মুক্তমত

সময় এখন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

আর কে চৌধুরী

করোনাভাইরাস দুর্যোগ দেশের গরিব-দুঃখী মানুষের জীবনে ইতোমধ্যে মহাসংকট হয়ে দেখা দিয়েছে। এ মন্দাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। সমাজের গরিব-দুঃখী মানুষ যেন খাদ্যের অভাবে মারা না যায় সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অবকাঠামোগত উন্নয়নের চেয়েও গরিব-দুঃখী মানুষের পেটে ভাত জোগানো সরকারের প্রধান কর্তব্য। জনগণ সব ক্ষমতার উৎস। নির্বাচন এলে জনগণের কথা মনে পড়বে কিন্তু তাদের বিপদে তাদের পাশে দাঁড়াবেন না এটা হতে পারে না।

মানবসভ্যতার ইতিহাস হার না মানার। মানুষের হার না মানা মনোভাবই তাকে প্রতিকূল অবস্থায় টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধেও মানুষ জয়ী হবে। এজন্য চলছে ভ্যাকসিন ও ওষুধ তৈরির গবেষণা। বিজ্ঞানীরা মানবজাতিকে রক্ষায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ল্যাবরেটরিতে। তাদের আশা, করোনাভাইরাস যত ভয়ংকর হোক না কেন তার ভ্যাকসিন ও নিরাময়ের ওষুধ আবিষ্কার হবেই। অস্ট্রেলিয়ার গবেষণাগারে করোনাভাইরাসের দুটি ভ্যাকসিনের পরীক্ষা শুরু করেছেন একদল গবেষক। এ দুটি ভ্যাকসিন প্রাণীর শরীরে প্রয়োগের অনুমতি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও মার্কিন সংস্থা ইনোভিও ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে যুক্ত একদল গবেষক এ দুটি ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু করেছেন।

সবচেয়ে বড় কথা, একদল বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, করোনাভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশের পর অতিদ্রুত জেনেটিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। যার জেরে এই মরণ ভাইরাসের গতিবিধি বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে বিজ্ঞানীদের। আর পাঁচটা ভাইরাসের মতো করোনার চরিত্র স্থির থাকছে না। বিজ্ঞানীদের সাফল্যের ওপর যেহেতু মানবজাতির ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল সেহেতু করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে তারা জয়ী হবেনÑ এ শুভ কামনা বিশ্ববাসীর। আমাদের বিশ্বাস, অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জ মানুষকে মারণাস্ত্রের বদলে জীবন বাঁচানোর বিজ্ঞান গবেষণায় ব্রতী হতে আগ্রহী করবে।

এদিকে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সারা দুনিয়ায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঘরে থাকার নির্দেশনা ভঙ্গ করে কেউ অকারণে বাইরে এলে জেল-জরিমানাও করা হচ্ছে। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট কেউ বাইরে বের হলে প্রয়োজনে গুলি করার জন্য সেনা ও পুলিশ বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। মানুষের জীবন বাঁচাতে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ অনুভূত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশেও সামাজিক দূরত্ব এবং হোম কোয়ারেন্টাইনের বিষয়টি কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সেনাবাহিনী ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় করা হয়েছে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস থাবা বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে হোম কোয়ারেন্টাইন না মানার কারণে। ইতালিসহ ইউরোপফেরত প্রবাসীদের অন্তত ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দিয়ে বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে দেওয়া হলেও তাদের সিংহভাগ এ নির্দেশনা মানেনি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং ঘরে থাকার সুযোগ সৃষ্টিতে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলেও সেটিকে অনেকে গ্রামে ছুটি কাটানোর মহোৎসব হিসেবে নিয়েছে।

নাগরিক অসচেতনতার কারণেই বাংলাদেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা সীমিত হলেও তাতে আত্মপ্রসাদ লাভের সুযোগ নেই। কারণ করোনা এমন এক ভয়াবহ ভাইরাস তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে এ ভাইরাস বিশ্ব অর্থনীতিরগুলোর সর্বনাশ ডেকে এনেছে। বিশ্বের সবচেয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের তালিকায় বাংলাদেশের নাম কয়েক বছর শোভা পেলেও এ বছর তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। বলা যায়, এ বছর অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে পৃথিবীর ৭৫০ কোটি মানুষ, বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষও সে দুর্ভাগ্যের শিকার। এ দুর্ভাগ্য যাতে সর্বগ্রাসী না হয় তা নিশ্চিত করতে হোম কোয়ারেন্টাইন জোরদার এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। জাতীয় অস্তিত্বের স্বার্থেই সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তদারকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নাগরিকরা নিজেদের স্বার্থেই সুরক্ষার নির্দেশনা মেনে চলবেনÑ এমনটি প্রত্যাশিত। নির্দেশনা ভঙ্গ করে অকারণে বাইরে ঘোরাঘুরির জন্য জরিমানারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছেÑ যা দৃশ্যত কঠোর পদক্ষেপ হলেও দেশবাসীর জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে সমর্থনযোগ্য।

আমরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। ১৯৪৮-৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৪ সালের নির্বাচন, ৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ সালের ছয় দফা, ১১ দফা, ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ৭০-এর নির্বাচনের পথ পেরিয়ে আমরা ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়েছি। সবার সর্বান্তঃকরণে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অর্জিত হয়েছিল সেই বিজয়।

জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশ খাদ্যশস্য, শাকসবজি-মাছ-মাংস-ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। ঢাকায় মেট্রোরেল এবং চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ট্যানেল নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দোরগোড়ায়। মহাকাশে আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপিত হয়েছে। গত বছর ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ হারে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। কিন্তু প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস জনস্বাস্থ্যসহ বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক থাবা বসাতে যাচ্ছে। আমাদের ওপরও এই আঘাত আসতে পারে। এই মুহূর্তে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার মানুষকে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা।

করোনাভাইরাস দুর্যোগ দেশের গরিব-দুঃখী মানুষের জীবনে ইতোমধ্যে মহাসংকট হয়ে দেখা দিয়েছে। এ মন্দাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। সমাজের গরিব-দুঃখী মানুষ যেন খাদ্যের অভাবে মারা না যায় সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অবকাঠামোগত উন্নয়নের চেয়েও গরিব-দুঃখী মানুষের পেটে ভাত জোগানো সরকারের প্রধান কর্তব্য। জনগণ সব ক্ষমতার উৎস। নির্বাচন এলে জনগণের কথা মনে পড়বে কিন্তু তাদের বিপদে তাদের পাশে দাঁড়াবেন না এটা হতে পারে না।নির্বাচনের সময় ভোট চাওয়ার মতো এই সংকটেও জনগণের কাছে যেতে হবে। গরিব-দুঃখী মানুষের দরজায় যেয়ে খাবার পৌঁছে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষ বাঁচলে দেশ বাঁচবে, মানুষ টিকে থাকলে সবকিছু টিকবে। সময় এখন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার। তাদের পাশে দাঁড়ানোর।

লেখক : শিক্ষাবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান রাজউক, উপদেষ্টা, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, সদস্য এফবিসিসিআই, মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা।

 

"