কৃষি

হাওরের বোরো ধান ও খাদ্য নিরাপত্তা

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

বাংলাদেশে উৎপাদিত চালের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ আসে বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধান থেকে। আর উৎপাদিত বোরো ধানের শতকরা ২২ ভাগ পাওয়া যায় হাওর অঞ্চল থেকে। যে বছর হাওর অঞ্চলে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়, কৃষক নির্বিঘেœ ধান কেটে ঘরে তুলতে পারেন, সে বছর চালের দাম ভোক্তাদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে। নিশ্চিত হয় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা। আগাম বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও অতি বৃষ্টির কারণে কখনো কখনো হাওরের কৃষক কষ্টের ধান ঘরে তুলতে পারেন না। ২০১৭ সালে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাওরের ১০ লাখ টন পাকা ধান বন্যার পানিতে পচে নষ্ট হয়ে যায়। হাওরে বোরো ধান ছাড়া অন্য কোনো ফসলের চাষ হয় না বললেই চলে। বোরো ধানের ওপরই হাওরবাসীর একমাত্র ভরসা। বোরো ধান কাটার পর হাওরের কৃষিজমি তলিয়ে যায় বর্ষার পানিতে। সারা হাওরাঞ্চল থৈ থৈ করে পানিতে। এ সময় নৌকা ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন চলে না। কিছু মানুষ এ সময় হাঁস পালন ও মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু অধিকাংশ হাওরবাসীই জীবিকা নির্বাহ করেন বোরো ধানের উপার্জিত অর্থ দিয়ে।

হাওরে আগাম জাতের বোরো ধান পাকতে শুরু করেছে। আগামী দু-এক সপ্তাহের মধ্যে পুরোদমে শুরু হবে ধান কাটা, মাড়াই, শুকানো ও গোলজাত করার মহোৎসব। অকাল বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও অতি বৃষ্টির কারণে খুব তাড়াতাড়ি কাটতে হয় হাওরাঞ্চলের বোরো ধান। এ ধান কাটার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে টাঙ্গাইল, জামালপুর, ময়মনসিংহ, কুড়িগ্রাম, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও রংপুরসহ উত্তরাঞ্চল থেকে কৃষি শ্রমিকরা ভিড় জমান হাওর অঞ্চলে। এবার করোনার কারণে গণপরিবহন বন্ধ থাকা এবং ভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে অন্য জেলার কৃষি শ্রমিকরা আসছেন না হাওরাঞ্চলে। অপরদিকে ধান কাটা ও মাড়াই যন্ত্রেরও অভাব রয়েছে। এ নিয়ে হাওরাঞ্চলের কৃষকের মনে বিরাজ করছে এক অজানা আতঙ্ক ও সংশয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, হাওর অঞ্চলের সাত জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ৯ লাখ ৩৬ হাজার ১০১ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড ধানের চাষ হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭২১ হেক্টর, উফশী ধানের চাষ হয়েছে ৭ লাখ ৮৫ হাজার ৬৪৫ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের চাষ হয়েছে ১১ হাজার ৭৩৫ হেক্টরের। সবচেয়ে বেশি বোরো ধানের চাষ হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়। জেলাটিতে ২ লাখ ১৯ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এছাড়া নেত্রকোনা জেলায় ১ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭ হেক্টর, কিশোরগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬৭৬ হেক্টর, হবিগঞ্জে ১ লাখ ২০ হাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ১ লাখ ১১ হাজার ৫৫৫ হেক্টর, সিলেটে ৮০ হাজার ৫০ ও মৌলভীবাজারে ৫৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে।

সুনামগঞ্জের একজন স্থানীয় সংসদ সদস্য বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস বোরো ধান। ধান কাটা ও বিপণন উপযোগী করে তুলতে প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন। প্রয়োজনীয যন্ত্র ও শ্রমিক পাওয়া না গেলে কৃষক ধান কাটতে পারবেন না। হাওর অঞ্চলে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। কৃষি মন্ত্রণালয় হাওর অঞ্চলে বিভিন্ন কোম্পানির সহযোগিতায় কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করার কথা বলেছে। কৃষকদের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে ও স্বল্প সুদে ধান কাটা ও মাড়াই যন্ত্র সরবরাহ অব্যাহত আছে। শ্রমিকের চলাচলের বিষয়টি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কীভাবে করা যায়, সেদিকেও কাজ করছে হাওর অঞ্চলের জেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, অন্য জেলার শ্রমিকদের হাওর অঞ্চলে আসার আগে নিজ উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রত্যয়নপত্র নিয়ে আসতে হবে। তাহলে যাতায়াতে কোনো অসুবিধা হবে না।

চলতি বোরো মৌসুমে সারা দেশে ৪১ লাখ ২৮ হাজার ৫১৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এ পরিমাণ জমি থেকে ২ কোটি টন চাল উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে হাওর অঞ্চল থেকে পাওয়া যেতে পারে প্রায় ৪৪ থেকে ৪৫ লাখ টন চাল। এ সময় সাধারণত সিলেট জেলায় বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের কারণে দেখা দেয় আগাম বন্যা। এবার মার্চে বৃষ্টি হয়নি। তবে এপ্রিলে প্রচুর বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর।

করোনাভাইরাসের কারণে বোরো ধান কাটার শ্রমিকের অভাব থাকায় হাওর অঞ্চলে ধান কাটার জন্য জরুরি ভিত্তিতে যন্ত্রপাতি বরাদ্দ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি ৬ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিচালন বাজেটের আওতায় কৃষি যন্ত্রপাতিতে উন্নয়ন সহায়তা প্রদান সংক্রান্ত সমন্বয় কমিটির’ সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হাওর অঞ্চলের ধান কাটার জন্য জরুরি ভিত্তিতে নতুন ১৮০টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ১৩৭টি রিপার সরবরাহের বরাদ্দ প্রদান করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। বর্তমানে হাওর অঞ্চলে ৩৬২টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ১ হাজার ৫৬টি রিপার সচল রয়েছে। এছাড়াও ২২০টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ৪৮৭টি রিপার অতি দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিচালন বাজেটের আওতায় ৫০ শতাংশ ভর্তুকিতে ১০০ কোটি টাকার কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহের কার্যক্রম চলছে। আগামী জুনের মধ্যে ৬৪ জেলায় তিন ক্যাটাগরির কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন- কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার এবং রাইস ট্রান্সপ্লান্টার সরবরাহ করা হবে। এসব আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও ব্যবহার বাড়লে কৃষি উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে, ফসলের উৎপাদন বাড়বে এবং ফসলের অপচয় রোধ হবে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে কৃষি অধিকতর লাভবান ও বাণিজ্যিকীকরণ ঘটবে।

একটি কম্বাইন হারভেস্টার প্রতি ঘণ্টায় এক একর জমির ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দি করতে পারে। এতে খরচ হয় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। অন্যদিকে শ্রমিকের দ্বারা এ কাজ করতে খরচ হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। শ্রমিকের দ্বারা প্রচলিত পদ্ধতিতে ধান কাটা ও মাড়াই কাজে যেখানে ফসলের অপচয় হয় শতকরা ৫ ভাগ, সেখানে কৃষি যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের অপচয় হয় মাত্র শতকরা ২ ভাগ। এছাড়া কম্বাইন হারভেস্টারের দ্বারা ধান কাটার পর খড় আস্ত থাকে। বর্তমানে ধান কাটার মৌসুমে কৃষি শ্রমিকের প্রচুর অভাব দেখা দেয়। মজুরিও বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এমতাবস্থায় কৃষিকে লাভজনক করার একমাত্র উপায় হলো যান্ত্রিকীকরণ। জানা যায়, কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহারে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ খরচ কমানো যায়। সময় বাঁচানো যায় ৭০ থেকে ৮২ শতাংশ এবং শতকরা ৭৫ ভাগ কম শ্রমিকের প্রয়োজন হয়।

সম্প্রতি এক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কারো এতটুকু জমি অনাবাদি না রেখে তাতে ফলমূল, শাকসবজি ও শস্য উৎপাদনের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার আশঙ্কা করোনার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, সেরকম অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ উৎপাদন বাড়িয়ে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকলে অন্যদের সাহায্য করতে পারবে।

ইতোমধ্যে থাইল্যান্ড, কাজাখস্তান, রাশিয়া ও ভারতের মতো বেশ কয়েকটি খাদ্য রফতানিকরাক দেশ বিদেশে খাদ্য রফতানি আদেশ বাতিল বা সীমিত করেছে। ইরান বলছে, তাদের ১০ লাখ টন গম ও ৩ লাখ টন চাল দরকার। থাইল্যান্ডে চালের দাম ইতোমধ্যে বেড়ে টন প্রতি ৪৯২ দশমিক ৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০১৩ সালের আগস্টের পর সর্বোচ্চ। বিশ্ববাজারে চিনি ও ভোজ্য তেলের দাম বাড়তির দিকে। সরবরাহ সংকটের কারণে চলতি মাসে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্য সূচক ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে রফতানি বন্ধ করতে শুরু করেছে। বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা

গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো এটাকে বেশি ভয়াবহ করে তুলবে। মাস দুই পর এ সমস্যা গুরুতর হতে পারে। এটা খুবই একটা অনিশ্চিত সময়। এ সংকট থেকে দ্রুত বেরোনোর জন্য সমন্বিত নীতির আওতায় বৈশ্বিক উদ্যোগ নিতে হবে।

চলতি বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ৬ লাখ টন ধান ও সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহ করবে সরকার। এর মধ্যে মিলারদের কাছ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল ও ৩৫ টাকা কেজি দরে দেড় লাখ টন আতপ চাল এবং কৃষকের কাছ থেকে ৬ লাখ টন ধান কেনা হবে। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে প্রতি কেজি ২৮ টাকা দরে ৭৫ হাজার টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বুধবার থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত গম সংগ্রহ চলবে। আগামী ২৬ এপ্রিল থেকে বোরো ধান এবং ৭ মে থেকে চাল সংগ্রহ শুরু হবে। সংগ্রহ অভিযান শেষ হবে ৩১ আগস্ট।

বাংলাদেশ চাল, শাকসবজি, মাছ, মাংস, দুধ ও ডিম উৎপাদনে মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও এখনো আমাদের দেশের মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য বিদেশ থেকে গম, ভুট্টা, ডাল, ভোজ্য তেল, চিনি, পেঁয়াজ, রসুনসহ বিভিন্ন মসলা, গুঁড়া দুধ, হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু ও মাছের খাবার আমদানি করতে হয়। করোনাভাইরাসের প্রভাবে এসব জিনিসের দাম বিশ্ব বাজারে কী অবস্থায় দাঁড়ায়Ñ তা এই মুহূর্তে বলা যাবে না। ভবিষ্যতে বিশ্বে যে একটি খাদ্য সংকট আসন্ন সেটাকে ধরে নিয়েই আমাদের খাদ্য উৎপাদন ও সংগ্রহ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি কৃষি। করোনার প্রভাব থেকে কৃষিকে বাঁচানোর সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ইতোমধ্যে শাকসবজির দাম কমে যাওয়ায় কৃষকের মনোবল ভেঙে গেছে। কিছুদিনের মধ্যে বোরো ধান কাটা শুরু হবে। কৃষকের কাছে এ সময়ে নগদ অর্থ নেই। অর্থের অভাবে কৃষকের বোরো ধান কাটা যাতে ব্যাহত হয়, সেজন্য বোরো ধান চাষিদের স্বল্প সুদে ও

স্বল্প সময়ের জন্য কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সারা দেশে ‘কৃষক অ্যাপ’ এর মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বোরো ধান কেনার নিয়ম চালু করতে হবে। এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক উপকৃত হবেন এবং ঘরে বসে ধানের মূল্য পাবেন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।

লেখক : কৃষিবিদ ও কলামিস্ট

সাবেক মহাব্যবস্থাক (কৃষি), নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস লি.

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন

[email protected]

 

"