বিশ্লেষণ

চীন-ভারত কি যুদ্ধে জড়াবে

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২০, ০০:০০

অলোক আচার্য

বিশে^র পরাশক্তিগুলোর মধ্যে রেষারেষি নতুন কিছু নয়। চীন এবং ভারত কেবল দুই দেশই প্রতিযোগিতামূলক বিশে^ নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে রয়েছে। উভয় দেশই পরমাণু অস্ত্র-সমৃদ্ধ এবং প্রতিনিয়তই অস্ত্রভান্ডার সমৃদ্ধ করে চলেছে। চীনকে বলা হয় বর্তমান সময়ের সুপার পাওয়ার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যার দ্বন্দ্ব বহু বছর ধরে লেগে আছে। তবে সম্প্রতি ভারত-চীন দুই দেশের প্রবল উত্তেজনা এবং যুদ্ধাবস্থা বিশে^ হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। সমরাস্ত্র ভান্ডার শক্তিশালী করতে দুই দেশের কেউ পিছিয়ে থাকতে চাইছে না। বিশ বছর ধরে ভারত চীন সমরাস্ত্র তৈরির পাশাপাশি অস্ত্র আমদানিও করেছে। ভারত টানা পাঁচ বছর বিশে^র সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হিসেবে নাম লিখিয়েছিল। এসব রফতানিকারক দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, রাশিয়া।

চীনের তৈরি অস্ত্র পেছনে ফেলছে পশ্চিমা বিশে^র তৈরি অস্ত্রকে। অস্ত্রের বাজারেও তাই চীনের আধিপত্য। ভারত চীন সীমান্তের লাদাখে দুই দেশের সেনাদের সংঘর্ষের পর থেকেই কূটনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে অবস্থান করছে। কিন্তু তাতে প্রাথমিক শান্তির বার্তা এলেও কেউ তার অবস্থান থেকে সরে আসেনি। চীন অস্ত্র এবং বাণিজ্যে বর্তমান বিশে^ সুদৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। এশিয়ায় চীনা পণ্যের প্রসার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে ভারতের অভ্যন্তরে চীনবিরোধী মনোভাব প্রবল হচ্ছে। চীনাপণ্যে বয়কটের ডাক উঠেছে। কিন্তু বাস্তবতা আসলে কী? চীনাপণ্য বয়কট করে ভারতের অভ্যন্তরীণ কয়েকটি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা কতটুকু সম্ভব হবে, তার বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে হবে। বেশ কয়েক বছর ধরেই চীন তার বলয়কে শক্তিশালী করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যা চীনবিরোধীদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। ভারত-চীন মধ্যকার সংঘাত নতুন নয়।

১৯৬২ সালে অরুণাচল ও আকসাই চীন নিয়ে দুই দেশের সীমান্তে যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধে চীনা সেনাবাহিনী এ দুটি অঞ্চল দখল করে নেয়। পরে চীন অরুণাচল ভারতকে ফিরিয়ে দেয়। তার দুই বছর পর ১৯৬৭ সালে নাথুলা ও চাওলার যুদ্ধে চীন পরাজিত হয়। ১৯৮৭ সালে অরুণাচলের সুলুলা ও বুমলাতে দুই দেশের সেনা মুখোমুখি হয়। ভারতের তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী এনভি তিওয়ারি বেইজিং গেলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। ২০১৩ সালে ফের নিয়ন্ত্রণরেখায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৭ সালে ডোকালামে ৭৩ দিন মুখোমুখি অবস্থানে থাকে দুই দেশের সেনাবাহিনী। এ বছরের মে মাসে পেংগং লেকের পাশে পাথর ছোড়াছুড়ি ও হাতাহাতিতে জড়ায় দুই দেশের সেনাবাহিনী। বর্তমান সময়ে কোনো দেশ বিশেষ করে সমরাস্ত্র সক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলো একটি বলয়ের ভেতর থেকে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে। চীনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক বেশ কয়েক বছর ধরেই ঘনিষ্ঠ। অবশ্য ভারতের সঙ্গেও রাশিয়ার সম্পর্ক মধুর সেই বহু বছর আগে থেকেই। এদিকে পাকিস্তান ও মিয়ানমারের চীনের সঙ্গে সখ্য বেশি। তবে নেপাল ও ভুটানের সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগ ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কে চিড় ধরিয়েছে বলেই মনে হয়; যা ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি।

চীনের সঙ্গে ভারতের দ্বন্দ্বের ভেতরেই এই উদ্যোগ তাই অনেক প্রশ্ন জন্ম দিচ্ছে। ভারত লিপুলেখের সঙ্গে তিব্বতের মানস সরোবরে যাওয়ার নতুন রাস্তা তৈরি করে যাতে নেপাল প্রতিবাদ জানায়। অথচ দুই বছর ধরে রাস্তা নির্মাণের কাজ চললেও নেপাল কিছু বলেনি। তাছাড়া উত্তরাখন্ডের তিনটি বিতর্কিত এলাকা নিজেদের মানচিত্র অন্তভুক্ত করে নেপাল যা অবাক করে দেয়। কারণ এই সময়টা এমন এক সময় যখন ভারত-চীন মুখোমুখি অবস্থানে দাড়িয়ে। অনেকে মনে করেন এর পেছনে হয়তো চীনের আশকারা রয়েছে। এদিকে ভুটানও যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাও বেশ অবাক করার মতো। ভারতীয় চাষিদের পানি দেওয়া বন্ধ করে দিল ভুটান বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। যদিও সেচের পানি আটকে দেওয়ার খবরকে গুজব বলে দাবি করেছে ভুটান। ভারতীয় কর্তৃপক্ষও স্বীকার করছে প্রাকৃতিক কারণেই পানি আটকে গিয়েছিল এবং বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

সে হিসেবে একই সঙ্গে চার প্রতিবেশীর না হলেও তিন প্রতিবেশীর (চীন, পাকিস্তান, নেপাল) চাপের মুখে রয়েছে ভারত। এই ঘটনাকে তাই ভিন্নভাবে দেখছে না কেউ। কিন্তু শক্তির ভারসাম্য এমন একটি বিষয় যা সবসময় চাপেই রাখে। ভারত যেমন তার প্রতিবেশী নিয়ে বিরূপ অবস্থার মধ্যে রয়েছে চীনও খুব একটা শান্তিতে নেই। দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বাড়ানোকে কেন্দ্র করে জাপানের সঙ্গেও চীনের সংঘাতের মাত্রা বেড়েছে। চীন সাগরের সামনেই প্যাট্রিয়ট পিএসি থ্রি এয়ার ডিফেন্স মিসাইল সিস্টেম মোতায়েন করেছে জাপান। সরাসরি যার লক্ষ্য চীনের দিকে। জাপান জানিয়েছে, চলতি মাসের মধ্যেই চারটি সেনাঘাটিতে পিএসি থ্রি এমএসই মিসাইল বসানো হবে। চীন সীমান্তে জাপান সেনার সংখ্যাও বেড়েছে লক্ষণীয় হারে। আবার মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট মাইক পম্পেও বলেছেন, ভারত ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার জন্য চীন বিপজ্জনক হয়ে ওঠাই ইউরোপ থেকে সেনা সরানোর অন্যতম কারণ। চীনা হুমকি সামলাতে এশিয়ায় সেনা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধে জড়িয়ে পড়াটা ভারত বা চীন কারো জন্যই সুখকর হবে না। এমনকি তা এশিয়ার জন্যও দুর্ভোগ ডেকে আনবে। এর একমাত্র সমাধান হলো আলোচনায় বসা। যা ইতিমধ্যেই দুই দেশের মধ্যে হয়েছে। সর্বশেষ আলোচনার পর দুই দেশ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা থেকে সেনা সরাতে রাজি হয়েছে। কিন্তু উপগ্রহের চিত্রে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ১৫ জুন হওয়া সংঘর্ষস্থলের কাছে চীনের বড়মাপের নির্মাণকাজ চালানোর ছবি ধরা পড়েছে উপগ্রহের চিত্রে। ভারতও সীমান্তে আরও সৈন্য পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এতে বোঝা যায়, যত সহজে সমস্যার সমাধান হবে ভাবা হয়েছিল বিষয়টি অতটা সহজ হবে না।

কিন্তু যুদ্ধ এড়াতে হলে দুই দেশকেই অতীত থেকে হিসাব মেলাতে হবে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ দুই দেশের এই সীমান্ত অস্থিরতা কেবল এই দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তা ছড়িয়ে পড়বে বিশ^ব্যাপী। কারণ শক্তির ভারসাম্যের বলয়ে দুই দেশেই রয়েছে। চীন থেকে শুরু হয়ে সারা বিশে^ করোনা ছড়িয়ে পরায় দেশগুলো এখন করোনা মোকাবিলায়ই হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের অভ্যন্তরে করোনার আক্রান্ত দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা মোকাবিলায় দেশটি ব্যস্ত রয়েছে। আবার দেশের অভ্যন্তরেই চীনবিরোধী মনোভাব স্পষ্ট হচ্ছে। ভারত-চীন মধ্যেকার সমস্যা নিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও উদ্বিগ্ন। তিনি সমস্যা সমাধানে তাগিদ দিয়েছেন। রাশিয়াও দুই দেশের মধ্যস্থতার চেষ্টায় রয়েছে। সবমিলিয়ে দুই দেশই হয়তো চুড়ান্ত যুদ্ধের মতো কোনো সিদ্ধান্তে পৌছাবে না। কারণ যুদ্ধ মানেই ধ্বংস। কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দুই দেশই। দুই দেশই শুধু নয়, সরাসরি যুদ্ধে অন্য কোনো দেশ না জড়ালেও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের সংখ্যা কম হবে না। দুই দেশেরই উচিত হবে সীমান্ত-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কূটনৈতিকভাবে একটি সফল সমাধানে পৌঁছানো।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"