মুক্তমত

পাহাড়ধসে প্রাণহানি রোধে করণীয়

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২০, ০০:০০

দিলীপ কুমার আগরওয়াল

করোনা মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী এক মহাদুর্যোগ চলছে। শুধু যে ব্যাপক প্রাণহানি হচ্ছে তা-ই নয়, মন্দার করালগ্রাস শুরু হয়ে গেছে অনেক দেশেই। মানুষ কাজ হারাচ্ছে। হু হু করে বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। আয়-উপার্জন কমে যাচ্ছে, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী বাড়ছে খাদ্যাভাব বা দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, করোনার পাশাপাশি খাদ্যাভাবেও বহু মানুষ মারা যাবে। বাংলাদেশও এমন আশঙ্কার বাইরে নয়। লকডাউন বা সাধারণ ছুটির কারণে উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বহু শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে ছোটখাটো কারখানা বা প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক, দিনমজুর, হকারসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করা লোকজন। যেসব নিম্ন আয়ের মানুষ সাধারণত কায়িক শ্রম বিক্রি করে কিংবা দিনমজুরি করে, তারা পড়েছে সবচেয়ে বেশি বিপদে। সাধারণ ছুটির শুরুতে তাদের হাতে সামান্য সঞ্চয় ছিল, সরকারিভাবে পর্যাপ্ত ত্রাণ বা খাদ্য সাহায্য দেওয়া হচ্ছিল, তাতে তারা কোনো রকমে চলতে পেরেছে। এখন তাদের হাতে কোনো সঞ্চয় নেই, কাজ নেই, আয়-উপার্জন নেই; ফলে দুবেলা দুমুঠো আহার জোগানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে স্থবিরতা আসায় বৈশ্বিক রেমিট্যান্সও কমবেÑ এমন পূর্বাভাস ছিল। মহামারি ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরাও সংকটে রয়েছেন। এরপরও দেশে থাকা স্বজনদের কথা ভেবে তারা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে বৈধ পথ বেছে নেওয়ায় নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রদানকারী প্রবাসীদের নগদ ২ শতাংশ প্রণোদনা, হুন্ডি নিরুসাহিতকরণসহ নানামুখী পদক্ষেপের কারণে বৈধ পথে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ১৭ জুন পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হুন্ডি চক্রকে ভাঙতে পারলে এ প্রবাহ আরও বাড়বে। হুন্ডি চক্রের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে হুন্ডির ফাঁদে পড়ে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রবাসীরা। বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়াতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা ঘোষণা করে সরকার। সে অনুযায়ী প্রবাসীরা প্রতি ১০০ টাকার বিপরীতে ২ টাকা প্রণোদনা পাচ্ছেন। ওই ঘোষণার পরপরই বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে থাকে। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির শুরুতে রেমিট্যান্সে ধস নামলেও গত ঈদুল ফিতর কেন্দ্র করে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এ ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

বর্তমানে যে রিজার্ভ রয়েছে তা দিয়ে অন্তত ছয় মাসের আমদানি ব্যয় পরিশোধ করা সম্ভব বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছর ১৭ জুন পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ১৬ দশমিক ৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেকর্ড। করোনা সংকটকালেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে এটা নিঃসন্দেহে সুখকর বিষয়। তবে যেসব প্রবাসী দেশে ফিরে এসেছেন, করোনা-পরবর্তী তাদের কর্মস্থলে ফেরত পাঠাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বৈদেশিক শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার ও নতুন বাজার অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

জীবিকার সন্ধানে বা বেকারত্ব ঘোচাতে যারা প্রবাসে পাড়ি দেন, তারা শুধু পরিবারের জন্য সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনেন না, দেশের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ভূমিকা রাখেন। বারবার এটি প্রমাণ হয়ে আসছে। অর্থনীতির বড় একটি নিয়ামক শক্তি প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ। এই অর্থে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। আমরা জানি দেশের ক্রান্তিলগ্নে অর্থাৎ যখন বিএনপি-জামায়াতের অপরাজনীতির কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল না, তখনো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশকে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়তে দেয়নি। অনেকে মনে করেছিলেন, করোনাভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বে সংকট। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও লকডাউনের কারণে অনেক কর্মী কাজ হারিয়েছেন। এতে ধারণা করা হয়, রেমিট্যান্সের পরিমাণ খুবই কমে যাবে। তবে তা হয়নি। বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। এটা আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় সুখবর। কোরবানি ঈদের আগে রেমিট্যান্স আরো বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

লেখক : সহসভাপতি, এফবিসিসিআই

 

"