়া। রাস্তাঘাটে আমাদের হরহামেশাই অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় যারা নিজেদের তুলে ধরতে ব্যস্ত থাকে। নিজের গুণাগুণ করে। নিজের প্রচার করা কতটা প্রয়োজন? যদি তা মানুষের বা সমাজের কোনো না কোনো উপকারে আসে তাহলে তার প্রয়োজন রয়েছে। আত্মপ্রচার বলুন আর ঢোল পেটানোই বলি সবই তো সেই ওপর তলার মানুষকে খুশি করার জন্যই করছি। নিজেকে বড় করার জন্য করছি। নিজেকে বড় তৈরি করতে পারার এই যে প্রবণতা তা আদৌ কোনো দিন বন্ধ হবে না। বরং দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়তেই থাকবে। কারণ সময় যে প্রতিযোগিতামূলক। যে যত তেল দিতে পারবে, সে ততই ওপরে উঠতে পারবে। ওপরের সিঁড়িতে ওঠা চাই-ই চাই। মানুষের মধ্যে যে গুণের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো নিজের কাজের সমালোচনা। এর চেয়ে বড় গুণ আর কী হতে পারে। নিজের ভুলভ্রান্তি ধরার মতো ক্ষমতা বা ইচ্ছা কজনের আজ আছে! সবাই তো নিজের কাজকেই সর্বাগ্রে স্থান দিতে চাই।

আমাদের প্রয়োজন সমাজ আলোকিত করার মতো মানুষ। সমাজের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাওয়ার মতো মানুষ। সর্বত্রই আজ যে লোভী মানুষের হাতছানি ক্ষমতার লোভ, অর্থের লোভ, সম্পদের লোভ-লালসা; যা সমাজকে জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে তা থেকে পরিত্রাণ দিতে আমাদের প্রয়োজন নিঃস্বার্থ মানুষ। যারা কাজ করেও ফলাও করে কাজের প্রচার করবে না। যারা কেবল শিরোনাম হতেই সমাজের উপকারে আসবে না। যা হবে সত্যিকার অর্থেই মানবতার কল্যাণে। দোষ-গুণ প্রতিটি মানুষের ভেতরেই থাকে। সেই দোষ যখন গুণের চেয়ে বেশি হয়ে দেখা দেয়, তখনই সমাজের অমঙ্গল ঘটে। আজ যেমন সমাজে নেতার চেয়ে কর্মীই বেশি প্রয়োজন তখন আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে তা ঘটছে কেবলই ক্ষমতার লোভে। নিজের কাজের ভুল ধরার জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। সারা দিন পর যদি কেউ নিজের প্রতিদিনের কাজের হিসাব করতে পারে, ভুলক্রটিগুলো শোধরাতে পারে তাহলেই পরদিন সে সেই ভুল কাজ করা থেকে বিরত থাকতে পারে। এটাই আত্মসমালোচনা। নিজের সমালোচনা অন্যের মুখে শুনলে আমরা আবার তা সহ্য করতে পারি না। আমরা যেন চাই সবাই আমার প্রশংসা করুক। কিন্তু সমালোচনার যে দরকার তা বুঝতেই পারি না। আমারও যে ভুল হতে পারে প্রথমে তা অনুধাবন করতে হবে। অর্থাৎ নিজের সমালোচনা করতে হবে। তারপর সমাজের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া নিয়ে ভাবতে শিখতে হবে। মুখে বড় বড় উপদেশবাণী না দিয়ে নিজের কাজের সমালোচনা করতে পারাটাই বড় সাহসের কাজ।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"