মুক্তমত

সংঘবদ্ধভাবেই করোনা প্রতিরোধ করতে হবে

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে এবং তা নিয়ে চরম শঙ্কায় আছে বিশ্ব। এরই মধ্যে বিশ্বে এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৯ লাখ ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। বর্তমানে মৃতের সংখ্যা ১ লাখের ওপর। বাংলাদেশেও এরই মধ্যে এই ভাইরাস তার ভয়ংকর থাবা বিস্তার করেছে। এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজারেরও বেশি এবং মারা গেছেন অর্ধশতের কাছাকাছি। ধারণা করা হচ্ছে, পরীক্ষার আওতায় না আসা অনেকে এই ভাইরাসে আক্রান্ত এবং তারা নিজের অজান্তে আরো অনেকের মধ্যে ভাইরাস সংক্রমিত করে যাচ্ছে। এর জন্য যত ব্যাপক পরিসরে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন ছিল, আমরা এখনো তা করে উঠতে পারিনি। আশার কথা, দেরিতে হলেও সরকার করোনাভাইরাস শনাক্তের জন্য সারা দেশে পরীক্ষার সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। যত বেশি সংখ্যায় পরীক্ষা হচ্ছে ততই আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞই নানা আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, ঘনবসতির এই বাংলাদেশে মহামারির মাত্রা ধারণার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। তদুপরি, সচেতনতার অভাব এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করার কারণে অনেক বেশি মানুষ আক্রান্ত হবে। অন্যদিকে অভিজ্ঞ চিকিৎসাকর্মী এবং উন্নত মানের চিকিৎসা সুবিধার অভাবে রোগী মৃত্যুর হারও বেশি হতে পারে। আমরা তার কিছু নজিরও দেখতে পাচ্ছি। সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসন অনেক এলাকা লকডাউন করেছে। কিন্তু বহু মানুষই তা মানছে না। অনেকেই লুকিয়ে-ছাপিয়ে ঢাকা ছাড়ছে কিংবা ঢাকায় আসছে। বাজার ও দোকানপাটে মানুষ গাদাগাদি করে কেনাকাটা করছে। রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা দিচ্ছে। নিছক কৌতূহল মেটাতে অনেকে রাস্তায় নেমে ঘোরাঘুরি করছে। অনেকেই মনে করে, দ্রুত সংক্রমণের ঝুঁকি নিরোধে আরো কঠোরভাবে লকডাউন অনুসরণ করতে হবে। কিছু মানুষের অসচেতনতার কারণে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত হবে না।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে উন্নত দেশগুলোও হিমশিম খাচ্ছে। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেটর সুবিধা দিতে না পারায় অনেক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক হাসপাতালে অধিকসংখ্যক রোগী হলে অক্সিজেন সুবিধাও ঠিকমতো দেওয়া যায় না। চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীর সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। আতঙ্কিত হয়ে অনেক বেসরকারি ক্লিনিকে সেবা প্রদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলে আমরা সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করব কীভাবে? আমরা মনে করি, হাসপাতালের শয্যা, রসদ-সরঞ্জাম বৃদ্ধি, চিকিৎসাকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান, তাদের নানাভাবে উজ্জীবিত করা, পর্যাপ্তসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় কাজগুলো দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে এবং এক মহাদুর্যোগের হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে।

করোনাভাইরাসের প্রভাবে সামাজিকভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। দেশের অর্থনীতিতে একটা স্থবিরতা এসে গেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী। উন্নত বিশ্ব এটা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এই সংকট উত্তরণের আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, এটা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় নিয়োজিতদের জন্য স্বাস্থ্যবিমার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। পুরস্কৃত করারও ঘোষণা দিয়েছেন। করোনা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে বাইরে থেকে চিকিৎসক-নার্স আনার কথাও বলেছেন। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে যারা আছেন এবং করোনা পরিস্থিতির কারণে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, তাদের জন্য রেশনের ব্যবস্থা করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। দুর্ভোগের সময় কেউ অনিয়ম করলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুশিয়ার করেছেন তিনি। একই সঙ্গে এই সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ করেছেন। এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক পাওয়া যায়নি। কাজেই আপাতত প্রতিরোধ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। সংক্রমণ ঠেকাতে জনসমাবেশ এড়িয়ে ঘরে থাকতে হবে। ঘরে থাকা নিশ্চিত করতে সবার ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ারও কোনো বিকল্প নেই।

আবার করোনার কারণে কিছু অমানবিক ঘটনাও ঘটেছে। গাইবান্ধায় মাতৃসদন থেকে প্রসূতিকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর রাস্তায় সন্তান প্রসব করেছেন এক নারী। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে জামালপুরে। এ সংকটে চিকিৎসকদেরই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। সংঘবদ্ধভাবেই প্রতিরোধ করতে হবে করোনাভাইরাস।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকারিভাবে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময়ে ঘরে থাকার নির্দেশনা মানার বদলে সাধারণ ছুটিকে অনেকে সপরিবারে গ্রামে বেড়ানোর সুযোগ হিসেবে বেছে নেওয়ায় হিতে বিপরীত হয়েছে। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। সরকারি হিসাবে জীবনঘাতী ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা সীমিত হলেও প্রকৃত সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি চিহ্নিত হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্তদের চিহ্নিত করার মতো সুযোগ-সুবিধা এখনো সীমিত। এ অবস্থায় রোগ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করতে দেরিতে হলেও সরকার কঠোর হয়েছে। ঘরে থাকা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকি বাড়ানো হয়েছে। জনসচেতনতা সৃষ্টিতে তা অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়।

লেখক : সহ-সভাপতি, এফবিসিসিআই, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেড

 

"