পরামর্শ

মৌসুমি ফলের সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ জরুরি

প্রকাশ : ৩০ মে ২০২০, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

সম্প্রতি আম্পানের আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মৌসুমি ফলের। আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, পাবানা ও সাতক্ষীরাতেই আম ও লিচুুর ক্ষতি হয়েছে সাংঘাতিক। সাতক্ষীরাতে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ আম ঝড়ে বিনষ্ট হয়ে গেছে। রাজশাহী, চাাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ঈশ্বরদীতে এই ক্ষতি হবে শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ। আম ও লিছু পাকতে শুরু করেছিল। ঘূর্ণিঝড় না হলে কয়েক দিন পড়েই এসব ফল বিক্রি করে কৃষক বরোনার এই দুঃসময়ে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারতেন। ফল বিক্রির টাকা বিনিয়োগ করতে পারতেন আমন ধান, পাট ও রবি মৌসুমের শাকসবজি উৎপাদনে। কৃষকের সেই স্বপ্ন মিশে গেল মাটির সঙ্গে। তার বুকজুড়ে এখন হতাশা, কান্না ও দুঃস্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস।

তারপরও স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিগুণের জন্য ফল মানুষের প্রিয় খাদ্য। ফলে শর্করা, আমিষ, স্নেহ পদার্থ ছাড়াও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও খনিজ লবণ। ফলের বড় সুবিধা হলো এটি রান্না ছাড়াই খাওয়া যায়। বর্তমানে বাংলাদেশে ৭০ প্রজাতির বেশি ফল চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে ৪৫ প্রজাতির ফল। মোট উৎপাদিত ফলের ৫৩ শতাংশ আসে বাণিজ্যিক বাগান থেকে এবং বাকি ৪৭ শতাংশ আসে বসতভিটা ও তৎসংলগ্ন এলাকা থেকে। নিয়মিত ফল খেলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং সুস্থ ও সবল জীবনযাপন করা যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ১ কোটি ২১ লাখ ১৩ হাজার মেট্রিক টন ফল উৎপাদিত হয়। ফল সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, কৃষকের অজ্ঞতা ও পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে দেশে প্রতি বছর উৎপাদিত ফলের ২৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়, যার আর্থিক মূল্য ১৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে উৎপাদিত মৌসুমি ফলের মধ্যে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, লটকন ও আনারস উল্লেখযোগ্য। স্বাদে, গন্ধে ও বর্ণে অন্য ফলের সঙ্গে আমের কোনো তুলনা হয় না। তাই আমকে ফলের রাজা বলা হয়। এ বছর আমের অন ইয়ার। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় বাম্পার ফলন হয়েছিল। চলতি বছর ১ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমি থেকে ২২ লাখ ৩২ হাজার টন আম পাওয়ার প্রত্যাশা করা হলেও আাম্পানের কারণে তা আর হবে না। আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম। ভারত প্রথম, চীন দ্বিতীয়। বাংলাদেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোর, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে গুণগতমানের সুস্বাদু আম উৎপাদিত হয়। এক সময় আমের উৎপাদন দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৯৬ বারি আম-৩ (আম্রপালি) জাতটি অবমুক্ত করা হয়। ফলে আমের চাষ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে যেসব উন্নত জাতের আমের চাষ হচ্ছে তার মধ্যে গোপালভোগ, হিমসাগর (খিরসাপাতি), লক্ষণভোগ, মোহনভোগ, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, মল্লিকা, সুবর্ণরেখা, বারি আম-৪, বারি আম-১১, আশ্বিনা ও গৌড়মতি উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশে অন্য একটি সুস্বাদু মৌসুমি ফল হলো লিচু। এ ফলটি খুব অল্প সময়েই শেষ হয়ে যায়। এ বছর সারা দেশে লিচুর ৩২ হাজার হেক্টর জমি থেকে ২ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন লিচু পাওয়া যাবে বলে মনে করা হলেও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে তা হবে না। দিনাজপুর, পাবনার ঈশ্বরদী, চাপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, গাজীপুর ও কিশোরগঞ্জে উন্নতমানের সুস্বাদু লিচুর চাষ হয়। বাংলাদেশে চাষকৃত সুস্বাদু লিচুর মধ্যে মাদ্রাজি, বোম্বাই, মোজাফ্ফরপুরী, বেদানা ও চায়না-৩ উল্লেখযোগ্য। আমিষ, শর্করা ও ক্যারোটিন সমৃদ্ধ খেতে সুস্বাদু একটি মৌসুমি ফল হলো কাঁঠাল। কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, পাবনা ও রাঙ্গামাটিতে প্রচুর কাঁঠাল উৎপন্ন হয়। কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়। এ বছর ৭১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমি থেকে ১৮ লাখ ৮৯ হাজার মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদন হতে পারে। আনারস একটি রসালু সুস্বাদু মৌসুমি ফল। টাঙ্গাইলের মধুপুর সুস্বাদু আনারসের জন্য বিখ্যাত। দেশে বছরে প্রায় ৪ লাখ ৩৫ হাজার টন আনারস উৎপাদিত হয়। টকমিষ্টির অপূর্ব মিশ্রণে সুস্বাদু একটি মৌসুমি ফলের নাম হলো লটকন। নরসিংদী, গাজীপুর, নেত্রকোনা ও সিলেট এলাকায় বেশি লটকন চাষ হয়।

তরমুজ ক্যালসিয়াম, লৌহ ও ভিটামিন সমৃদ্ধ পুষ্টিকর ফল। সারা দেশে চাষ হলেও চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, পাবনা, যশোর, দিনাজপুর ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড়, ভোলা বরিশালসহ চরাঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে তরমুজ উৎপন্ন হয়। করোনার কারণে এ বছর উৎপাদিত তরমুজের ৫০ ভাগও বিক্রি করতে পারেনি। মাঠেই নষ্ট হয়ে গেছে। অধিক ফলন, খেতে সুস্বাদু, সারা বছর ফল ধরার কারণে কৃষকের মধ্যে সারা দেশে ইদানীং থাই পেয়ারা বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এই পেয়ারা আপেলের মতো মিষ্টি ও কচকচে। দাম ভালো, বাগান, বসতবাড়ির আশপাশে ও ছাদে ফলটির চাষ করা যায়। বিশ্বে পেয়ারা উৎপাদনে বাংলাদেশ অষ্টম। বর্তমানে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ টন পেয়ারা উৎপাদিত হচ্ছে।

করোনার কারণে পানির দামে শাকসবজি বিক্রি করে কৃষক সর্বস্বান্ত হয়েছেন। সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে রাজশাহী, চাঁপাইনবাগঞ্জ, ঈশ্বরদী, সাতক্ষীরা, মেহেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মৌসুমি ফল বিশেষ করে আম ও লিচুর ক্ষতি হয়েছে সর্বাধিক। এখন আবার যদি করোনার কারণে কৃষক অবশিষ্ট উৎপাদিত মৌসুমি ফলও ন্যায্য দামে বিক্রি করতে না পারেন, ক্রেতা ও পরিবহন সংকটের কারণে যদি অবিক্রীত থাকে, গাছে পেকে নষ্ট হয়, পাখির খাদ্য হয়, তা হলে দুর্ভাগা কৃষকের বেঁচে থাকার আর কোনো উপায় থাকবে না। তাই কৃষকের উৎপাদিত মৌসুমি ফলের, সুষ্ঠু বিপণনের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় ১০ দফা সুপারিশ প্রণয়ন করেছে, যা ফলচাষিদের মধ্যে কিছুটা হলেও আশার আলো সৃষ্টি করেছে। তবে এ কথা সত্য যে, কৃষকরা তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করতে পারছেন না। করোনার কারণে কৃষিপণ্যের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। পাইকার ও আড়তদাররা কৃষিপণ্য ক্রয়ে আগ্রহ হারাচ্ছেন। কৃষিপণ্য পরিবহন শেষে ট্রাক খালি ফেরার আশঙ্কায় ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে খেতেই নষ্ট হচ্ছে বেশির ভাগ উৎপাদিত ফল ও সবজি। করোনা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কৃষিপণ্যের বিপণন এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনার কারণে তরমুজ চাষিরা উৎপাদিত তরমুজের অধিকাংশই বিক্রি করতে পারেননি। কিছু বিক্রি হলেও, কিন্তু ভালো দাম পাননি। এরই মধ্যে আম, লিচু, আনারস, কাঁঠালসহ মৌসুমি ফল বাজারে আসতে শুরু করেছে। এসব মৌসুমি ফল সঠিকভাবে বাজারজাত না করা গেলে চাষিরা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। দেশের অধিকাংশ মানুষ সুস্বাদু ও পুষ্টিকর মৌসুমি ফল খাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন। অথচ এই সময়ে করোনা মোকাবিলায় দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে পুষ্টিকর মৌসুমি ফল গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। তাই কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে সব ধরনের উদ্যোগ নেবে মন্ত্রণালয়। আর সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ট্রাকসহ অন্যান্য পরিবহনের যাতায়াত নির্বিঘœ করতে হবে। ট্রাকের জ্বালানির ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে, যাতে ট্রাক ভাড়া কম হয়। পুলিশ ব্যারাক, সেনাবাহিনী ব্যারাক, হাসপাতাল, জেলখানাসহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে কৃষকের কাছ থেকে আম কিনে সরবরাহ করা গেলে আমের বাজারজাতকরণে সমস্যা কমে আসার সম্ভাবনাই বেশি। করোনাভাইরাস মহামারিতে আম, লিচুসহ মৌসুমি ফল এবং কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ১০টি সুপারিশ হলো : ১. হাওরে ধানকাটা শ্রমিকদের মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে অন্যান্য জেলা থেকে ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ফড়িয়াদের যাতায়াত নির্বিঘœ করা। প্রয়োজনে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রত্যয়ণপত্র ও নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা। ২. মৌসুমি ফল এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ট্রাক ও অন্যান্য পরিবহনের অবাধ যাতায়াত নির্বিঘœ করা, পরিবহনের সময় যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর মাধ্যমে কোনো ধরনের হয়রানি করা না হয় সে ব্যবস্থা করা। ৩. বিআরটিসির ট্রাক ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া। ৪. স্থানীয়ভাবে ব্যাংকের লেনদেনের সময় সীমা বাড়ানো। ৫. পার্সেল ট্রেনে মৌসুমি ফল এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের আওতা বাড়ানো, হিমায়িত ওয়াগন ব্যবহার করা যায় কিনা তা নিশ্চিত করা। ৬. ফিরতি ট্রাকে বঙ্গবন্ধু সেতুতে টোল আদায় হার কমানো। ৭. ত্রাণ হিসাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীতে আম, লিচুসহ মৌসুমি ফল অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানানো। ৮. অনলাইনে ও ভ্যানে ছোট পরিসরে বেচাকেনার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা। ৯. প্রাণ, একমি ও ব্র্যাকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, যারা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে জুস, ম্যাংগো বার, আচার, চাটনি তৈরি করে, তাদের এ বছর বেশি বেশি আম-লিচু কেনার অনুরোধ জানানো। ১০. মৌসুমি ফলে যেন কেমিক্যাল ব্যবহার করা না হয় সেজন্য জেলা প্রশাসক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এবং কৃষি বিপণন অধিদফতরের সমন্বিতভাবে মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা।

এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে সময় মতো মৌসুমি ফল বিক্রি করে উৎপাদিত ফলের ন্যায্যমূল্য পাবেন কৃষক। ভোক্তাও কেমিক্যালমুক্ত নিরাপদ মৌসুমি ফলের স্বাদ পাবেন। ফলের দাম মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে থাকবে। এসব পুষ্টিকর ভিটামিন সমৃদ্ধ মৌসুমি ফল খাওয়ার ফলে মানুষের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, যা হবে করোনা সংক্রমণরোধে এবং করোনা পরবর্তী কৃষি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে বড় সহায়ক।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড

[email protected]

 

"