বিশ্লেষণ

যানজট-দূষণরোধে বাইসাইকেল

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০

আবু আফজাল সালেহ

ঢাকা পৃথিবীর ব্যস্ততম ও জনবহুল শহরগুলোর মধ্যে একটি। আবার দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দুও ঢাকা। সবকিছুই আবর্তিত হয় রাজধানীকেন্দ্রিক। দফতরগুলোর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ খুব কমই হয়েছে। ফলে বিভিন্ন কাজকর্মের জন্য আসা-যাওয়া, স্থায়ী নাগরিক ও বিভিন্ন সেক্টরে চাকরিরত লোকজন নিয়ে হিমশিম খেতে হয় ঢাকার। এ বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচলের জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ যানবাহনের। যানবাহনের জন্য দরকার রাস্তার। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শহরে যানবাহন চলাচলের জন্য ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ রাস্তা থাকা খুবই জরুরি। কিন্তু ঢাকায় যানবাহন চলাচলের জন্যে রাস্তা রয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ! রাজধানীর রাস্তায় প্রতিদিন ৭ লাখ মোটরবাইক এবং ২ দশমিক ৮৭ লাখ ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করে বলে জানিয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। প্রতিদিনই নতুন নতুন ব্যক্তিগত গাড়ি নামছে। সংস্থাটির মতে, বর্তমানে শহরের ৮০ শতাংশ যাত্রী ৫ কিলোমিটারের মধ্যে ভ্রমণ করেন। তাদের মধ্যে অর্ধেক আবার ২ কিলোমিটারের মধ্যেই ভ্রমণ করেন। রাজধানীতে চলাচলকারী এসব গাড়িতে নগরের মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ যাতায়াত করতে পারে বলে জানা যায়। যানজটে ঢাকা শহরে নষ্ট হচ্ছে লাখ লাখ কর্মঘণ্টা।

এতসব চিন্তা করে ও পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রেহাই পেতে বিশ্বব্যাপী বাইসাইকেলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ইউরোপের প্রায় শহরেরই একটি জনপ্রিয়বাহন সাইকেল। আমস্টারডাম, কোপেনহেগেন, অসলোর মতো শহরগুলোতে যানবাহনের বড় অংশ সাইকেল। ইউরোপের দেশগুলোতে সাইক্লিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াত মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। নেদারল্যান্ডসে মানুষের চেয়ে সাইকেলের সংখ্যা বেশি। আমস্টার্ডাম এবং হেগের মতো শহরে ৭০ শতাংশ যাতায়াত সাইকেলের মাধ্যমে হয়ে থাকে। আমস্টারডামকে তো সাইকেলের রাজধানীই বলা হয়। যুক্তরাজ্যে প্রায় ২০ মিলিয়ন সাইকেল ব্যবহৃত হচ্ছে। চীন ও জাপানে সাইকেলের জনপ্রিয়তা অনেক। নেদারল্যান্ডসের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিলাসবহুল গাড়ির পরিবর্তে বাইসাইকেলে চড়ে অফিস করেন বলে জানা যায়। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাজেটে এসবের প্রভাবও পড়ে। এতে আধুনিক ও দূষণমুক্ত শহর গড়তে সহায়তা হয়। এ চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতে প্রথমেই আমাদের মানসিকভাবে ইতিবাচক হতে হবে।

ঢাকায় গাড়ি পার্কিংযের জন্য রাস্তার বিরাট একটা অংশ ব্যবহৃত হয়। এতে যানজট ও দুর্ঘটনা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়। বাণিজ্যিক, অফিস ও ব্যাংকপাড়ায় রাস্তার দুপাশে যেখানে সেখানে সারি সারি ব্যক্তিগত গাড়ি রাখা হয়। যাতায়াতের ভোগান্তি এড়াতে বিত্তবানরা অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু মধ্যবিত্ত ও অন্যদের জন্য ব্যক্তিগত মোটরভেইকল স্বপ্নের মতো। জানা যায়, ব্যক্তিগত গাড়িতে যাত্রী চলাচল হয় মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। ব্যক্তিগত গাড়িগুলোতে যাত্রী চলাচলের সংখ্যা অনেক কম হলেও রাস্তার অধিকাংশ জায়গা দখল করে থাকে। অন্যদিকে ৯৬ দশমিক ২ শতাংশ যাত্রী চলাচল করে বাস, সাইকেল, রিকশা ও হেঁটে। সাইকেল চলাচলে খরচ অনেক কম। রক্ষাণাবেক্ষণ খরচও কম। আর পরিবেশ দূষণও হয় না। তাই দীর্ঘমেয়াদি যানজট নিরসনে পরিবহন হিসেবে সাইকেলের কোনো বিকল্প নেই। অল্প দূরত্ব বা কিছু বেশি দূরত্বে চলাচলের জন্য সাইকেলই সবচেয়ে ভালো বাহন। করোনাকাল আমাদের জীবন ও অভ্যাসকে পাল্টে দিয়েছে। ভবিষ্যতে সামাজিক দূরত্বনীতি অনেক দিন বজায় থাকতে পারে। ফলে বড় শহর (বিশেষ করে ঢাকা) সাইকেল চলাচলে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সাইকেল চালানো যেমন সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকবে তেমনই শরীরের জন্য ভালো ব্যায়াম হতে পারে। এটি একটি আদর্শ ব্যায়াম। সাইকেল চালনার মাধ্যমে শরীরের মাংসপেশির শক্তিমত্তা ও সহনশীলতাও বৃদ্ধি পায়। এতে শরীরে মেদ জমে না, শরীরের বাড়তি ক্যালরি কমে যায়। শরীর সুস্থ থাকে এবং কর্মক্ষমতা বাড়ে। সপ্তাহে তিন ঘণ্টা সাইকেল চালালে হার্টঅ্যাটাক কিংবা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যায়। এছাড়া সাইকেলে চিকণ ও ছোট সড়কে সহজে প্রবেশ করা যায়। এতে সময় ও অর্থের খরচ কম হয়। সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে সাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করলে যানজট, পরিবেশ দূষণ ও যাতায়াতের সময় কমে। ফলে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয় এবং শহর বসবাসযোগ্য হয়ে উঠে।

এ বছরের জানুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত মোট ব্যক্তিগত গাড়ির ৭৮ শতাংশ চলে ঢাকার রাজপথে। প্রতিদিন অনেক গাড়ি নিবন্ধিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের করা এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র সাত কিলোমিটার! সময়ের বিবেচনায় প্রতিদিন যানজটের কারণে নষ্ট হচ্ছে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা। এই কর্মঘণ্টার অপচয়ের ফলে বছরে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। গবেষকরা বলছেন জনসংখ্যা এবং যানবাহনের পরিমাণ যদি একই হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং সে অনুপাতে রাস্তা না বাড়ানো হয় তাহলে ২০২৫ নাগাদ ঢাকার যানবাহনের গড় গতি হবে ঘণ্টায় মাত্র চার কিলোমিটার। যা আমাদের হাঁটার গতির চেয়েও কমে যেতে পারে। পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, একই রাস্তায় বিভিন্নগতির যান চলাচল শহরগুলোর অভিন্ন বৈশিষ্ট্য। একই কারণে শহরের রাস্তাগুলো বর্ধিত যানবাহনের চাপ সামলিয়ে গতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে কার্যকারিতা হারায়। ঢাকার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বিশ্বের অন্যান্য শহরে কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়নো করা হয়। আইন প্রয়োগে কঠোরতা দেখানো হয়। জনগণও সচেতন। ঢাকার ক্ষেত্রে ঠিক বিপরীত চিত্র।

উন্নত দেশগুলোতে বাইসাইকেল চলাচলের জন্য আলাদা লেন ও পার্কিংয়ের বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। সবচেয়ে সুবিধা হলো একসঙ্গে অল্প জায়গায় অনেকগুলো সাইকেল রাখার ব্যবস্থা করা যায়। আমাদের এমন কিছু পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। সাইকেল চলাচলের জন্য আলাদা লেন করতে হবে। এখনই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সাইকেলবান্ধব কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। রাস্তার সঙ্গে কোনো সাইকেল লেনও নেই। আবার হাঁটার জন্য ফুটপাথ কম ও কোথাও কোথাও অবৈধ দখলদারিত্ব করা রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফুটপাত দিয়ে হাঁটাচলা করা যায় না। এক্ষেত্রে নতুনভাবে গড়ে উঠা শহর বা আবাসিক এলাকাগুলোতে আগে থেকে পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। সেখানে আলাদা লেন ও সাইকেল পার্কিংযের সুবন্দোবস্ত করতে হবে। তবে আগামী ২০৩১ সালের মধ্যেই ময়মনসিংহকে যানজট ও দূষণমুক্ত আধুনিকসহ গড়তে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইউএনডিপির অর্থায়নে প্রাথমিক জরিপের কাছ শেষ হয়েছে। ময়মনসিংহ ও এর আশপাশের ১০টি ইউনিয়নে ৭২ হাজার একর জায়গা নিয়ে আধুনিক শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তাতে সাইক্লিং পরিকল্পনায় আছে বলে জানা যায়।

শহরে বসবাসের পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, যানজট কমাতে, পরিবেশ দূষণ হ্রাসে ও ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বাহন হিসেবে সাইকেলের বিকল্প খুব কমই আছে। দেখা যায়, প্রতিটি সংকটেই তৈরি হয় নতুন সমাধান সূত্র। কোভিড-মহামারি সংকটে সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে রেহাই পেতে অনেকেই মোটরসাইকেল অথবা বাইসাইকেলের ব্যবহারের চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন। এ ধারা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে বলেই মনে হচ্ছে। দূষণ ও করোনাকালে সামাজিক দূরত্ব বৃদ্ধির যুক্তিসহ সাইকেল নিয়ে চিন্তাভাবনা করাই যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রথমেই আমাদের মন-মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে।

এছাড়া অরো একটা চিন্তা করা যেতে পারে। ঢাকার আশপাশের শহরগুলোকে কার্যকর স্যাটেলাইট শহর হিসেবে গড়ে তোলা যায়। রাজধানীকেন্দ্রিক অনেক অফিস-আদালত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এসব শহরে স্থানান্তর করতে পারি। সবচেয়ে ভালো হয় জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যথেষ্ট আর্থিক ও সিদ্ধান্তগ্রহণ ক্ষমতা দিয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করা। একেবারেই মেজর সিদ্ধান্ত ছাড়া প্রধান কার্যালয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও হ্রাস করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথম প্রথম অবশ্য বিশৃঙ্খলা আসতে পারে। তবে সম্ভাব্য সমস্যাগুলো নিয়ে স্টেকহোল্ডার ও অভিজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করে সুষ্ঠু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্তমান সরকার জনবান্ধব সরকার। আশা করি, এসব বিষয়ে ইতিবাচক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"