বিশ্লেষণ

পরিবেশে করোনার প্রভাব

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

মাহমুদ কামাল এনামুল হক

বর্তমান বিশ্বে যে বিষয়টি মানুষের পথ চলা থামিয়ে দিচ্ছে তার নাম করোনা। যার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গে বিভিনড়ব স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোভিড-১৯ নামক ভাইরাস থেকে করোনা রোগ হয়ে থাকে। বিভিনড়ব দেশের মানুষ আজ গৃহবন্দি হয়ে পরছে। চীন, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেনসহ ২০০টিরও বেশি দেশে এই রোগ ছড়িয়ে পরেছে এবং বর্তমান আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় লাখ, যা দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। চীনের পর ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইরান, বেলজিয়ামসহ বিভিনড়ব দেশে প্রতিদিন যে হারে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে তা সত্যিই দুঃখজনক। তাছাড়া বাংলাদেশেও করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা চার শতাধিক যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনায় আক্রান্ত লক্ষাধিক মানুষ ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন।

করোনা শুধু যে মানুষের প্রাণই কেড়ে নিচ্ছে তা নয়। করোনার জন্য বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পরেছে। বিশ্বের হাজার হাজার শহর লকডাউনে চলে গেছে। বন্ধ হয়েছে বিভিনড়ব আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মাধ্যম। কোটি কোটি যানবাহনের গতি থামিয়ে মানুষকে করেছে ঘরবন্দি। এসব নেতিবাচক দিকগুলো সত্যিই মানুষের মনকে আতঙ্কিত করে তুলেছে।

তারপরও করোনাভাইরাসের কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে যার প্রভাব পরিবেশে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্বের হাজার হাজার শহর লকডাউনে থাকায় ব্যস্ততম জায়গাগুলো এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। কল-কারখানা ও যানবাহন বন্ধ হওয়াতে বিদুৎ, গ্যাস ও তেলের জ্বালানি হ্রাস পেয়েছে এবং চাহিদা কমেছে। যার ফলে বায়ু ও পানি দূষণ কমতে শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা যে ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে একটি বড় পার্থক্য দেখছেন তার মধ্যে একটি হলো বাতাসের গুণমান। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পিটার ডেকার্লো নিউজ উইকে বলেছেন, ‘উপগ্রহের দ্বারা পর্যবেক্ষণ করায় বায়ুদূষণের মাত্রা অনেকগুলো ক্ষেত্রে বেশ উনড়বতি দেখিয়েছে যা কোভিড-১৯ এর কারণে বিধিনিষেধমূলক কোয়ারেন্টাইনগুলোর জন্য হয়ে চলেছে।’ চীন, ইতালি যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইরানসহ বিভিনড়ব দেশে শিল্প-কারখানা, বিমানচালনা এবং পরিবহনের অন্যান্য ধরনের যানবাহন বন্ধ বলে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু উপগ্রহের দ্বারা পর্যবেক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে যে মহামারিটি ইতোমধ্যে সেই অঞ্চলগুলোতে বায়ুদূষণের ব্যাপক হ্রাস ঘটাচ্ছে। চীনে, নাসা এবং ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি থেকে প্রাপ্ত উপগ্রহের চিত্রগুলো দেশের বেশিরভাগ লকডাউনে যাওয়ার পরে চলতি বছরের শুরুর দিকে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড দূষণের উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখিয়েছে। বিশেষজ্ঞ আউটলেট কার্বন ব্রিফের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, চীনে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। একই রকম প্রভাব উত্তর ইতালিতেও দেখা গেছে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ট্র্যাফিকের স্তর ৩৫ শতাংশ হ্রাস পাওয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ৫-১০ শতাংশ হ্রাসের কথা জানিয়েছেন। নাসার গড্ডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের একজন বায়ুর গুণমান গবেষক, ফি লিউ গার্ডিয়ানকে বলেছেন, ‘আমি প্রথমবারের মতো কোনো নির্দিষ্ট ইভেন্টের জন্য এত বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে এমন নাটকীয় প্রপ-অফ দেখতে পেয়েছি।’

বাংলাদেশের ঢাকাসহ বিভিনড়ব শহরও ইতোমধ্যে শিল্প-কারখানা এবং পরিবহনের অন্যান্য ধরনের যানবাহন বন্ধ থাকায় পরিবেশে এর প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের শহরগুলো থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড নির্গমন অনেকাংশে কমেছে। গত বছরের তাপমাত্রা এই বছর এই সময়ের তুলনায় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি বেশি ছিল।

সাগর, নদী ও কৃত্রিম লেকগুলোতে যেসব জাহাজ, লঞ্চ, নৌকা ইত্যাদির চলাচল হ্রাস পাওয়াতে পানিদূষণও কমতে শুরু করেছে। নদী ও লেকের পানি অনেকাংশে স্বচ্ছ হয়েছে যা জলজ প্রাণীর জন্য সুবিধাজনক। তাছাড়া ইঞ্জিনচালিত নৌকা থেকে জ্বালানি তেলের মাধ্যমে পানি দূষিত হচ্ছে না। আরো একটি কারণ যা কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন বৃদ্ধিকে কমিয়ে দিতে পারে তা হলো তেলের চাহিদা কম। বিজ্ঞানীদের মতে নদী ও খালগুলোর দূষণ হ্রাস পেলে সাগরেও এর প্রভাব পরবে।

বিশ্বব্যাপী কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থাগুলো বন্যজীবনের ওপর প্রভাব ফেলছে বলে মনে হচ্ছে, যেহেতু মানুষ ক্রমবর্ধমানভাবে তাদের বাড়িতে সীমাবদ্ধ রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, জাপানে, জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র নারা পার্কে বসবাসকারী সিকা হরিণগুলো চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আগত দর্শকদের ওপর নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর হওয়ার পরে খাদ্যের সন্ধানে শহরাঞ্চলে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। সাধারণত, পর্যটকরা হরিণকে খাওয়ানোর জন্য বিশেষ নাস্তা কিনে এবং অনেক প্রাণী এই আচরণগুলো খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশের বিভিনড়ব পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও এমন দৃশ্য চোখে পড়েছে। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে ডলফিনের বিচরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বৃক্ষ নিধনও অনেকাংশে কমতে শুরু করেছে। বিশ্বের অনেক দেশ বন্যপ্রাণী ব্যবসা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে। কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে শতকরা ৭০ ভাগ সংক্রামক রোগ বন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে আসে যার মধ্যে করোনাও রয়েছে।

জলবায়ুর এই পরিবর্তন বায়ু, পানি, মাটি ও বন্যপ্রাণীর জন্য ইতিবাচক দিক। তবে পরিবেশগত সুবিধাগুলো স্বল্প স্থায়ী হতে পারে। চীন এই সপ্তাহে উহান প্রদেশে দেশটিতে এখন কোনো নতুন করোনাভাইরাসের আক্রান্তের ঘটনা ঘটছে না বলে কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে শুরু করেছে। কিছুদিন পর সারা বিশ্ব এই দুর্যোগ থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে এ প্রত্যাশা করি। হতেও পারে পরিবেশই ক্রুদ্ধ হয়ে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে। তাই মানব স্বাস্থ্যের মতো পরিবেশের সুস্থতার কথা মনে রাখতে হবে। পরিবেশকে আমরা যেমনটা দিব, অনুরূপভাবে পরিবেশ থেকেও আমরা তেমনটি ফেরত পাব। নিতান্তই আমাদের প্রয়োজনে পরিবেশ সুন্দর রাখতে ভালো কিছু করা উচিত।

যেহেতু করোনা আমাদের দেশেও বিস্তার করেছে তাই সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রোগটি দ্রুত ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পরার আগেই প্রতিরোধ করতে হবে। সচেতনতাই এখন একমাত্র হাতিয়ার। পরিবার ও দেশের স্বার্থে বিদেশফেরতদের সবচেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে। সেইসঙ্গে সতর্ক

থাকতে হবে তার পরিবারকেও। যেকোনো উপায়ে বিদেশফেরতদের জন্য হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা নিশ্চিত করতে হবে। ইতোমধ্যে বিদেশফেরত অনেকেই অর্থ দ-ের স্বীকার হয়েছেন। দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকে নিয়ম মেনে চলাই হবে মঙ্গলজনক।

করোনা প্রতিরোধে আমরা বেশ কিছু বিষয়ে সচেতন হওয়ার নির্দেশনা পাই। সাবান দিয়ে বার বার হাত ধোয়া (২০ সেকেন্ড) সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ থেকে বিরত থাকা। হাঁচি শিষ্ঠাচার মেনে চলা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। বাহিরে যাওয়ার পর মাস্ক ব্যবহার করা। নির্দিষ্ট সময় পরপর পানি পান করা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে এমন খাদ্য বেশি খাওয়া জরুরি। ফল ও পুষ্টিকর খাবার বেশি খাওয়া প্রয়োজন এতে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

করোনা প্রতিরোধ করতে দেশের যুব সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রত্যেকের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হয়ে পরিবারসহ সমাজের বাকি মানুষদের সচেতনতা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে আতঙ্ক ছড়ানোর কাজে না লাগিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যবহার করতে হবে। বিভিনড়ব সামাজিক সংগঠনগুলোও রাখতে পারে বিশেষ অবদান। কিন্তু সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে সমাজের মানুষের কাছে যাওয়ার পূর্বে অবশ্যই ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সচেতনতার জন্য কোনো মতেই জনসমাবেশ করা যাবে না। সেইসঙ্গে পরিবেশের দিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে পারে। সুস্থ পরিবেশ মানব জীবনের জন্য অপরিহার্য।

লেখক : শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল

ময়মনসিংহ।

[email protected]

 

"