দৃষ্টিপাত

এক নীরব কষ্টের নাম মধ্যবিত্ত

প্রকাশ : ০২ জুন ২০২০, ০০:০০

সাহাদাৎ রানা

করোনাভাইরাসে প্রতিদিন আমাদের দেশে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা বিশ্বে ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে করোনা রোগী ও মৃতের সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে ভয় আর উৎকণ্ঠা। বেঁচে থাকার প্রশ্নে এখন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সবাই যার যার মতো লড়াই করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এ লড়াই শুধু করোনা নামক একটি ক্ষুদ্র ভাইরাসের বিরুদ্ধে নয়, অনেক কিছুর সঙ্গেই লড়াই করতে হচ্ছে মানুষকে। সবার আগে লড়াইটা বেঁচে থাকার প্রশ্নে। আরো সহজ করে বললে ক্ষুধার সঙ্গে। বিশে^র কোটি কোটি সবার মতো বাংলাদেশের মানুষও এই লড়াইয়ে সামিল। তবে বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে করোনাকালীন এমন কঠিন সময়ে সবাই কষ্টে আছেন। তবে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন নি¤œ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। এসব মানুষের জীবন কাটছে নিদারুণ কষ্ট ও শঙ্কার মধ্যে। এর পেছনে রয়েছে অনেকগুলো যৌক্তিক কারণ। করোনার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়েছে দেশের অনেক শ্রমজীবী মানুষ। বিশেষ করে যারা দিন আনেন দিন খান, তারা পড়েছেন বিপাকে। এসব মানুষের কাজের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাদের এখন প্রধান লক্ষ্য ত্রাণ। সরকার ও উচ্চবিত্তদের কাছ থেকে ত্রাণ পেলে খেতে পারছেন তারা। তাই নি¤œ আয়ের মানুষ ত্রাণের অপেক্ষা করছেন প্রতিদিন। বেঁচে আছেন ত্রাণ পেয়ে। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। সংকটের এমন সময়ে তারা না পারছেন কাজ করতে, না পারছেন কারো কাছে হাত পাততে।

আমাদের সমাজে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে। ধনীদের ধন আছে, গরিবের আছে সরকার। কিন্তু মাঝামাঝিতে অবস্থানকারী মধ্যবিত্তের জন্য যেন কেউ নেই। কারণ তারা মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেন না বলে নীরবে শুধু কষ্ট পেয়ে যান। এখন করোনাকালীন এমন কঠিন সময়ে শুধু বুকের মধ্যে চাপা কষ্ট নিয়ে চলছে মধ্যবিত্তদের জীবন। যারা প্রতিনিয়ত শুধু নীরবে কাঁদছেন। সেই গুমোট কান্নার শব্দ অবশ্য কারো কাছে পৌঁছায় না। নানা কারণে মধ্যবিত্তদের এমন বেদনার কান্নার কথা শুধু আড়ালে থেকে যায়। অত্যন্ত নির্মম ও হৃদয়বিদারক সেই গল্পগুলো শুধু আড়ালের গল্প হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান পায়। আবার কখনো কখনো উঠে আসে লেখকের গল্পের বইয়ে মলাটে। কিন্তু তাদের দুঃখের যেন আর অবসান হয় না। ধীরে ধীরে সেই কষ্টের সময় শুধু দীর্ঘ থেকে দীর্ঘই হয়। আমাদের দেশে সব সময়ই গরিব মানুষের জন্য প্রান্তিকভাবে এক ধরনের ব্যবস্থা আছে। দুর্যোগের সময় সেই সুযোগ-সুবিধার পরিমাণ আরো বেড়ে যায় সেসব প্রান্তিক মানুষের জন্য। কঠিন সেসব সময়ে তাদের সাহায্যে সবাই এগিয়ে আসেন। এবার যেমন করোনাকালীন সবাই যার যার মতো দুস্থ মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করছেন। আর দুস্থ এসব মানুষের জন্য সুবিধা হলো তারা তাদের কষ্টের কথা বিত্তবানদের বলতে পারেন। লাইনে দাঁড়িয়ে চাইতে পারেন সাহায্য। হাত পাততে পারেন সবার কাছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বিকাশমান মধ্যবিত্তরা সব সময় এক ধরনের চাপে থাকেন। তাদের কথা কেউ সেভাবে ভাবেন না। নিজেরাও মুখ ফুটে কারো কাছে কিছু চাইতে পারেন না। এর জন্য তারা সবার আড়ালে থেকে যান সব সময়। এবার করোনাকালীন এমন সময়েও এর ব্যত্যয় হয়নি। মুখ ফুটে কিছু বলতে না পারার কারণে তারা থেকে যাচ্ছেন আলোচনার বাইরে। সাহায্য-সহযোগিতা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। এখানে সবচেয়ে বড় সংকট হলো, লোকচক্ষুর লজ্জায় তারা কারো কাছে কিছু বলতে পারেন না। না বলতে পারার কষ্ট সবার মনের মধ্যে থেকে যায়। এই না বলতে পারাই কষ্টের সবচেয়ে বড় কারণ।

করোনার এমন সময়ে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা এবারের করোনা পরিস্থিতির কারণে মধ্যবিত্তরা বড় রকমের সংকটে পড়বে। এর পেছনে অবশ্য রয়েছে অনেকগুলো কারণ। বিভিন্ন সংকটের সময় উন্নত অনেক রাষ্ট্রে ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যবিত্তদের জন্য নগদ সহায়তা দেওয়া হয়, এবারও হচ্ছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে। আমরা সেভাবে আমাদের মধ্যবিত্তদের নিয়ে ভাবি না। তবে অনেক এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে মধ্যবিত্তদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। কিন্তু এসব মানুষের জন্য এখন আমাদের দেশে আরো ব্যাপকভাবে ভাবার সময় এসেছে। বিশেষ করে করোনাকালীন এমন কঠিন সময়ে মধ্যবিত্তদের দিতে হবে আর্থিক সহযোগিতা। এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে একটি হেল্পলাইন বা হটলাইন খোলা যেতে পারে। যেখানে মধ্যবিত্তরা তাদের সমস্যার কথা বলবেন। এরপর সেখানে পৌঁছে দেওয়া হবে প্রয়োজনীয় জিনিস। এখানে নাম-পরিচয় গোপন রাখা হবে। কারণ মধ্যবিত্তদের সবচেয়ে বড় ভয় লোকলজ্জার। তারা লোকলজ্জার ভয়ে কারো কাছে সাহায্য চাইতে পারেন না। তাই নাম-ঠিকানা গোপন রাখা হলে তাদের মধ্যেও স্বস্তি কাজ করবে। মধ্যবিত্তরা সাহায্য পেয়ে করোনাকালীন কঠিন সময়কে কিছুটা হলেও ভালোভাবে দিন পার করতে পারবেন। মানসিকভাবেও থাকবে সুস্থ।

সব সময় মধ্যবিত্তরা আড়ালে থাকলেও অর্থনীতিকে গতিশীল করতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। কিন্তু দুঃখের বিষয়ে তাদের অবদান নিয়ে কখনো সেভাবে আলোচনা হয় না। তাদের বড় অবদানকে সেভাবে দেখাও হয় না। তারা থেকে যান আড়ালের নায়ক হিসেবে। কাজ করে দেশের অর্থনীতিতে বড় রকমের ভূমিকা রাখেন তারা। অথচ সংকটের সময় তারাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট করেন নীরবে। এবার করোনাকালীন সময়েও এর ব্যতিক্রম নয়। শঙ্কার বিষয় হলো, বর্তমান সময়ের পরিস্থিতি যদি আরো দীর্ঘ হয়, তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ আর্থিক সহায়তা না পেয়ে নি¤œ মধ্যবিত্তের আওতায় চলে আসার আশঙ্কা রয়েছে। এটা আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য কোনোভাবেই ভালো খবর নয়। তাই তাদের দিকে সরকারকে আলাদা দৃষ্টি দিতে হবে। এখন সরকার থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চবিত্তদেরও মধ্যবিত্তদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। তবেই হয়তো মধ্যবিত্তরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে এমন সংকটময় সময়ে। এ ছাড়া আমাদের সমাজে যারা বিত্তবান রয়েছেন, তারাও খোঁজ নিয়ে মধ্যবিত্তদের আর্থিক সহযোগিতা করতে পারেন। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে মধ্যবিত্তদের কষ্ট অনেকাংশে লাঘব হবে। বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে অসহায় মানুষের সাহায্য করা হচ্ছে। সেই এলাকায় কারা মধ্যবিত্ত রয়েছেন তাদের তালিকা করে খাবার ও অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন এসব উদোক্তা। তাহলে মধ্যবিত্তরা কিছুটা হলেও স্বস্তি নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, যেকোনো দুর্যোগ দুর্বিপাকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়। এবারও হচ্ছেন। তবে এখন করোনাভাইরাস থাকলেও এক সময় চলে যাবে করোনার ভয়। করোনা চলে গেলেও এর রেশ থেকে যাবে অনেক দিন। এতে বিরূপ প্রভাবের সম্মুখীন হবে অনেক পেশার মানুষ। এর বাইরে নয় মধ্যবিত্ত শ্রেণিও। তাই সে সময়ের কথা এখনই ভাবতে হবে। কেননা, আমাদের দেশে মধ্যবিত্তরা সব সময়ই অবহেলিত। করোনা পরিস্থিতির পর সেই অবহেলার পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির যারা সরকারি চাকরিতে আছেন তারা হয়তো বেঁচে যাবেন এই যাত্রায়। কিন্তু যারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে আছেন তারা পড়বেন বিপদে। কারণ করোনার পর অনেকে চাকরি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। বাস্তবতা হলো, করোনার কারণে অনেকে বেকার হয়ে যাবেন এটাও সত্যি। তাই তাদের চাকরি বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে হবে সবার জায়গা থেকে। দূর করতে হবে এমন শঙ্কা। এ ক্ষেত্রে সরকারকে সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে মধ্যবিত্তদেরও সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে তাদের চাকরি। এখন মধ্যবিত্তদের সমস্যা সমাধানে সরকার থেকে শুরু করে সমাজের সবাই যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখবেনÑ এটাই প্রত্যাশা। তবেই হয়তো তাদের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে। মধ্যবিত্তদের তবে হয়তো আর নীরবে কাঁদতে হবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"