দৃষ্টিপাত

এখনই চলাচলে কঠোরতম হতে হবে

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২০, ০০:০০

আবু আফজাল সালেহ

যত দিন যাচ্ছে তত বাড়ছে আতঙ্ক। ক্রমেই শান্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া দেশটা কী নানা রকম সমস্যায় পতিত হবে? কারণ প্রয়োজন কোনো কিছু ধার ধারে না! করোনাপরবর্তী সমাজে পরিবার চালাতে অপরাধ জগতে ঢুকে যেতে পারে অনেকে। এমন এমন উদ্ভূত সমস্যা আমরা বা সরকার কতটুকু সামাল দিতে পারব? ভাবতে ভাবতে কেটে যায় বেলা। জীবনানন্দের কবিতার ভাষায়, অ™ভূত আঁধার এক...। এরই মধ্যে সাধারণ ছুটি দেড়মাস পেরিয়ে গেছে। উন্নত দেশের মতো অনেকদিন ধরে লকডাউন কার্যকর রাখা আমাদের জন্য কঠিন। আমেরিকাসহ ইউরোপের অনেক দেশ করোনার পিক পর্যায়ের মধ্যেও লকডাউন তুলে নিতে মত দেন অনেকে। আর আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে বেশি দিন লকডাউন রাখা কঠিন হয়ে যাবে। গণপরিবহন বন্ধ। এসবখাত ক্ষতিগ্রস্ত। নিম্নআয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশার লোকেরা খুবই অমানবিক জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। স্কুল-কলেজ বন্ধ। শিশুরা ঘরে থেকে ধৈর্যশক্তি হারিয়ে ফেলছে। লকডাউন কেউ মানছেন, কেউ কেউ মানছেন না। ঢাকার আশপাশে করোনাভাইরাসের আক্রান্তের হার বেশি। কলকারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে। শর্ত দিয়ে ও সীমিত আকারে শপিংমল-দোকান খুলে দেওয়া হয়েছে। জীবন ও জীবিকা একসঙ্গে চলতে দিতে সরকারের এ পথ বেছে নিতে হয়েছে। কিন্তু আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানছি না। সবকিছু পুলিশ ও প্রশাসনকে করতে হচ্ছে। পুলিশ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। ডাক্তার ও প্রশাসনের জনবল ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা। তারাও আক্রান্ত হচ্ছেন উল্লেখযোগ্যহারে। সাধারণ ছুটি দিয়েও মানুষকে ঘরে রাখা যাচ্ছে না।

ঈদের আগে পরে সরকার যানবাহনের ওপর যুক্তিযুক্ত কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন। এটাই দরকার ছিল। ঈদকে কেন্দ্র করে লোকজনের চলাচলের সীমা থাকবে না। ঈদের আগে এ প্রান্তের মানুষের সঙ্গে অন্য প্রান্তের মানুষের মিলেমিশে একাকার হবে। বিশেষ করে শহরের মানুষজন গ্রামের বাড়িতে যাবে। এতে করোনাভাইরাস আক্রান্ত মানুষ সুস্থ মানুষকে আক্রান্ত করবে। এরপর ঈদের পরে উল্টা ঘটনা ঘটবে। কর্মসংস্থানের জন্য গ্রাম থেকে মানুষ শহরে ছুটবে। এতে দেশ দুষ্টুচক্রের মধ্যে পড়বে। আবার লকডাউনের মেয়াদ বাড়াতে হবে। বিধায়, এখনই মানুষ চলাচলে টুটি চেপে ধরতে হবে। সীমিত আকারে ও শর্তসাপেক্ষে খুলে দেওয়া মার্কেট-বাজারে কেউই স্বাস্থ্যনীতি ও ‘সামাজিক দূরত্ব নীতি’ মানছেই না। ফলে অনেক জেলায় মার্কেট বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকার মানবকল্যাণে কাজ করলেও সমর্থন দিচ্ছি খুব কম লোকই। করোনাস¤পর্কিত সরকারের নির্দেশনা মানাও তো করোনাযুদ্ধে বিরোধিতা করা। ঘরে থাকাও তো এখন যুদ্ধ। কিছু শ্রেণিপেশার লোকজনের খুব কষ্ট হবে জানি। সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে এক্ষেত্রে। অনেকে এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু পরিমাণে আরো বেশি হওয়ার কথা ছিল। সরকারও এ ব্যাপারে অবরুদ্ধ ও গরিব জনগণকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য আহ্বান করছে। মহামারি-দুর্যোগের সময় সমাজের প্রতিষ্ঠিতদের আরো এগিয়ে আসতে হবে।

চলাচলে কঠোর না হলে সংক্রমণের হার বেড়ে যাবে। নতুন করে সংক্রমণের হার হবে। নতুনরা আবার ঝুঁকি বাড়াবে। আর একটি খারাপ বিষয় হচ্ছে উপসর্গবিহীন রোগী। এটার জন্য যারা ভালোভাবে চলাচল করবেন বা করছেন তাদের অনেকের মধ্যে করোনাভাইরাসের জীবাণু থাকতে পারে। ফলে ঈদকেন্দ্রিক চলাচলে মারাত্মকভাবে সংক্রমণ ঝুঁকি বেড়ে যাবে। ঈদের আগে-পরের কিছুদিন মানবিক দিকটা নগণ্য করে চলাচলে সরকারকে কঠোর হতে হবে। সরকার অর্থনীতি প্রবাহ চালু ও জনসুবিধা দিতে শর্তসাপেক্ষে কলকারখানা ও দোকানপাট খুলে দিয়েছে। বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশনা একেবারেই মানা হচ্ছে না। অতএব আমাদের স্বাধীনতা দিলে আমরা নিজেরটাই দেখি। কিন্তু করোনাক্ষেত্রে নিজেরটাও দেখছি না। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতা কাজ করছে। নিজেরটা দেখলে তো ঘরেই থাকত সবাই।

নদী পারাপার বন্ধ করলেই ঢাকাকেন্দ্রিক বা দেশের এ পান্ত-ওপ্রান্তের লোকের চলাচল কমানো যাবে। সড়ক-সংযোগ সেতু এলাকার দুই পাশে কঠোরতা দেখাতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের সরকারের নির্দেশনা আন্তরিকতার সঙ্গেই বাস্তবায়ন করতে হবে। নদী চলাচলে কঠোরতা দেখাতে পারলে লোককের এদিক-ওদিকে চলাচল প্রায় শূন্যে নামানো যাবে।

দেশের জন্য উপসর্গবিহীন রোগীরা সবচেয়ে বিপজ্জনক। উপসর্গবিহীন করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে মনের অবচেতনেই ভাইরাস সংক্রমণের হার বাড়াবে। আমাদের দেশে ঈদকেন্দ্রিক চলাচলই বেশি হয়। ঈদের সময়ে কেনাকাটার ভিড় অনেক বেশি থাকে। অস্থায়ী বা স্থায়ীভাবে বিভিন্ন শহরের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লোকজন গ্রামে আসে। মার্কেট করে নিজ এলাকায়। তাই মার্কেট বন্ধ না করা গেলেও সরকারের নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী হচ্ছে জনসাধারণ। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কারো মার্কেটে যাওয়া যাবে না। খুব প্রয়োজনে যদি বাইরে যেতেই হয় তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই যেতে হবে। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা দিলে নিয়মনীতির থোড়াই কেয়ার করি। বরং বিধিনিষের প্রতি আমাদের দুর্বলতাই বেশি চোখে পড়ে। সবকিছু আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। পুলিশ-প্রশাসন দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার ওপর আমরা নির্ভরশীল। আমরা চোর-পুলিশ খেলায় মত্ত। পুলিশ জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তার-জনকর্মচারীরা জীবনঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। আর যাদের জন্য করছেন তারা সবকিছু অবজ্ঞা করছে! বিচিত্র আমরা!

অতএব মানবিক দিকটা এখন উহ্য রেখে কঠোর হতেই হবে। তা যতই কঠোর হোক! অবিবেচকদের জন্য অমানবিক আচরণ বৈধ। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেম-ভালোবাসা অনুমোদিত নয়। ঈদের নামাজ ঘরে পড়তে পারলেই ভালো। আর যদি মসজিতে পড়তেই হয় তবে কঠোরভাবে সরকারের নির্দেশনা মেনেই পড়তে হবে। ঈদের দিনে ঘোরাঘুরি করা যাবে না। যার যার অবস্থানে থেকেই ঈদ উৎসব পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে ভার্চুয়ালে পারস্পারিক যোগাযোগ রক্ষা করা যেতে পারে। আপনি সুস্থ থাকতে চান কিনা সেটা অনেকটা আপনার নিজের ওপর নির্ভর করছে। যেহেতু এখনো টিকা বা ওষুধ আবিষ্কার হয়নি তাই, বেঁচে থাকার জন্য সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করে টিকে থাকতে হবে। আপনাকে দরজার পেছনে আটকে রেখে কারো কিছু ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি নেই। সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার। সামনে শুধুই অন্ধকার, দুঃস্বপ্ন। কত দিন কারো সঙ্গে সামনাসামনি ভালো করে কথা বলা হয়নি। তবু বুকে আশা রেখে চলছি। এত দিনে সরকারের প্রচেষ্টা নজরে পড়ার মতো। কিন্তু আমাদের দেশ? সাধারণ মানুষ কী সচেতন? তারা খাবে কী? দুর্ভিক্ষ হবে কী? যুদ্ধ লাগবে না তো?... ইত্যাদি ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। শুধু জানি, আমরা বন্দিজীবন থেকে আবার মুক্ত হব। আশা রাখি, আমাদের শুভবুদ্ধির উদয় ঘটাবে। কোভিড-১৯ বুঝিয়ে দেবে, যত দিন আমরা বিভেদ ভুলে এক হতে না পারব, তত দিন আমরা শ্রেষ্ঠ জাতি নই, কিছুতেই নই।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"

সর্বাধিক পঠিত