শ্রদ্ধাঞ্জলি

সত্য-ন্যায় ও গণতন্ত্রের পথিকৃত মানিক মিয়া

প্রকাশ : ০২ জুন ২০২০, ০০:০০

এম এ জলিল

দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। ১ জুন ছিল তার তার ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই পথিকৃৎ সাংবাদিকের জন্ম ১৯১১ সালে বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলায়। মানিক মিয়া স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছিলেন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বরিশালের বিএম কলেজ থেকে। আর এই কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সত্য প্রেম পবিত্রতার আদর্শ যার ব্রত ছিল সেই মহাত্মা অশ্বিনি কুমার দত্ত। মানিক মিয়া এই সত্য প্রেম পবিত্রতা আদর্শ নিয়েই ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব নেন। ইত্তেফাক পরিচালনার সময়ে তিনি সত্য-ন্যায় ও গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল ছিলেন। সে কারণেই পাকিস্তানিদের শাসন-শোষণ মেনে নিতে পারেননি। বিশেষভাবে সামরিক শাসক স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের শাসন, শোষণ, নির্যাতন। এসবের প্রতিবাদ করেছিলেন তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের মাধ্যমে।

আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের দৈনিক ইত্তেফাক ছিল সদা জাগ্রত। মুসাফির কলামের মাধ্যমে তিনি এই স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লিখতেন। কলামটি পড়ার জন্য তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব দলের নেতাকর্মীরা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতেন। আমিও ৬৭-৬৮ সালে পত্রিকাটি পড়তাম। এই পত্রিকায় থাকত আইয়ুব শাহী ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের কুকীর্তি, দুর্নীতি ও নানা নির্যাতনের কথা, আরো থাকত বাঙালিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা। ১৯৬৬ সালে ৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালিদের মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণা করেন। এই ছয় দফাকে মানিক মিয়া সমর্থন করে হুবহু পত্রিকায় ছাপিয়ে দেন। ইত্তেফাক ছয় দফার পক্ষ সমর্থন করায় তার ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় নিপীড়ন। তবু লেখনী বন্ধ করেননি, কারণ মানিক মিয়া ছিলেন সত্য-ন্যায়ের পক্ষে অবিচল এক মহান ব্যক্তিত্ব।

মানিক মিয়া বাঙালিদের অধিকার আদায়ের পক্ষে অবিরাম লিখেছেন। ছয় দফার পক্ষে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। তার প্রমাণ ১৯৬৮ সালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান শেখ মুজিবকে ১নং ও তৎকালীন পাকিস্তানের বাঙালি সেনা-নৌ ও বিমানবাহিনীর সব সদস্যকে ঐক্য করে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আরেক পরিকল্পনাকারী লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনকে ২নং আসামি করে মোট ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। তাতেও মানিক মিয়া দমে যাননি। ভয় করেননি আইয়ুব শাহীর রক্তচক্ষুকে। বরং তিনি এই মামলার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ করেছেন।

গোটা দেশে শেখ মুজিবুর রহমান ও লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু হয়। এই নেতৃত্বে অগ্রভাগে ছিলেন ডাকসুর তৎকালীন ভিপি জননেতা তোফায়েল আহমেদ। ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আইয়ুব শাহীর পতন ঘটে। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশর্ত মুক্তি দেন আইয়ুব খান। মুক্তির পর ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ ছাত্র-শিক্ষক জনতার পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ওই সংবর্ধনা সভায় শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে জননেতা তোফায়েল আহমেদ। এরপর সারা দেশে যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে তার মূলভিত্তিও ছিল দৈনিক ইত্তেফাক ও মানিক মিয়া।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে আইয়ুব খানের শেষ কবর রচনার জন্য গোলটেবিল বৈঠকের জন্য পাকিস্তানে যাবেনÑ এই ঘোষণার পরই মানিক মিয়ার জন্মভূমি বরিশালের দুই কৃতী সন্তান অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না বর্তমানে যিনি সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও অন্যজন মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার মুক্তা। এই দুজনে মিলে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিটি শহরে ছাত্রলীগ গঠন করেন এবং বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা দেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এই প্রস্তুতির প্রতিবাদ করে পান্না ও মুক্তাকে হত্যার লক্ষ্যে করাচিতে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ তাদের বাসায় হামলা করে। এই হামলার মধ্যেই পান্না ও মুক্তা পাকিস্তানে কর্মরত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট মেহেদী আলী ইমামকে ফোন করেন। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি পান্না ও মুক্তাকে উদ্ধার করেন। একজন সেনা কর্মকর্তা হয়েও তিনি অধীনস্ত সেনাদের নিয়ে উদ্ধারে কার্যে অংশ নিয়েছিলেন। সেদিন এই সাহসটিও জুগিয়েছিলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া।

১৯৬৯ সালের মে মাসে মানিক মিয়া করাচিতে যাওয়ার পর পান্না, মুক্তা ও মেহেদী আলী ইমামের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। মানিক মিয়া সেদিন বলেছিলেন, তোমাদের সাহস দেখে আমার মাথা নত হয়ে যায়। আমি এই ঘটনাটি ঢাকায় যাওয়ার পর ইত্তেফাকে লেখব, সংবাদ করব যে, বিরোধী দলের কোনো কর্মকান্ড পশ্চিম পাকিস্তানে চলে না। কিন্তু নির্মমতা হলো তার আর বেঁচে থেকে ঢাকায় আসা হয়নি। এসেছেন ১ জুন লাশ হয়ে। মানিক মিয়ার ইত্তেফাকের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণেই পাকিস্তানের ৭০-এর নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে নির্বাচিত হয় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। পাকিস্তানের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জয়যুক্ত হয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু এই জয়কেও পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া মেনে নিতে পারেননি। তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ইত্তেফাক বাঙালিদের মধ্যে যে জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন, সেই জাগরিত জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে সাড়ে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। ইতিহাসের এক অব্যর্থ সত্য হলো, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একে অপরের পরিপূরক। তাদের দুজনের কর্মকান্ড দেখলে মনে হবে, তারা দুজন একই মায়ের সন্তান, দুই ভাই। এ পর্যায়ে আরেকজন ব্যক্তির কথা না বললেই নয়, তিনিও মানিক মিয়ার সাহসে সাহসী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি হলেন ইতিহাসবিদ সিরাজ উদ্দিন আহমেদ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। এই হত্যার একমাত্র প্রতিবাদকারী তৎকালীন বরগুনার মহকুমা প্রশাসক সিরাজ উদ্দিন আহমেদ। ইতিহাসের সেই অভিষ্ট পথ ধরে আজকে আমাদের সবাইকে আবার ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সেই ঐক্যের লক্ষ্য থাকবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সাহস; যা দিয়ে আমরা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্বমানের আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলব।

লেখক : সভাপতি

বাংলাদেশ জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ, ঢাকা।

 

"