পর্যবেক্ষণ

কোথায় নিয়ে যাচ্ছে করোনা

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২০, ০০:০০

ডা. এস এ মালেক

মরণব্যাধি করোনার আক্রমণ শুরু হয়েছিল গত ৭ মাস আগে। তখন এক মাসে আক্রান্ত হয়েছিল ১০ হাজারের বেশি মানুষ। মৃত্যুর সংখ্যাও ছিল কম। পরে ১ মাসে আক্রান্ত হয় ৫০-৬০ হাজার, এখন বিশ্বব্যাপী আক্রান্তের সংখ্যা ১ কোটি। মৃতের সংখ্যা ৫ লাখ। ৫০-৬০ লাখ লোক ভালো হয়েছে। চীনের উহান প্রদেশে শুরু হয়েছিল এবং সেখানে ২ মাসে প্রায় সাড়ে চার হাজার লোক মারা যায়। ভাইরাস ইউরোপে প্রবেশের পর ইতালিতে দ্রুত প্রবেশ করে। আর এখন তো বিশ্বব্যাপী। ১৮৮ দেশে এই ভাইরাস সক্রিয়ভাবে বিস্তার করেছিল। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ লাখের মতো; আর মারা গেছে ১ লাখ ২৫ হাজার। মোট মৃত্যুর সংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। এরপর স্থান হলো ব্রাজিলে, সেখানে প্রায় ৫৭ হাজার লোক মারা গেছে। আক্রান্ত হয়েছে ১৩ লাখের বেশি। যুক্তরাজ্যে ৪৩ হাজার মৃত্যুবরণ করেছে। সর্বশেষ উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় ভাইরাসের আক্রমণ নতুনভাবে শুরু হয়েছে। এ অবস্থার একটু উন্নতি হওয়ায় আমেরিকার যেসব জায়গায় লকডাউন শিথিল করা হয়েছিল; সেখানে আবার লকডাউন কঠোর করা হয়েছে। আসলে করোনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতির যে ক্ষতিসাধন হয়েছে মনে হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও তা হয়নি। শিল্পন্নোত দেশসমূহে তো শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ায় লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। সরকার অনুদান দিয়ে তা বাঁচিয়ে রাখবার চেষ্টা করছেন।

অর্থনীতির চাকা অনির্দিষ্টকাল বন্ধ থাকলে অনেক দেশে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেবে। অধিকাংশ দেশেই চিন্তা করছে কীভাবে অর্থনীতি মোটামুটি সচল রেখে করোনা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এতে একেক দেশ একেক পদ্ধতি অনুসরণ করছে। এখন বৃহত্তম জায়গায় লকডাউনের পরিবর্তে স্বল্প পরিসরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কঠোর লকডাউনের প্রবর্তন করা হচ্ছে। বাংলাদেশও অঞ্চলভিত্তিতে লকডাউন কার্যকর করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে প্রথম দিকে লকডাউন যেভাবে সফল হয়েছিল পরে কিন্তু তার ধারা অব্যাহত থাকেনি, কারণ বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কারণে লকডাউন সফল করা সম্ভব হয়নি। দিনমজুররা করোনায় মৃত্যুর ভয় করে না। দৈনিক খাবার সংগ্রহে বের হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা উৎপাদন ব্যবস্থাকে বন্ধ রেখে অর্থনীতিকে অচল করে অনির্দিষ্টকাল লকডাউন রাখা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময় মত দিলেও তবে টেকসই মতামত এ পর্যন্ত কেউ দিচ্ছেন বলে মনে হয় না। তাছাড়া একেক দেশের সংকট একেক রকম। একই দেশের বিভিন্ন স্থানের সংকট বিভিন্ন রূপ। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ কখন আক্রান্ত হবে তার কোনো ঠিক নাই। করোনায় দেশ যখন বিপর্যস্ত তখন ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আঘাত হানল। প্রায় ১৪টি জেলায় হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন, আশ্রয়হীন ও খাদ্য সংকটে পড়ল। সরকারকে করোনার সঙ্গে সঙ্গে এই ভয়াবহ এই দুর্যোগকেও মোকাবিলা করতে হলো। প্রায় ২২ লাখ মানুষের আশ্রয়, খাবার, চিকিৎসা প্রদান করা হলো। তারপর এলো পুনর্বাসন; যা করতে যথেষ্ট অর্থের প্রয়োজন হবে। করোনার কারণে প্রায় ৭ কোটি মানুষকে খাবার দিতে হচ্ছে এবং আবার ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কারণে ৩০ লাখ মানুষকে দেখতে হচ্ছে।

দেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা একটু কম হলেও তবে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। রোগটি এখন কমিউনিটি পর্যায়ে বিস্তার করেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। লকডাউন দিয়েও খুব ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এখন কোন পথে এগোতে হবে; তা সময় ও বাস্তবতাই নির্ধারণ করে দেবে। অনেকে বলছেন, আমরা বহুসংখ্যক লোকের পরীক্ষা করতে পারছি না বলেই আমরা আক্রান্তের সংখ্যায় কম। তাছাড়া প্রথম থেকে কঠোর ব্যবস্থা নিলে রোগটি ছড়াত না। তাই দেশব্যাপী রোগটির বিস্তার ঘটছে। একটা সুনির্দিষ্ট হারে না পৌঁছা পর্যন্ত মনে হয় মৃত্যের সংখ্যা থামবে না। এ কথা ঠিক, করোনা ম্যানেজমেন্টে আমাদের কিছু ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকারি, বেসরকারি মালিকানাধীন হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে বলে মনে হয় না। আমাদের চিকিৎসকেরা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রথম থেকে আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণের কারণেই তাদের ভেতর ভীতি সঞ্চার হয়েছে। ভীতি সঞ্চার হয়েছে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মীদের। প্রথম দিকে ডাক্তার, নার্স, পুলিশ-সেনাবাহিনী যেভাবে কাজ করছিলেন; এখন তাতে কিছুটা শিথিলতা দেখা দিয়েছে। এটা হয়তো মনস্তাত্ত্বিক কারণে। জীবনের মায়া প্রত্যেকেরই আছে। সহকর্মীদের মৃত্যুবরণ করতে দেখে অনেকে হয়তো ভয় পেয়েছেন। তবে আশার কথা সরকার বিভিন্নভাবে উৎসাহ ও প্রণোদনা জোগাচ্ছে।

আবার এটাও ঠিক করোনা রোগীর চাপ অনেক বেশি। শনাক্ত হলেই মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে চায়। তবে ৭৫ শতাংশ রোগী বাসায় রেখে চিকিৎসার যোগ্য, তবে বাসায় রেখে চিকিৎসা করতে হলে কঠোর শৃঙ্খলা মানতে হবে। করোনার কারণে আমাদের সোস্যাল অর্ডারে একটা পরিবর্তন এসেছে। এ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। বর্তমানে যে করোনা সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে মানুষ এখনো অভ্যস্ত হতে পারেনি। মা-বাবা তার সন্তানদের আগে যেভাবে আলিঙ্গন করেছেন; তা এখনো চলেছে। হাঁচি-কাশি ও যেখানে-সেখানে এখনো থু থু ফেলা হচ্ছে। প্রতিদিনের খাবারে যে বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন, তা গরিব-দুঃখী মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশ সরকার অনুমোদন দেওয়ার পর বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেও তা কার্যকর করা যাচ্ছে না, উপরন্তু রয়েছে অপপ্রচার। বিভিন্ন কারণে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা। যা সত্য নয়; তাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করার ষড়যন্ত্র। যেখানে মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার বিষয় জড়িত; সেখানে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত টেনে আনা কি যুক্তিসংগত। করোনার মতো মহাসংকটের মোকাবিলা কোনো সরকারের পক্ষে একা সম্ভব নয়। জনগণের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রয়োজন। বিরোধী দল আছেন; তবে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য নয়। সরকারকে সংকটাপন্ন করাই তাদের লক্ষ্য। বিরোধী দল চেষ্টা করছে রাজনৈতিকভাবে সরকারকে মোকাবিলা করা যখন সম্ভব নয়, তখন করোনার সংকট ঘনীভূত করে তার দায়দায়িত্ব সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। শুধু বিরোধী দল নয়, কিছু অতি বাম ও দক্ষিণপন্থি বুদ্ধিজীবীও এমনভাবে বলছেন ও লেখছেন তাতে মনে হয় সরকারই করোনা নিয়ে এসেছেন এবং সব সংকটের দায়ী। কোনো কোনো বিরোধী দলের নেতারা টিভির পর্দায় এমনভাবে কথা বলেন, যেন তাদের দল ক্ষমতায় থাকলে এভাবে করোনায় বাংলাদেশের মানুষের মৃত্যু হতো না। সবারই মনে রাখা উচিত, যে সংকট গোটা বিশ্বকে চরম বিপর্যয়ে ঠেলে দিয়েছে, যা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে প্রতিটি দেশের সরকার। সেক্ষেত্রে অহেতুকভাবে সরকারকে দায়ী করা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে না। সরকারের ভুলভ্রান্তি আছে, তবে আন্তরিকতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংকট মোকাবিলা করছেন নাÑ এটা বলা অত্যন্ত অনুচিত।

করোনার এখনো কোনো প্রতিষেধক বের হয়নি। কবে হবে, তাও বলা যায় না। ঘণ্টায় ঘণ্টায় যে প্রতিষেধক আবিষ্কারের কথা বলা হচ্ছে; তা কার্যকর নাও হতে পারে। হয়তো করোনা নতুন কোনো সংস্কৃতির পথে আমাদের যেতে বাধ্য করবে। তা ছাড়া ভ্যাকসিন চিরস্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নয়। এটি এমন ভাইরাস যার গতি ও প্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তনশীল। হয়তো দেখা যাবে কয়েক মিলিয়ন ভ্যাকসিন ব্যবহারের পর করোনাভাইরাসের প্রকৃতিতেও পরিবর্তন আসছে অথবা রেজিস্ট্রেড স্টেড ডেভেলপ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই ভাইরাসের সঙ্গে আমাদের কত দিন সহাবস্থান করতে হবে, তা সঠিকভাবে নিরূপণ করা যাচ্ছে না। তবে যে নীতি সরকারকে এখন মেনে চলতে হচ্ছে, তা হচ্ছে যতদূর সম্ভব শিল্প-কারখানা ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে চালু রেখে করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করা। অর্থনীতিকে অচল করে দিয়ে করোনা নিয়ন্ত্রণকে সচল করা হয়তো সম্ভব নয়। করোনা সংস্কৃতির রূপ কী হবে, বিশ্বের কোথায় কোন ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। তবে শত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও আমরা সব দুর্যোগ মোকাবিলা করেই সামনে এগিয়ে যাব। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, ইনশাআল্লাহ দেশ করোনামুক্ত হবে এবং আধার কেটে যাবে এক দিন।

লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট

 

"

সর্বাধিক পঠিত