বিশ্লেষণ

আশা জাগানো রেমিট্যান্সে করোনার থাবা

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় লকডাউন চলছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষে থাকা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, ওমান, কাতার, ইতালি, বাহরাইনসহ অধিকাংশ দেশে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। বেশির ভাগ দেশে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় হাতে টাকা থাকলেও অনেকে পাঠাতে পারছেন না। আবার অনেকে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলার জন্য সঞ্চয় করছেন। বিদেশে যারা অ্যাপভিত্তিক ভাড়া গাড়ি বা ট্যাক্সি চালিয়ে জীবন নির্বাহ করেন, অস্থায়ীভাবে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে হোটেল, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন কাজ করেন, তারা নিজেরা অনিশ্চয়তায় জীবন পার করছেন। এর বাইরে করোনা আতঙ্কে অনেক প্রবাসী এরই মধ্যে দেশে ফিরেছেন। পরিস্থিতির উন্নতি হলে দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পরও অনেকে যে কর্মহীন হয়ে পড়বেন, সে আভাস মিলছে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে। ফলে আগামীতে রেমিট্যান্স আরো কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান দুই চালিকা শক্তি রফতানি ও রেমিট্যান্স। রফতানি আয় কমে গেলে দেশের শিল্প-কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের আয় কমে যাওয়া বা কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। অন্যদিকে প্রবাসীরা টাকা পাঠানো কমিয়ে দিলে তাদের পরিবার দেশে আগের মতো খরচ করতে পারবেন না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ব্যবসা-বাণিজ্যে। কমে যাবে বেচাকেনা। চাহিদা কমে গেলে ভোক্তা পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতির মুখে পড়বে। সব মিলিয়ে চলতি বছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ বড় চ্যালেঞ্জ হবে সরকারের জন্য।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এরই মধ্যে বলেছে বাংলাদেশের জিডিপি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ১ দশমিক ১ ভাগ কমে যেতে পারে। তাদের হিসাবে এতে মোট ৩০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হবে, ৮ লাখ ৯৪ হাজার ৯৩০ জন চাকরি হারাবে। ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচকই নিম্নমুখী। তার মধ্যেও ভালো করছিল রেমিট্যান্স। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১ হাজার ৪২ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১০ ভাগ বেশি। এই গতি ধরে রাখা এখন কঠিন হয়ে যাবে বাংলাদেশের জন্য। যেসব দেশ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সেখানে অর্থনৈতিক কর্মকা- এরই মধ্যে কমে গেছে। সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি শ্রমিক বা ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনমতো আয় করতে না পারলে দেশে পরিবারের কাছে আগের মতো টাকা পাঠাতে পারবেন না। তাই স্বভাবতই রেমিট্যান্স কমতে থাকবে। এর প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। করোনার প্রভাবে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দামে ২০০৮ সালের পর সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে। শুধু চলতি বছর ৫০ ভাগ কমে অপরিশোধিত ব্রেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৩৩ ডলারে। এই পরিস্থিতি খুব সহসায় কাটবে এমন আভাস মিলছে না। কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতি ধীর হলে জ্বালানির চাহিদা এমনিতেই কমতে থাকে। অন্যদিকে তেলের উৎপাদন কমিয়ে বাজার সামাল দেওয়ার বিষয়েও একমত হতে পারেনি সৌদি আরব ও রাশিয়া। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেল নির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোকে। বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের বড় অংশটাই কিন্তু আসে এই অঞ্চল থেকেই।

কিন্তু এই মহামারি করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে প্রবাসী আয়ে। ইতোমধ্যে সাপ্তাহিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত আমদানি-রফতানি খাতের পর প্রবাসী আয়ের এই ধাক্কা কোন দিকে মোড় নেবে তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রবাসীরা প্রায় ৩৮ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠান। দ্বিতীয় সপ্তাহে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ৪২ কোটি ডলারে। তবে তৃতীয় সপ্তাহে সেটি কমে ২৬ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে চলতি মাসের প্রথম ১৯ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ১০৭ কোটি ডলার। এতে পুরো মার্চ মাসে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ১৫০ কোটি ডলার অতিক্রম হওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুধু মার্চ মাসই নয়, সামনের মাসগুলোতে রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বগতি ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন ব্যাংকাররা। তারা বলছেন, বাংলাদেশে যেসব দেশ থেকে বেশি রেমিট্যান্স আসে, তার সবগুলো দেশই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। ফলে সামনের মাসগুলোতে রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে। বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত, যুক্তরাজ্য, ওমান, মালয়েশিয়া, কাতার, ইতালি, বাহরাইন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসছে। এর বাইরে সিঙ্গাপুর, হংকং, জাপান ও জার্মানি থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে। কিন্তু এই ১৫ দেশের কোনোটিই করোনাভাইরাসমুক্ত নয়। এমনকি এর মধ্যে কোন কোন দেশ করোনার থাবায় মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে যাচ্ছে। বৈধপথে রেমিট্যান্স আহরণ বাড়াতে নানা উদ্যেগ নিয়েছে সরকার।

এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, রেমিট্যান্স কমে গেলে অর্থনীতিতে আরো চাপ তৈরি হবে। কেননা, গত কয়েক মাস ধরে রফতানি কমে গেছে। আমদানির পরিমাণও বেশ কিছুদিন ধরে কমছে। এমন পরিস্থিতিতে আশা জাগাচ্ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স। বিশেষ করে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা ঘোষণার ফলে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি ছিল ২০ শতাংশের বেশি। তবে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় সে সূচকেও পতন শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালের মার্চজুড়ে ১৪৫ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান প্রবাসীরা। এবার ১২ মার্চ পর্যন্ত প্রথম দুই সপ্তাহে প্রবাসীরা পাঠান ৮০ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। তবে ২৪ মার্চ পর্যন্ত পরবর্তী দুই সপ্তাহে এসেছে মাত্র ৩৭ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। শেষের সাত দিনে অধিকাংশ দেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠানো প্রায় একরকম বন্ধ রয়েছে। ফলে মার্চের বাকি কয়েক দিনে রেমিট্যান্স আরো কিছুটা যোগ হলেও তা আগের বছরের মার্চের ধারেকাছেও যাবে না। যদিও গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে প্রবাসীরা ১ হাজার ২৪৯ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১ হাজার ৪১ কোটি ডলার। এ হিসাবে রেমিট্যান্স বেশি এসেছিল ২০৮ কোটি ডলার বা ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রবাসেই অনেকের টাকা দরকার, যে কারণে তারা সঞ্চয় করে রাখছেন। হোটেলসহ সেবা খাতে যারা কাজ করতেন, তাদের আয় কমে গেছে। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে গত কয়েক দিনে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি মেনে নিয়েই সামনের দিকে এগোতে হবে।

বর্তমানে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠালে ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে রেমিট্যান্সে এই প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাজেটে এজন্য ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত ৬ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা প্রকাশ করে। আর ২ অক্টোবর থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠালে তাৎক্ষণিক ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা কার্যকর হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রণোদনা দেওয়ার পর থেকেই প্রতি মাসে তার আগের মাসের চেয়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছিল। তবে সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি মাসে তার আগের মাসের চেয়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যায়। জানুয়ারি মাসে প্রায় ১৬৪ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স আসে। সেখানে ফেব্রুয়ারি মাসে আসে ১৪৫ কোটি ডলার। যদিও এটি গত অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাসের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি ছিল। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) দেশে প্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স আসে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। কিন্তু এই ধারাবাহিকতা রক্ষা পাবে কি-না সে বিষয়ে শঙ্কা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় শক্তি এখন প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। অর্থনীতির অন্যান্য সূচক নিম্নমুখী হলেও বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) ১ হাজার ১০৪ কোটি ১৪ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ১৬৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। কিন্তু এই করোনাভাইরাসে আশার মধ্যে নিরাশার হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এরপরও আমরা আশা করব এই ঘোর অন্ধকার কেটে গিয়ে আবার আলো নিয়ে আসবে আমাদের রেমিট্যান্সে।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"