পর্যবেক্ষণ

জীবন-জীবিকা নিয়ে ভাবনা

প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২০, ০০:০০

বিল্লাল বিন কাশেন

জীবনের হিসাব মেলানো সত্যিই কঠিন। গত কয়েক মাস আগেও অনেকে জীবন-জীবিকা নিয়ে এমন ছন্দপতনের কথা ভাবেননি। ছদ্মনাম মাধবী বিশ্বাস। রাজধানীর নামি একটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের গানের শিক্ষক। সংসার বৈরাগী হলেও বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে রাজধানীতে ছোট বাসা নিয়ে থাকেন। বৃদ্ধ মা বাবার জমানো কিছু সঞ্চয়, স্কুলের মাসিক বেতন আর কয়েকটি গানের টিউশনি দিয়ে ন্যূনতম সুখেই দিন যাচ্ছিল। করোনায় এখন টিউশনি বন্ধ। করোনার মধ্যেও গত মাস পর্যন্ত স্কুলের বেতন পেয়েছেন। এ মাসে স্কুল থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে স্কুল চালু না হওয়া পর্যন্ত বেতন বন্ধ থাকবে। স্কুল চালু হলেও তার চাকরিটা থাকবে কি না, তা নিয়ও দুশ্চিন্তা আর অবসাদে শরীর ঠান্ডা হিম হয়ে আসছে। রাজধানীতে বা আত্মীয়-পরিজনও কারো কাছ থেকে কখনো হাত পাততে হয়নি। গত তিন মাসে বাজার খরচ কমানো হয়েছে। বাসা ভাড়া আর ওষুধের খরচ তো কমানো সম্ভব হচ্ছে না।

ছদ্মনাম তাশা। নারী সংবাদকর্মী। গত ৯ বছর দেশের প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়াতে কাজ করছেন। রিপোর্টিংয়ের পাশাপাশি ডেস্কে কাজেরও পারদর্শিতা আছে। গত তিন বছর ডেস্কেই কাজ করছেন। সংকটময় এ পরিস্থিতিতে বাসায় বসেই কাজ করছিলেন। করোনায় একদিকে কাজের চাপ; অন্যদিকে চাকরি হারানোর শঙ্কা নিয়েই কাজ করছিলেন। অনলাইনের বেশির ভাগ পোর্টালেই দেওয়া হয় না কোনো নিয়োগপত্র। তাই চাকরিচ্যুত হলেও করণীয় কিছু নেই। সংকটের এ সময় চাকরি হারিয়ে এখন বাসাতেই হাত গুটিয়ে বসে সংকট উত্তরণের প্রহর গুনছেন। রাজধানীসহ সারা দেশে এ রকম লক্ষ কোটি মানুষ চাকরি হারিয়ে, বেতন হারিয়ে বাসায় বসেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

গণমাধ্যম কর্মী, পর্যটন শিল্পে কর্মরত মানুষ, আবাসন শিল্পের লোকবলসহ নানা পেশার মানুষ চলছেন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। করোনার ছোবলের চেয়ে বেঁচে থাকার যুদ্ধ এখন বড় হয়ে গেছে এসব মানুষে কাছে। দেশের নি¤œ মধ্যবিত্ত শ্রেণির যে কি দুরবস্থার মধ্যে দিনাতিপাত করছে সেটা কল্পনাও করতে পারছেন না অনেকে। এ বৃত্তের মানুষগুলো না পারছেন কারো কাছে হাত পাততে, না পারছেন কারো কাছে বলতে।

ধারণা করা হচ্ছে, করোনার প্রভাবে বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক কর্মজীবী মানুষ কর্মচ্যুত হবেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাবমতে, করোনার কারণে বাংলাদেশে চাকরি হারানোর তালিকায় যুক্ত হতে পারেন অন্তত দেড় কোটি মানুষ। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছন এমনটিই। এটা বাংলাদেশের জন্য খুবই খারাপ খবর। এই দেড় কোটি মানুষ চাকরি হারালেও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে অন্তত ৫ কোটি মানুষ (প্রতি পরিবারে গড়ে চারজন করে সদস্য)।

দুই. দেশের গন্ডি পেরিয়ে এবার আসি পাশের দেশ ভারতে। নোনাওয়াল্লা। চব্বিশ বছর সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন একটি সর্বভারতীয় দৈনিকের সানডে ম্যাগাজিন বিভাগে। পরিচিত লেখনী সাংবাদিক মহলে, পাঠকদের কাছেও স্বীকৃত। কিছুদিন আগে একটি ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন, ‘আমার আর চাকরি নেই। শুধু আমার নয়, ম্যাগাজিন বিভাগের সবার চাকরি গেছে। চব্বিশ বছর কাগজকে ভালোবেসে কাজ করেছিলাম। একটা ফোন এসব শেষ হয়ে গেল। অনিশ্চিত হলো জীবন।’

শুধু নোনা নন, বেতন অর্ধেক করা হয়েছে একটি ইংরেজি সংবাদপত্রের কর্মীদের। মাইনে কমেছে বাণিজ্য সম্পর্কিত একটি সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের। একটি টেলিভিশিন চ্যানেলের ডিজিটাল বিভাগের ১৬ জন কর্মীকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি ডিজিটাল সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম কর্মী সংখ্যা অর্ধেক করে দিয়েছে। একটি টেলিভশন চ্যানেল ৪৬ জন রিপোর্টার, ছজন ক্যামেরা পারসন, ১৭ জন প্রডিউসারকে আপাতত ছুটি দিয়েছে। একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক মুদ্রণ বন্ধ করে ডিজিটাল ফর্মে গেছে। কলকাতার খবরের কাগজগুলো কলেবরে সংক্ষিপ্ত হয়ে ডিজিটাল সংস্করণে জোর দিয়েছে বেশি। সব মিলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। করোনার কারণে এ অবস্থা মনে করা হলেও কেউ কেউ এরমধ্যে দুরভিসন্ধিও দেখছেন। খরচ কমানোকে উদ্দেশ্য করেই নাকি এই করোনা হাতিয়ার।

সাংবাদিকরা কিন্তু করোনার ছায়ায় অনিশ্চয়তার কায়াই দেখছেন। এরমধ্যে বৃহস্পতিবার নিউজ ব্রডকাস্টিং স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি নির্দেশ দিয়েছে, করোনার খবর করতে সাংবাদিকরা মুখে মাস্ক পরেও আর যত্রতত্র যেতে পারবেন না। একটি সর্বভারতীয় চ্যানেল তাদের ৪০ জন সাংবাদিক, অসাংবাদিক কর্মীকে মুম্বাইয়ের বান্দ্রাতে একটি হোটেলে রেখে করোনা কাভারেজ করাচ্ছিল। এদের মধ্যে তিনজন করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে। বাকি ৩৭ জনকে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। এরপরই নিউজ ব্রডকাস্টিং স্ট্যান্ডার্ড অথরিটির এই সিদ্ধান্ত।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাসের কারণে আগামী তিন মাসের মধ্যে বিশ্বে সাড়ে ১৯ কোটি মানুষ তাদের পূর্ণকালীন চাকরি হারাতে যাচ্ছেন। যার মধ্যে সাড়ে ১২ কোটি মানুষ বসবাস করেন এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে। সারা বিশ্বেই বেকারত্ব বাড়ছে। করোনা সংকট মোকাবিলায় অনেক প্রতিষ্ঠানই কর্মী ছাঁটাইয়ের চিন্তায় আছে। এতে করে বেতন দিতে হবে কম। ক্ষতি কিছুটা পোষাবে বা ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে ফ্লোতে আসতে টুকটাক সময় লাগবে, তাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত। খোদ আইএমএফ বলছে, চাকরি হারানো মানুষের সংখ্যা কম হবে না। সারা বিশ্বেই যখন এ সমস্যা হবে, তখন বাদ যাবে না যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালির মতো বড় বড় দেশ। তা ছাড়া এখন পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ এই দেশগুলোতেই বেশি।

আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ থেকে শুরু করে ১০ ভাগের ওপরে মানুষ চাকরি হারাবে এ সময়ে। যেখানে ইউরোপ, আমেরিকা এই সংকটে, সেখানে এশীয় দেশগুলো আর কীভাবে বাদ যাবে! এশিয়ায়ও এই সংকট দেখা যাবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইতোমধ্যে অনেক বাংলাদেশি কর্মহীন হয়ে পড়ছেন।

তিন. মহামারি নিয়ে দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত ইসরায়েলের ইতিহাসবিদ ও জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউভাল নোয়াহ হারারির একটি লেখার দিকে আলোকপাত করব। তার ভাষায়, হয়তো আর কিছুদিন পর প্রবল পরাক্রমশালী এই করোনা থেমে যাবে। তখন টিকে থাকার জন্য এখন যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে কিংবা যে বিকল্প নেওয়া হবে, ভবিষ্যতের দিনগুলোতে সেগুলোই জীবনধারা বদলে দিতে সহায়ক হবে। মানবসভ্যতা এখন এক বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করছে। সম্ভবত এই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সংকট করোনা। এ বদলে যাওয়াটা শুধু স্বাস্থ্য পরিষেবার নয়। বদলে যাবে অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির গতিপথ। এখন খুব শক্ত এবং স্থির কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে, দ্রুত নিতে হবে এবং মাথায় রাখতে হবে সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রভাব। এখন শুধু সাময়িক বিপদ উদ্ধারের কথা মাথায় রাখলেই চলবে না, বরং ভবিষ্যতে কেমন একটা পৃথিবীতে আমরা বাস করতে চাই, সেটিও মাথায় রাখতে হবে।

তার ভাষায়, ‘নানা ধরনের স্বল্পমেয়াদি জরুরি অবস্থা তখন আমাদের জীবনে হয়ে যাবে নিয়মমাফিকের মতো। খুব বড়সড় বিপর্যয় বা জরুরি অবস্থার চরিত্রই এ রকম। ঐতিহাসিক সব প্রক্রিয়াকে খুব দ্রুত ঘটিয়ে ফেলে। সাধারণ সময়ে আমাদের যে সিদ্ধান্ত নিতে এবং বাস্তবায়নে লেগে যেত বছরের পর বছর, বড়সড় বিপর্যয়ে তা হয় অসম্ভব দ্রুত। অপরিণত এমনকি খুব বিপজ্জনক প্রযুক্তিকেও এ অবস্থায় ঠেলেঠুলে কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়, কারণ ওর চেয়ে কিছু না করা আরো বেশি বিপজ্জনক। একটা দেশ তখন কিন্তু বেশ বড় মাপে একটা সামাজিক নিরীক্ষার জায়গা হয়ে যায়। যেমন সবাই বাড়িতে থেকে কাজ করলে এবং দূরত্ব মেনে যোগাযোগ বজায় রাখলে কী হয়? সব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে চলে গেলে কি ঘটনা ঘটবে? স্বাভাবিক সময় কোনো দেশের সরকারই এ ধরনের কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রাজি হতো না। কিন্তু এখন তো সময় স্বাভাবিক নয়। এক ক্রান্তিকাল আমরা পার করছি।’

গত কয়েক দশক আমরা পার করেছি মৃত্যু ভয়হীনতা নিয়ে। তবে মাঝে মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ আর কিছু দস্যুতা যে ছিল না তা নয়। তবে মানবসৃষ্ট সেটা দেশে দেশে বা অঞ্চলভেদে। বিশ্বময় এমন পরিস্থিতি হয়তো এ প্রজন্মের কেউ দেখেনি বলেই মনে হচ্ছে। জন্মালে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবেÑ এইাই স্বাভাবিক নিয়ম। গত ডিসেম্বরেও বিশ্বময় এমন পরিস্থিতি হবে; সেটা মানুষ কল্পনাতেও আনতে পারেনি। কিন্তু আজকের বাস্তব সত্য এটাই যে, প্রকৃতির জীবনহীন একটি অতিক্ষুদ্র একটি ভাইরাস গোটা দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। দুনিয়ার সব বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি এখন ছুটছে প্রতিষেধক আবিষ্কারে।

লেখক : কবি ও গল্পকার

[email protected]

 

"