বিশ্লেষণ

দুর্যোগ মোকাবিলায় নৃবৈজ্ঞানিক জ্ঞান

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন

পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের মানুষজন নিয়মিতই বিবিধ ধরনের আকস্মিক ঝুঁকি ও দুর্যোগ মোকাবিলা করে চলেছে। কোথাও প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বন্যা, খড়া, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্প), আবার কোথাও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ (বায়ুদূষণ, সড়ক দুর্ঘটনা ও বন নিধন)। যা তুলনামূলক বেশি ঘটে। এ ছাড়া স্থান-কাল-নির্বিশেষে কিছু দুর্যোগ ঘটতে দেখা যায় যেগুলো সম্বন্ধে আগে থেকে অনুমান করা যায় না। উদাহরণস্বরূপ ইবোলা ভাইরাস, চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু ও সাম্প্রতিক সময়ে করোনাভাইরাসের আঘাত। যে ধরনের দুর্যোগই ঘটুক না কেন, এগুলোর প্রভাব রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা, আয়-বৈষম্য, ক্ষমতা-কাঠামো ও সম্পদে জনগণের প্রবেশাধিকারের চলমান অবস্থা স্পষ্ট হয়। অন্যভাবে বললে সমাজের প্রান্তিক কিংবা নিম্নআয়ের মানুষগুলোই সবচেয়ে আগে ও বেশি ঝুঁঁকির সম্মুখীন হয়। ঐতিহাসিকভাবে এটি ঘটে এসেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

দুই

দুর্যোগকালীন বিভিন্ন ধরনের জরুরি সেবা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন দেখা দেয়। তন্মধ্যে পরিবেশ বিজ্ঞানী, রসায়নবিদ, চিকিৎসক, মানবাধিকার কর্মী ও প্রকৌশলীরা অন্যতম। সামাজিক বিজ্ঞানীদের অবদানও উল্লেখযোগ্য; যেমন- অর্থনীতিবিদরা দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি অর্থের পরিমাপে হিসাব করে দেখান যে, দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে কি পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন যা দিয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জরুরি সেবা প্রদান করা যেতে পারে। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে আরো কিছু পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যেগুলো পরিপ্রেক্ষিত নির্ভর, জটিল, মানুষের সাংস্কৃতিক আচরণ, বোধ ও শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। এক কথায়, এগুলো পৃথক বা স্বতন্ত্র কোনো বিষয় নয়। এই বিষয়গুলোর আন্তঃসম্পর্ক সরল কিংবা অপ্রশিক্ষিত দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত পর্যবেক্ষণমূলক দক্ষতা ও সামাজিক বিজ্ঞানের তত্ত্বীয় দৃষ্টিভঙ্গি। এ ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান জ্ঞানকান্ডের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এই প্রবন্ধে আমার বক্তব্য নৃবিজ্ঞানের ভূমিকার ওপর সীমাবদ্ধ রাখব এবং বিষয় হলো বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে করোনাভাইরাস দুর্যোগ।

রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো ও আমলাতন্ত্র কতখানি মানবিকতা, দক্ষতা, ধৈর্য, সৃজনশীলতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দুর্যোগে সাড়া দেয়, তা জনসাধারণের কাছে সবচেয়ে আগ্রহের বিষয়। প্রশাসনিক কাঠামোগুলো নিঃসন্দেহে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অনুশীলন করে। কিন্তু দুর্যোগের সময় বিপদাপন্ন মানুষ আশা করে যে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনগুলো নমনীয়, দক্ষ, প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দেবে। প্রশাসনগুলোর উচিত হবে নৃবিজ্ঞান বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ বিবেচনায় আনা। নৃবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখান যে দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে মানুষের মনে, সংস্কৃতিতে, সমাজে, ব্যক্তি জীবনে কি কি ধরনের পরিবর্তন আসে।

তিন

করোনাভাইরাসের আক্রমণ সব স্থানে, সমাজে ও মানুষের ওপর সমানভাবে প্রভাব রাখবে না। এই দুর্যোগ মোকাবিলায় রাষ্ট্রের জরুরি উদ্যেগের প্রভাবও শ্রেণিভেদে অসমান প্রভাব রাখবে। আমার শ্রেণি অবস্থানকে একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যাক। আমি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি। দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে করে আমার অর্থনৈতিক আয় বা বেতনের ওপর বিন্দুমাত্র নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি, কিন্তু যারা বিশ^বিদ্যালয়ের সীমার ভেতরে ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা করে, রিকশা চালিয়ে ও ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করে তারা অর্থনৈতিকভাবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মানে এই নয় যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখার সরকারি ঘোষণাটি ভুল হয়েছে। বরং এই বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে বলতে চাই যে, দুর্যোগের প্রভাব অর্থনৈতিক ও সামাজিক শ্রেণিভেদে এক নয়। দুর্যোগ নৃবিজ্ঞানী সুসানা হফম্যান বলেন, ‘দুর্যোগ হচ্ছে প্রকাশকারী। এটি প্রকাশ করে যে সমাজে নীরবে কী চলছে এবং তা কাকে সবচেয়ে বেশি বিপদাপন্ন করছে। অন্যভাবে বললে, দুর্যোগ আসার আগেই সমাজে বৈষম্য ছিল ও বিরাজমান আছে যা নির্ধারণ করে দেয় যে নিম্নআয়ের মানুষ দুর্যোগকালীন বেশি মাত্রায় ঝুঁকির সম্মুখীন হবে।

চার

রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো ও আমলাতন্ত্র কতখানি মানবিকতা, দক্ষতা, ধৈর্য, সৃজনশীলতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দুর্যোগে সাড়া দেয়, তা জনসাধারণের কাছে সবচেয়ে আগ্রহের বিষয়। প্রশাসনিক কাঠামোগুলো নিঃসন্দেহে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অনুশীলন করে। কিন্তু দুর্যোগের সময় বিপদাপন্ন মানুষ আশা করে যে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনগুলো নমনীয়, দক্ষ, প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দেবে। প্রশাসনগুলোর উচিত হবে নৃবিজ্ঞান বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ বিবেচনায় আনা। নৃবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখান যে দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে মানুষের মনে, সংস্কৃতিতে, সমাজে, ব্যক্তি জীবনে কি কি ধরনের পরিবর্তন আসে। দুর্যোগকালীন হতাশা ও উদ্বিগ্নতা মানুষের স্বাভাবিক আচরণে ব্যাঘাত ঘটায়। এছাড়াও দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী রাষ্ট্র থেকে তৎক্ষণাৎ সেবা পেতে চায়, কারণ তাদের ইন্স্যুরেন্স কিংবা সঞ্চয় করার সামর্থ্য নেই। দুর্যোগের পরিস্থিতিতে তারা সাধারণত সামাজিক পুঁজি (আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, কাল্পনিকের আত্মীয়) ওপর ভরসা করে। এরূপ জটিল পরিস্থিতিতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত হবে বিপদাপন্ন মানুষের মানবাধিকার রক্ষা করা। পুলিশের লাঠির আঘাত কিংবা অপমানজনক আচরণের (যেমন- কানধরে উঠাবসা) মাধ্যমে জনগণের চলাফেরাকে নিয়ন্ত্রণ রাখার পদ্ধতি কাম্য নয়। তা প্রশাসনের ওপর জনসাধারণের আস্থাকে কমিয়ে দেয়। এরূপ আচরণ বিপদাপন্ন মানুষকে আরো অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দেয়, যা মানবাধিকার পরিপন্থি। প্রশাসনের উচিত হবে করোনাভাইরাস দুর্যোগ পরিস্থিতিকে উন্নয়নের জন্য মানুষে স্থানীয় স্বাস্থ্য-চর্চা ও স্বাস্থ্য জ্ঞান সম্পর্কে অবগত হওয়া ও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করা। সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ব্যতীত এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা করা সত্যিই কষ্টসাধ্য হবে।

প্রায়ই দেখা যায় যে, ত্রাণ বিতরণকারী কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে খাবারের প্যাকেট দিচ্ছে এবং তাকে ঘিরে বহুজন ছবি তুলে তা পত্রিকায় ও সামাজিক ইলেকট্রনিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করছে। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখা হয়নি যে সাহায্য গ্রহণের ছবি তুলতে সাহায্য গ্রহণকারীর সম্মতি আছে কি নেই। সাহায্য গ্রহণকারীর কাছে এটি অমর্যাদাকরও হতে পারে, সেটি খেয়াল রাখা জরুরি। বলা বাহুল্য, ব্যক্তির মানমর্যাদা ও আত্মসম্মান সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নির্মিত ও চর্চিত। এতে একটি বিষয় প্রমাণ হয় যে সাধারণত সাহায্য গ্রহণকারী গরিব এবং তাদের মানমর্যাদার বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় না। তাদের কণ্ঠস্বর পলিসি পর্যায়েও অনুপস্থিত। এটি যে বহুদিন ধরে ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত হয়ে এসেছে তা মনে রাখা জরুরি। এরূপ নির্মাণের অবসান অবশ্যই হওয়া উচিত। এতে দুর্যোগ-পরবর্তী বৈষম্য ও ত্রাণ বিতরণকারীদের অসমীচীন আচরণ দূর হবে।

পাঁচ

বিশ্বে করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি বেড়েই চলেছে। এটি অনুমান করা যায় যে, ঘনবসতিপূর্ণ এই বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে পারে। সরকার বেশকিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনসাধারণকে অযথা রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতে অনাগ্রহী করছে। চিকিৎসকরা নিজ স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের সেবা দিচ্ছে। মানবাধিকারী কর্মীরা গরিবদের খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে। যেহেতু এই ভাইরাস মানুষের জীবনে দুর্যোগ নিয়ে এসেছে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তথা সমাজিক জীবনে ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন নিয়ে এসেছে তাই এই দুর্যোগ মোকাবিলায় সামাজিক বিজ্ঞানীদের বিশেষ করে নৃবিজ্ঞানীদের পরামর্শ ও গবেষণালব্ধ জ্ঞান কাজে লাগানো যেতে পারে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

"