মুক্তমত

আগামীতে চলার পথ কঠিন হচ্ছে

প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২০, ০০:০০

ডা. এস এ মালেক

চীনে যখন প্রথম উহান প্রদেশে মানুষ করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলো, তখন লকডাউন প্রক্রিয়া প্রথম থেকেই বেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হলেও প্রথম দুই মাসেই সেখানে প্রায় ৩ হাজার লোক করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এটা সম্ভবত প্রমাণ করে যে, লকডাউন প্রক্রিয়া যেভাবে করা উচিত ছিল; হয়তো তা যে কারণেই হোক সঠিকভাবে করা হয়নি। প্রথম থেকেই যিনি বা যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন আর তাদের সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল, এদের যদি সমাজের বাকি অংশ থেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করে রাখা যেত; এমনকি জরুরি প্রয়োজনেও ঘর থেকে বাহির হতে না দিয়ে বাইরে থেকে প্রয়োজন মিটানো হতো, তাহলে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রিত হতো বলে মনে হয়। পরবর্তীতে এটা যখন ইউরোপে ছড়িয়ে গেল একটার পর একটা দেশ আক্রান্ত হতে লাগল; মানুষের মৃত্যু ও সংক্রমণের সংখ্যা বেড়ে গেল। তখন আর পুরোপুরি লকডাউন করা সম্ভব হয়নি। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে যাওয়ার কারণেই সামাজিক দূরত্বের প্রশ্নটা আসে। আর সামাজিক দূরত্বের ব্যাপারটা এতই জটিল যে, এটা শুধু সরকারি নির্দেশের কারণেই সফল করা যায় না। বরং জনগণের সচেতনতা ও জনসংখ্যার অভ্যাসগত প্যাটানের ওপর নির্ভর করেছে। তাই স্বভাবগতই শুধু বাড়িতে বা নির্দিষ্ট এলাকায় কঠোরভাবে কোয়ারেন্টাইন নিয়ম সফল না হওয়ার কারণ হচ্ছে যে, জরুরি প্রয়োজনেই হোক বা যে কারণেই হোক কোয়ারেন্টাইন সফল করা যায়নি। সুতরাং শুধু বাড়িতে আবদ্ধ থাকলেই এই রোগ নিয়ন্ত্রিত হবে এরূপ প্রত্যাশা গোড়া থেকে করা শতভাগ সঠিক ছিল বলে মনে হয় না। ধরুন এটা কোয়ারেন্টাইন এলাকায় ১০ হাজার লোককে আবদ্ধ করে রাখা হলো। তার মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে ১০০ লোক। আর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বাকি ৪০০ লোক। এই ৫০০ লোক ছাড়া বাকি ৯ হাজার ৫০০ লোক সুস্থ। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত ও উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ৫০০ লোককে কঠোরভাবে আবদ্ধ রেখে বাকি ৯ হাজার ৫০০ লোককে যদি শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিক্ষেত্রে কর্মরত থাকতেন, তাহলে অর্থনীতিতে হঠাৎ করে সর্বাত্মক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হতো না। সুতরাং ৫০০ আক্রান্ত লোকের নিরাপত্তার কারণে ৯ হাজার ৫০০ সুস্থ লোককে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্মে অংশগ্রহণ করতে না দিয়ে মূলত অর্থনীতিকেই অচল করে দেওয়া হয়েছে। সে কারণেই সংকটের গভীরতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে করোনার মৃত্যু ও সংক্রমণের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। আর একই সঙ্গে অর্থনীতির চাকা বন্ধ হওয়ার কারণে গোটা সমাজে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ ও ক্ষুদ্র আয়ের লোকেরা যখন স্বাভাবিক জীবন-যাপন প্রণালি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, রোজগার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন এবং সে কারণে পরিবারের সদস্যরা অনাহারের সম্মুখীন হয়েছেন। বেকারত্বের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে গেছে। সবকিছু বিবেচনায় নিলে প্রথম থেকেই লকডাউন যতটা কার্যকারী করা সম্ভব হয়েছে; শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন ব্যবস্থা, তার থেকে দ্রুত কর্মক্ষমতা হারিয়ে বসেছে। জনসংখ্যার সুস্থ অংশকে আইসোলেট করে যদি প্রথম থেকেই উৎপাদন যন্ত্র চালু রাখা সম্ভব হতো; তাহলে অর্থনৈতিক সংকট থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়া যেত। শিল্পপ্রধান দেশগুলোতে যতটা গভীর সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, কৃষিপ্রধান দেশ কিন্তু সংকটের মাত্রা ততটা মারাত্মক হয়নি। বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে লকডাউনের কারণে কৃষি ব্যবস্থাপনায় যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি তা নয়। তবে গার্মেন্ট শিল্পশ্রমিকরা যে সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন, কৃষিকাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা ততটা হননি। বাংলাদেশের ছোট, মাঝারি ও বড় শিল্প-কারখানা যে ধরনের স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে, কৃষিক্ষেত্রে তা হয়নি। শ্রম সংকট কৃষিক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছিল, কিন্তু সরকার সুকৌশলে লকডাউন সিস্টেমকে অগ্রাহ্য করে কৃষিক্ষেত্রে শমিক নিয়োগের ব্যবস্থা করেছেন। যে কারণে এবারের প্রধান ফসল বোরো ধান ঘরে ওঠানো সম্ভব হয়েছে।

এখন শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর যেসব দেশ বিশেষ করে ইউরোপ অঞ্চলে করোনার আক্রমণ ভয়াবহ ধারণ করেছিল, এখনো চলছে বা আক্রমণের পরিমাণ কিছুটা শিথিল হয়েছে। সব ক্ষেত্রে সরকারকে করোনার কারণে অচল অর্থনীতিকে সচল করার উদ্যোগ নিতে হচ্ছে। কমবেশি সব দেশেই এই নীতি অনুসরণ করতে যাচ্ছে। এখানে যে দ্বন্দ্বটা এখন বেশ কিছুটা প্রকট বলে মনে হচ্ছে; তা যথাযথ বুদ্ধি বিবেচনার সঙ্গে সমাধাণ করতে না পারলে দেশে নতুন করে সামাজিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের বাইরেও সাধারণ জনগণের একাংশ মনে করছেন যে, দেশের করোনার আক্রমণ ও সংক্রমণ যখন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে; তখন বাংলাদেশ সরকার স্থবির অর্থনীতির ক্ষেত্রে গতি সঞ্চারের উদ্যোগ নিতে গিয়ে করোনা নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। প্রশ্ন উঠেছে ঈদের ছুটিতে বাড়িমুখী হওয়া জনসংখ্যার এক বিপুল অংশকে প্রথমে নিষেধাজ্ঞা জারি করে পরে আবার গ্রামে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো কেন? এসব নিয়ে বিতর্ক চলছে। তাছাড়া শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন, বিতরণ ব্যবস্থা সবকিছু যেখানে বন্ধ রয়েছে, সেখানে তো সংশ্লিষ্ট মানুষের জীবনযাত্রাই অচল। এসব কর্মচারীদের তো সরকার অনির্দিষ্টকাল খাবার সরবরাহ করতে সক্ষম নন। আর সব লোককে যদি সরকারের খাওয়ানোর সামর্থ্য থেকেই থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক চাকা বন্ধ হওয়ার কারণে সংকটের প্রকৃতি কী ধরনের আকার ধারণ করবে? অনেকে বলছেন, সরকার জনগণের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার ব্যাপারে কঠোর হয়নি কেন? সরকার যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিত যে, যেকোনো মূল্যে গ্রামের দিকে যাওয়া যাত্রীদের প্রতিহত করতে হবে। তাহলে অবস্থাটা গিয়ে দাঁড়াত কোথায়। জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ যেখানে গণতান্ত্রিক সরকারের পাশে, তাদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হওয়া সমুচিত ছিল কি? আর এরূপ সংঘাতের ফল কী হতে পারত। বাংলাদেশ একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়; বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রয়েছে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ রয়েছে। বাংলাদেশে বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পপতির রয়েছে আর্থিক বিনিয়োগ। ইচ্ছা করলেই বাংলাদেশ একক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। অনেকে ক্ষুব্ধ এই ভেবে, হঠাৎ করে কেন গার্মেন্টশিল্প চালু করা হলো? বাস্তবতা হচ্ছে, যেসব ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি করেন; তাদের সরবরাহ বন্ধ করে দিলে তো তারা বিকল্প পথ খুঁজে বের করবে। একইভাবে আমরা যেসব বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে কারখানা চালু রাখি, সেগুলো যদি তারা সরবরাহ করতে না পারে; তাহলে তারাও তো বিকল্প বাজার খুঁজবে। বিবেচনায় নিন অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে। ধরুন আমাদের দেশে ২ লাখ গণপরিবহন রয়েছে। এখন যদি অনির্দিষ্টকাল যাতায়াত বন্ধ থাকে, তাহলে পরিবহন ব্যবস্থা গিয়ে দাঁড়াবে কোথায়? কয়েক লাখ পরিবহন শ্রমিক বাঁচবে কী করে? কীভাবে মালিকরা তাদের বেতন দেবেন? নদীপথে যাতায়াত করে অগণিত লঞ্চ। সেগুলো যদি বন্ধ থাকে, তাহলে পণ্য বহন করবে কারা? গ্রামের কৃষিপণ্য শহরে আসবে কী করে? গণপরিবহন বন্ধ থাকলে মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাবে কী করে? কোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা কি অনির্দিষ্টকাল বন্ধ রাখা যায়? কী অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এই দুই মাসে? একমাত্র কৃষি ছাড়া সব তো অচল। সুতরাং যারা বলছেন কঠোরভাবে লকডাউন কার্যকর রেখে করোনা আক্রমণ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এনে তারপর শিথিলতার প্রশ্ন। এমনকি প্রয়োজন বোধে কারফিউ দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের পরামর্শের পেছনে যে যুক্তি দাঁড় করছেন, তা কতটা বাস্তব। ডঐঙ যখন বলছে, বোধহয় বেশকিছু দিন বিশ্ববাসীকে করোনার সঙ্গে সহাবস্থান করতে হবে। এমনকি প্রতিশোধক আবিষ্কার হলেও তা প্রয়োগ করে সফল হতে বেশ কিছু সময় লাগবে। সেহেতু সবকিছু ধীরে ধীরে সচল করে অর্থনীতিকে পূর্ণজীবিত করতে হবে। সে কারণে ভাইরাস আক্রমণ প্রতিরোধের নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। এ কথা সত্য যে, লকডাউন শিথিল করলে হয়তো মৃত্যুর সংখ্যা ও রোগীর সংখ্যা বাড়বে। তাই নতুন কৌশল হবে সীমিত আকারে বিধিনিষেধ শিথিল করা ও আক্রান্ত ব্যক্তি বা তার সহযোগীদের ওপর কঠোরতম নিয়ন্ত্রণ আর বাকি অঞ্চলে ধীরে ধীরে অর্থনীতিকে সচল করে জনগণকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আনা। দুদিকেই রিক্স রয়েছে। কিন্তু একটাকে বন্ধ রেখে অপরটাকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কি? জীবন ও জীবিকা দুটোই তো মৌলিক প্রশ্ন। জীবনের জন্যই তো জীবিকা। জীবিকা বন্ধ হলে জীবন রক্ষা পাবে কী করে। তাই সরকার ও জনগণ উভয়কেই এই বাস্তব উপলব্ধি করতে হবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যে কৌশলের পথে এগোচ্ছে আমাদেরও একই পথে এগোতে হবে। ভবিষ্যতে কোনো মসৃন পথ কারো জন্য খোলা আছে বলে মনে হয় না। মনে রাখা দরকার, বিশ্বের সব ব্যবস্থাপনায় আগামীতে যে পরিবর্তন সূচিতে হতে যাচ্ছে বাংলাদেশকে তা বিবেচনায় নিয়েই এগোতে হবে। অর্থনীতি যদি স্থবির হয়; তাহলে উন্নয়ন তৎপরতাও বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। তাই আগামী বাজেট হতে হবে অত্যন্ত যুক্তিনির্ভর। উন্নয়নের গতি কিছুটা সীমিত হলেও দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের দুর্যোগ বাড়তে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ আগামী বাজেটে গ্রহণ কর ঠিক হবে না।

লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট

 

"