মতামত

গ্রামীণ হাট-বাজারে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

শেখ আবুল খায়ের আনছারী

করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত সারা বিশ্ব এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। মানুষে মানুষে বাড়ছে সামাজিক দূরত্ব। কমছে মায়া-মমতা, ভালোবাসা। আপনজনের প্রতি ভালোবাসা যেন উধাও হয়ে যাচ্ছে। আর এসব কেউ ইচ্ছা করেই করছে না, করছে বাধ্য হয়েই। পৃথিবীতে এযাবৎকালে যত মহামারি দেখা দিয়েছে এমনটি আর হয়তো দেখা যায়নি। যেখানে আপনজনের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেও শুধু চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই। এমন একটি মহামারি প্রাণঘাতী ভাইরাসের ভয়াল থাবায় ভেঙে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। সারা বিশ্বে প্রায় দুই শতাধিক দেশ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। গত মার্চের প্রথম দিকে বাংলাদেশেও এ ভাইরাসের অস্তিত্ব ধরা পড়ে এবং প্রতিদিনই বাড়ছে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। ঢাকার বিভিন্ন স্থানসহ ইতোমধ্যে দেশের কয়েকটি জেলায় এ ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন জেলায় অনির্দিষ্ট কালের জন্য লকডাউনও ঘোষণা করা হয়েছে।

সচেতন না হলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অবস্থা কি হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। বিশ্বের ধনী দেশগুলো এ ভাইরাস প্রতিরোধে হিমশিম খাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো করোনাভাইরাসের উৎপত্তি স্থল চীনের উহানে এর নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব হয়েছে এবং সেখানকবার লকডাউনও তুলে নেওয়া হয়েছে। আমাদের জন্য সু-খবর হলো, সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশেও জাপানের আরমধহ ২০০ এর অনুকরণে Favipira ২০০ নামের একটি প্রতিষেধক ওষুধ বিভিন্ন ফার্মাসিউটিকেলস কোম্পানি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে এবং সেটি বর্তমানে দেশে আক্রান্ত রোগীদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আছে বলে খবরে পাওয়া যায়। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী মাস নাগাদ ওষুধটি বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া যাবে আশা করা যায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে করোনাভাইরাসে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এখনকার গ্রামীণ জনপদ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে অবস্থান করা কর্মহীন সাধারণ মানুষরা উপায়ন্তর না দেখে গ্রামেই ছুটে আসছে আপনজনদের কাছে। আর এ সময়ে দেশের অধিকাংশ গ্রামেই কোনো কাজ না থাকায় বেকার যুবকরা এখন গ্রামে খোলামেলা পরিবেশে মুক্ত হাওয়ায় পরমানন্দে দিনযাপন করছে। গ্রামের হাট-বাজারের চায়ের দোকানগুলোয় চলছে জমজমাট আড্ডা। যা দেখলে মনেই হয় না দেশে কোনো সমস্যা আছে। গ্রামের পাড়া-মহল্লার ছোট দোকানগুলোতে মোবাইল ফ্লেক্সিলোডসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক জিনিসের দাম অঘোষিতভাবে বাড়িয়ে বিক্রি করছে তাতেও অনেক জায়গায় ঝগড়া ঝামেলা প্রায় হচ্ছে। স্থানীয় অনেক হাট-বাজারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দোকানিরা কৌশলে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে; এতে করে জনসমাগম বা ভিড় ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম-নীতি উপেক্ষিত হচ্ছে। গ্রামীণ হাট-বাজারের এহেন পরিবেশ আমাদের জন্য অবশ্যই দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে দেখা দেবে। সবচেয়ে ভয়াবহ ও আশঙ্কার কথা হলো প্রয়োজনে যাদের হোম কোয়ারেন্টাইন বা বিশেষায়ীত কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা তারা অনেক জায়গায় কোয়ারেন্টাইন মানছে না।

এ মহামারি মোকাবিলায় আমাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সবার আগে জনগণের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হবে। গ্রামে বসবাসকারী অধিকাংশই স্বল্প শিক্ষিত কিংবা নিরক্ষর। মহামারি এ ভাইরাস সম্পর্কে অনেকেরই কোনো ধারণা নেই, বরং রয়েছে অবহেলা। আর এক ধরনের লোক আছে যারা মনে করে রোগ-বালাই সবই আল্লাহার ইচ্ছায় হয়ে থাকে তাই ওসব ভাইরাস কোনো সমস্যাই না। রোগ-ব্যাধি, বালা-মুসিবত, আপদ-বিপদ সবই আল্লাহর ইচ্ছায় হয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহ পাক এ কথাও তো বলে দিয়েছেন বান্দা তুমি সাবধান হও সচেতন হও। নিজে বাঁচো পরিবার পরিজনকে বাঁচাও। আমরা আমাদের অসচেতনতা আর অসাবধানতার কারণে বিপদে পতিত হব আর সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব এ কেমন কথা! একটা মহামারি বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ রূপ ধারণ করে সমস্ত বিশ্বকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে সেটা আমরা প্রতিনিয়ত খবরের কাগছে, টিভিতে, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখছি শুনছি তারপরও কি আমরা সচেতন হব না?

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ ধারণ করার আগে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য মাঠে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পাঁচজনের অধিক লোক হোটেলে, রাস্তার মোড়ে জড়ো হওয়া ঠেকাতে এবং জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া লোকজন যাতে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করে সে বিষয় নিশ্চিত করার জন্য সিভিল প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছে সেনাবাহিনী। নিজে বাঁচতে এবং আপনজনকে বাঁচাতে আমাদের সবার উচিত নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা।

গ্রামে সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে তারপরও গ্রামের পরিবেশ পরিবর্তন হচ্ছে না। চায়ের দোকানের আড্ডা, খেলাধুলা এসব বন্ধ করা যাচ্ছে না। একজন অপরজনের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করছে। অসাবধানতবশত কারো শরীরে করোনাভাইরাস থাকতেই পারে। তাই সবাই সাবধান ও নিরাপদ থাকার জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।

যেহেতু গ্রামেই এখন ঝুঁকি বেশি তাই গ্রামের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। গ্রামে সচেতনতা বাড়াতে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে সেগুলো হলো প্রথমত, প্রতিটি গ্রামে শক্তিশালী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করতে হবে এক্ষেত্রে আমাদের স্কাউট বা রোবার স্কাউটদের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। স্কাউটরা দেশের বিভিন্ন দুর্যোগ মুহূর্তে প্রশংসার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করে থাকে, এখনো করতে পারবে আশা করি। তবে এ ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাও (পিপিই) নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গ্রামের নেতৃস্থানীয় শিক্ষিত সচেতন লোকদের বেশি করে প্রচারণা চালাতে হবে যাতে করে প্রতিদিনের বিশ্ব ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে গ্রামের লোকজনকে অবহিত করতে পারে। তৃতীয়ত, মসজিদের ইমাম-মোয়াজ্জিনদের মাধ্যমেও পাড়া-মহল্লায় সচেতনতামূলক বিভিন্ন কথা বা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিতকরণ বিষয়ে প্রচারণা চালানো যেতে পারে

এবং সবশেষে সেনাবাহিনীকে শুধু বড় শহর কিংবা জেলা উপজেলা পর্যায়ে না রেখে গ্রাম পর্যায়েও দায়িত্ব পালনের জন্য বলা যেতে পারে।

প্রসঙ্গত, শহরের চেয়ে গ্রামেই এখন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এবং ঝুঁকি বেশি এটা বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তাই দেশকে করোনার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা করার জন্য গ্রামের দিকেই নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে আতঙ্কিত নয় সচেতন হোন। নিজে সচেতন হোন অন্যকে সচেতন করুন। আসুন আমরা নিজেরা বাঁচি ও দেশকে বাঁচাই।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"