মুক্তমত

করোনা দুর্যোগে প্রবীণরা কষ্টে আছেন

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

আবু আফজাল সালেহ

শিশুদের আদর-যত্নকরার লোক থাকলেও বেশির ভাগ প্রবীণদের ক্ষেত্রে যত্ন-আত্তি কমই করা হয়। এটা সব সময়ের চিত্র। যৌবন অতিক্রম করে বৃদ্ধ বয়সে এসে এক প্রকার অসহায় হয়ে পড়েন তারা। রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতা লোপ পেয়ে আরো অসহায় হয়ে পড়েন। এ কারণে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও প্রবীণরা মারা যাচ্ছেন বেশি।

পৃথিবীজুড়ে প্রবীণদের প্রকৃত অবস্থাটা কেমন, করোনাভাইরাসের মরণ থাবা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। বিশ্বের অনেক স্থানে, অসুস্থ বৃদ্ধকে ‘করোনা’ আক্রান্ত্র সন্দেহে মাঝ রাস্তায় ফেলে পালাচ্ছেন অনেকে। অনেক উন্নত দেশেও এই রোগে আক্রান্ত্র বয়স্কদের চিকিৎসা আজ ‘লেস প্রায়োরিটি’ হিসেতে গণ্য হচ্ছে। করোনাভাইরাসে তরুণদের চেয়ে প্রবীণদের আক্রান্ত্র হওয়ার ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। লন্ডনের ই¤েপরিয়াল কলেজের এক গবেষণা অনুযায়ী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত্র হয়ে ৮০ বছরের বেশি বয়সিদের মৃত্যুর হার ৪০ বছরের কম বয়সিদের চেয়ে ১০ গুণ বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে করোনায় মৃত্যুদের বড় একটা অংশ প্রবীণ। ৪০ বছরের বেশি বয়স হলেই ঝুঁকি বাড়বে। জীবাণুর স্বাভাবিক ধর্ম অনুযায়ী করোনাভাইরাস তাদেরই সহজে কাবু করে। কারণ, প্রবীণদের ‘ইমিউনিটি’ বা রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা অনেক কম। প্রায় প্রত্যেকেরই হার্টের সমস্যা, ফুসফুসের অসুখ, ডায়াবেটিস বা কিডনির সংক্রমণে ভোগেন। এসব নিয়ন্ত্রণে রাখতে সব সময়েই ডাক্তারের টাচে থাকতে হয়। বিভিন্ন ওষুধ খেতে হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হয়। অসুখ এবং ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মিলিয়ে রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রকৃতিপ্রদত্ত ক্ষমতাকে বিনষ্ট করে দেয়। ফলে, খুব সহজেই প্রবীণরা সংক্রমণের কবলে পড়েন। এসব ভয়াবহ চিত্রই বলে দিচ্ছে, সিনিয়র নাগরিকদের স্বাস্থ্য নিয়ে আলাদা করে ভাববার এবং পরিকল্পনা করার সময় দিতে হবে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত্র বয়স্কদের সুস্থ হয়ে উঠার সম্ভাবনা অনেক কম, সে ব্যাপারে গবেষক এবং চিকিৎসকদের বিশ্লেষণে মূলত যে দুটি বিষয় উঠে আসে, তার একটি হলো শারীরিক এবং অপরটি সামাজিক। করোনাভাইরাসের দ্বারা সংক্রামিত হলে চিকিৎসা করার কোনো ওষুধ এখন পর্যন্ত নেই। বয়স্করা সহজেই ‘সিভিয়র অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ইনফেকশন’-এর কবলে পড়ে মারা যান। করোনাভাইরাস হার্টেরও ক্ষতি করে। বার্ধক্যজনিত কারণে বয়স্কদের শরীর কমজোরি হয়ে পড়ে। মস্তিষ্কও আগের মতো সচল থাকে না। বেঁচে থাকবার জন্য অন্য কারো সাহায্য ছাড়া এক মুহূর্তও চলা দায়।

করোনা প্রতিরোধের প্রধান উপায় হচ্ছে ‘সামাজিক দূরত্ব বা নিরাপদ দূরত্ব’ মেনে চলা। বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। কিন্তু প্রবীণদের বেলায় এটা মানাতে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। প্রবীণরা বিভিন্ন ধরাবাঁধা কাজে অভ্যস্ত হয়ে যান। আবার অনেক প্রবীণ পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর কর্তৃত্ব ধরে রাখতে চান। অনেকে বিভিন্ন কুসংস্কারেও বিশ্বাসী। অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিতদের একটা বড় অংশ অসচেতন। ফলে বেশির ভাগ প্রবীণই নিয়ম মানতে চান না। যে কারণে তাদের নিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। যদি ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, নিউমোনিয়া, টাইফয়েডের মতো পরিচিত অসুখ জাঁকিয়ে বসে, তাতেও কিন্তু বয়স্ক মানুষদের জীবনহানির সম্ভাবনা বাড়বে। শারীরিক অসুস্থতা আর মানসিক চাপের জোড়া ধাক্কা সামলাতে না পেরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে বয়স্কদের হাসপাতালে কে নিয়ে যাবে, সেটাও তো বড় প্রশ্ন! সুস্থ থাকবার জন্য যে জনবিচ্ছিন্নতা,তা প্রবীণদের জন্য আরো কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই বাড়ির প্রবীণ নাগরিকদের প্রতি সবচেয়ে বেশি যতœ নিতে হবে। চিকিৎসকরা বলছেন, করোনার সংক্রমণের এই সময়ে সবচেয়ে বেশি সতর্ক হতে হবে প্রবীণ নাগরিকদের। তাই, প্রবীণদের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।

করোনা থেকে প্রবীণদের নিরাপদে রাখতে কিছু পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। প্রবীণদের প্রতি খুবই যতœশীল হওয়া প্রয়োজন। তাদের বাড়ির বাইরে যেতে না দেওয়াই ভালো। আর যদি কোনো জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যেতেই হয়, তবে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। যেসব প্রবীণ নাগরিক দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, হাঁপানি, হৃদরোগ ও কিডনির অসুখসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছেন, তাদের নিয়ম মেনে ওষুধ খাওয়াতে হবে। অতিরিক্ত মসলা ও তেলজাতীয় খাবার প্রবীণদের খাওয়া উচিত নয়। এতে হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রবীণদের সুস্থ রাখতে দিনে তিন থেকে চার লিটার পানি পান করতে হবে। শরীরে পানির ঘাটতি না থাকলে প্রস্রাব ও মলত্যাগের অসুবিধা থাকবে না। এছাড়া শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কর্মক্ষম ও সক্রিয় থাকবে। শরীরের ‘ইমিউন সিস্টেম’ ঠিক রাখার জন্য ভিটামিন যুক্ত খাবার খেতে হবে অবশ্যই। যেহেতু প্রবীণদের সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তাই বাইরের লোকজন ও আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে তাদের দূরে রাখাই ভালো। এই কঠিন পরিস্থিতিতে, শুধু সরকারি ব্যবস্থার মুখাপেক্ষী না থেকে আমাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। ফোন মারফত নিয়মিত খবর রাখতে হবে পরিচিত বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের। এতে তারা মানসিকভাবে কিছুটা চাঙ্গা থাকবেন।

এ সংকটে, শুধু সরকারি ব্যবস্থার মুখাপেক্ষি না থেকে আমাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। ফোনে নিয়মিত খবর রাখতে হবে পরিচিত প্রবীণদের। এতে তারা মানসিকভাবে কিছুটা চাঙ্গা থাকবেন। করোনাভাইরাস প্রতিরোধের সরকারি নির্দেশাবলি তাদের নিয়মিত ভাবে জানানো এবং বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে মানুষের কাছে খাদ্যদ্রব্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য এ অতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। আবার অনেক প্রবীণের কাছে অর্থ কোনো বিষয় নাও হতে পারে। তবে এ সংকটে বয়সই প্রধান বাধা। তুলনামূলকভাবে বয়স্ক ও প্রবীণ লোকদের করোনা ভাইরাসে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি হওয়ায় বয়স্ক লোকদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ নির্দেশনা ও কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রবীণ নিয়ে সতর্কতাও বাড়িয়ে দিতে হবে। এছাড়াও শরীর খারাপ লাগলে চিকিৎসকের সঙ্গে সত্ত্বর যোগাযোগ করতে হবে। একইসঙ্গে প্রবীণ লোকদের জরুরি সহায়তা ও সেবাপ্রাপ্তির জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে স¤পৃক্ত করে কমিউনিটি ভিত্তিক বিশেষ সেবা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে স¤পৃক্ত করে দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সুতরাং, বহুমুখী সাবধানতা অবলম্বন করবার সময় এসেছে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"