মুক্তমত

চিকিৎসক ও রোগীর সেতুবন্ধন জরুরি

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২০, ০০:০০

হিমেল আহমেদ

একজন চিকিৎসক হলেন রোগীর কাছে বিধাতাস্বরূপ। একজন ডিগ্রিধারী চিকিৎসকের কাছে যতটা ভরসা করা যায় নিকটতম আত্মীয়স্বজনের কাছেও ততটা করা যায় না। বিশ্বে রোগের সংখ্যা কম নেই। দিন যাচ্ছে নতুন নতুন রোগ ও রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের সংক্রামক ছড়াচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের উপাধির জন্য পরিশ্রম করছে কিন্তু বিপরীতে দেখা যাচ্ছে, দেশে দরিদ্রতার হার এখনো আশঙ্কাজনক। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছে। এমতাবস্থায় করোনাভাইরাসের প্রকোপে অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসায় চিকিৎসকরা অকাতর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। রোগীর সেবা দিতে গিয়ে অনেক চিকিৎসক মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। তারা দেশের বীর। উক্ত বীরদের আমরা সর্বদা স্মরণে রাখব। এই করোনাকালে চিকিৎসকনির্ভর হয়ে পড়েছে মানুষ। কিন্তু পত্রপত্রিকা খুললে দেখা যাচ্ছে যে, অনেকেই চিকিৎসাবঞ্চিত হচ্ছেন। চিকিৎসা না পেরে মারা যাচ্ছেন অনেকেই। দেশে এমনও চিকিৎসক আছেন, যারা রোগীকে সেবা দেওয়া থেকে বঞ্চিত করছেন। অনেকেই অভিযোগ করেন শুধু বিশেষ একটি মহলকে সেবা দেওয়ায় জনসাধারণ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এটা কিন্তু কাম্য নয়। দেশের স্বাস্থ্য খাতকে আরো উন্নত করা প্রয়োজন। প্রতিদিন দেশে শুধু করোনাভাইরাসে অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম শনাক্ত হয় করোনাভাইরাসের রোগী। আক্রান্তের প্রায় তিন মাস অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে করোনা জেঁকে বসেছে এতে সন্দেহ নেই। আক্রান্ত দেড় লাখ ছাড়িয়েছে। মৃত্যু হয়েছে এক হাজার ৯০০ বেশি মানুষের। করোনার ব্যাপক প্রকোপের কারণে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে। দেখা গেছে, উক্ত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম! এগুলোর দিকে সরকারের কড়া নজর দেওয়া উচিত। সম্প্রতি করোনায় চিকিৎসকদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। চিকিৎসকরা যদি পর্যাপ্ত সুরক্ষিত না থাকেন, তাহলে রোগীকে সেবা দেবেন কীভাবে। ডাক্তারসহ চিকিৎসা খাতে সংশ্লিষ্ট সবার পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। কিছুদিন আগে একজন ডাক্তারের মৃত্যু হয়েছে রোগীর স্বজনদের আক্রমণে। এটি সত্যিই বেদনাদায়ক। ভুলত্রুটি ঊর্ধ্বে কেউ নেই। তাই বলে হত্যা করার অধিকার তো আমাদের নেই। আসুন মহামারির এই দুঃসময়ে সকলেই ভ্রাতৃত্বের আচরণ করি। আরেকটা কথা না বললেই নয় যে, আমাদের দেশে অধিকাংশ চিকিৎসকদের অর্থ উপার্জনের প্রবণতা বেশি। শহর উন্নত হওয়ায় অধিকাংশ ডাক্তার শহরকেই বেছে নিচ্ছেন। এতে করে চিকিৎসাসেবার সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছেন গ্রামের মানুষ। দেখা যায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডিউটি ডাক্তারদের সিডিউলের ব্যাপক বিপর্যয়। সকাল ১০টায় আসার কথা থাকলে অনেকেই ডিউটিতে আসেন দুপুরে। ডাক্তাররা ব্যস্ত থাকেন নিজস্ব চেম্বারে। কারণ সেখানে মোটা অঙ্কের ভিজিট নেওয়া সম্ভব হয়। সরকারি মেডিকেল, হাসপাতালে যা সম্ভব হয় না! সরকারি হাসপাতালগুলোতে দেখা যায়, রোগীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না অনেক ডাক্তার! এ রকম অনেক অভিযোগ করে থাকেন হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নেওয়া রোগীরা। হাসপাতাল সর্বদা গরিব অসহায় মানুষের জন্য অত্যন্ত সুলভ মূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছু অসাধু কর্তৃপক্ষের কারণে অনেকে আজ সঠিক সুবিধা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যার শিকার হন দেশের বিরাট জনগোষ্ঠী। সরকার হাসপাতাল ও মেডিকেলে যে সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে তার পুরো অগ্রাধিকার ভোগ করতে পারেন না অধিকাংশ রোগী। এ রকম নানা অভিযোগ প্রায় রোগীর মুখে শোনা যায়। অধিকাংশ ডাক্তার সরকারি হাসপাতালের চেয়ে নিজের চেম্বার কিংবা ক্লিনিকে রোগীর চিকিৎসা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফলে অনুপস্থিতি বাড়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে।

সম্প্রতি সরকারি এক জরিপে জানা গেছে ৬০ শতাংশ চিকিৎসক তাদের ডিউটি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, কোনো কোনো উপজেলা একজন চিকিৎসক দিয়েই সেবা চলছে। আবার কোনো উপজেলায় বাই রোটেশনে চিকিৎসকরা দায়িত্ব পালন করেন। উপজেলায় পদায়ন করা হলেও উচ্চপর্যায়ে তদবির করে অনেকে প্রেষণে অথবা সংযুক্তি নিয়ে পছন্দমতো কর্মস্থলে চলে যান। আবার অনেকে অনুমতি ছাড়াই বছরের পর বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোও ফাঁকা পড়ে আছে। এই জরিপ অনুযায়ী দেশের ডিউটিরত ডাক্তারদের খামখেয়ালি ও রোগীর প্রতি অবজ্ঞার একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। যা মোটেও কাম্য নয়। ডাক্তারগন সরকারি প্রতিষ্ঠান বিমুখ হয়ে উঠছেন এটার উল্লেখযোগ্য কারণ খুঁজে পাওয়া যায় নি। তবে ধারণা করা যায় সরকারী সেবা প্রতিষ্ঠানে বেতনের সল্পতা ও পরিবেশের কারনেই অধিকাংশ ডাক্তার অনুপস্থিত থাকছেন। চিকিৎসকদের এমন অনুপস্থিতি রোগীদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসকদের মুল উদ্দেশ্য অর্থ উপার্জন নয়, বরং রোগীর পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া। কিন্তু দিন দিন চিকিৎসক তাদের এই প্রতিপাদ্য থেকে সরে আসছেন, যা সত্যিই দুঃখজনক। চিকিৎসকরা অনেক কষ্টের পাহাড় পেরিয়ে চিকিৎসক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। তাই সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সুবিধা থাকা বাঞ্ছনীয়। সরকারের এই বিষয়ে সুনজর দেওয়া উচিত। চিকিৎসকদের কর্মস্থলের পরিবেশ যেন চিকিৎসকবান্ধব হয়; সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। করোনার এই দুঃসময়ে আসুন আমরা সকলেই পরস্পর প্রীতিসুলভ আচরণ করি। চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে একটি সুসম্পর্ক গড়ে তুলি।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"