জনস্বাস্থ্য

করোনার বিবর্তন ও চিকিৎসা

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

ডা. এম এ হাসান

কোভিড-১৯ জাতীয় করোনাভাইরাসের উৎপত্তি ও বিস্তার নিয়ে নানামুখী বিতর্ক রয়েছে। মূলত সারা বিশ্বে মহামারি সৃষ্টিকারী এই করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) ২০০২-০৩ সালে চীন, হংকং ও তাইওয়ানে বিস্তার লাভকারী মরণব্যাধি সার্সের জ্ঞাতিভাই। ওই সময়টাতে সার্স, বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু ইত্যাদির বিস্তার নিয়ে বিশ্ববাসী যখন উৎকণ্ঠিত, ঠিক সেই সময়টাতে ব্যক্তিগতভাবে আমি এইচআইভি এপিডেমিয়োলজি এবং ওই রোগের প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণারত ছিলাম। ওই গবেষণার বিষয়টি যখন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসকে (এনআইএআইডি) জানাই, তখন ড. অ্যান্থনি ফাউসি তাদের এইডস ডিভিশনের শীর্ষ কর্মকর্তা ড. জোনাথন ক্যাগানকে নির্দেশ দেন আমার গবেষণা রিভিউয়ের জন্য।

ওই গবেষণায় (এইডস প্রিভেন্টিভ ড্রাগ, জুলাই ২০২০, এনআইএআইডি, ইউএসএ) ভাইরাস বিস্তার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও অ্যানথ্রাকুইনের মতো ওষুধের ব্যবহারের কথা বলা হয়। এ সময় ইম্যুউনরেসপন্স বেগবান করার জন্য জিঙ্ক ও সেলেনিয়াম প্রয়োগের কথা বলা হয়। এই ওষুধগুলো সার্স ভাইরাস ও হারপেস ভাইরাস প্রতিরোধে কিছুটা কার্যকর ছিল। এই গবেষণায় স্পষ্ট হয় যে, পরিবেশের ওপর আঘাতের কারণে কার্বন ডাইঅক্সাইডের আধিক্য ও মহাজাগতিক রশ্মির নেতিবাচক প্রভাবে জুনোটিক ভাইরাস এইচআইভি বিবর্তিত হয়ে মানবদেহে আশ্রয় নেয়। এটা হয়েছিল আফ্রিকার মাটিতে।

এসব গবেষণার আলোকে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি ও বিবর্তন বিশ্নেষণ করা গেছে। প্রায় ৬০০ বছর আগে যে ভাইরাসটি কখনো উষ্ণ, কখনো শীতল পৃথিবী ও বরফের সঙ্গে মিলেমিশে ছিল, তা কী করে পরিবেশের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অক্সিজেনের অভাব ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের আধিক্যের মাঝে সূর্যহীন দিনগুলোতে মাইক্রোরেডিয়েশনের কারণে বিবর্তিত হয়ে সার্স, মার্স ও পরিশেষে কোভিড-১৯ এ বিবর্তিত হলো, তা পর্দার অন্তরালে রয়ে গেছে। এইচআইভি সংক্রান্ত গবেষণার (বেসিক কোয়েশ্চানস অন এইডস অ্যান্ড ফিল্ড লেভেল রিসার্চ, ডা. এম এ হাসান, আইএসবিএন-৯৮৪-৩২-৩৫৬২-২) আলোকে এটাই ছিল কোভিড-১৯ এর বিবর্তনবিষয়ক হাইপোথিসিস। এভাবেই উহানের মৎস্য ও জীবজন্তুর আড়তে করোনা নামক আরএনএ ভাইরাস আপন চেহারা ছেড়ে কোভিড-১৯ এ বিবর্তিত হয়।

মনে রাখা প্রয়োজন, এইচআইভি ভাইরাসের মতো এটি একটি জুনোটিক ভাইরাস, যা কিনা জীবজন্তু থেকে বিবর্তিত হয়ে মানুষের শরীরে এসেছে এবং আক্রান্তের কোষে শত শত ছায়া ভাইরাস তৈরি করেছে, যা কিনা আকৃতি, চেহারা, গড় ওজন এবং প্রকৃতিতে একেবারে মূল ভাইরাসের মতো। এই ভাইরাস আক্রান্তের ফুসফুস ও ফুসফুসের পর্দায় ভয়াবহ প্রদাহ সৃষ্টি করে তা অকার্যকর করে তোলে। স্বাভাবিকভাবে ৮৫ শতাংশ আক্রান্ত রোগী বিনা চিকিৎসায় ভালো হলেও ৫ শতাংশ ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। আক্রান্তদের মধ্যে যারা বুড়ো, যাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, যারা অ্যাজমা, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি হলেও ক্ষেত্রবিশেষে এটি তরুণ, স্বাস্থ্যবান, এমনকি ১৩ বছরের যুবককে রেহাই দেয় না। এটা প্রমাণিত হয়েছে যুক্তরাজ্যে।

এই ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে সৃষ্ট নিউমোনিয়া প্রতিরোধে জিঙ্কের ভূমিকা থাকলেও হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের ভূমিকা কতটুকু নিরাপদ, তা ভাবার বিষয়। ২০০২-০৩ এইচআইভি ভাইরাস প্রতিরোধে আমি ২০০ মিলিগ্রাম হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন দুবার করে ব্যবহার করতে বলেছিলাম; দীর্ঘমেয়াদে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনা করে দৈনিক ১০০ মিলিগ্রাম ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছিলাম। এটা ভাইরাসের বৃদ্ধি অর্থাৎ রিপিকেশন ও টার্গেট ফিক্সেশন প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে আক্রান্তের শরীরে ল্যাস্টল কমিয়ে আনে। এটা প্রদাহও কমায়।

৬০ থেকে ৭০ ভাগ অ্যালকোহল, ক্লোরিন, আয়োডিনের মতো হ্যালোজেন যেভাবে এই ভাইরাস বিনাশ করে, তেমন করে কোনো খাবার ওষুধ দিয়ে এটি মেরে ফেলা যাবে না বা এটাকে শতভাগ ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। এই ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট অ্যান্টিবডি যেমন অনেককে সারিয়ে তুলতে পারে, তেমনি এই ভাইরাসের অংশবিশেষ অর্থাৎ প্রোটিন অণুবিরোধী ভ্যাকসিন একে প্রতিরোধ করতে পারে।

মনে রাখা প্রয়োজন, ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ উপসর্গবিহীন আক্রান্ত নিরন্তর করোনাভাইরাস ছড়াচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আরো ব্যাপক টেস্টের উদ্যোগ নিতে হবে এবং তা এখনই। এটাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে। করোনা ভ্যাকসিন কবে আমাদের হাতে আসবে এবং তা একজনকে কতদিন সুরক্ষা দেবে, সেটা ভাবার বিষয়। আপাতত সামাজিক দূরত্বের সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাসবিরোধী কেমিক্যালস ও রেডিয়েশন প্রধান অবলম্বন হয়ে আছে। সেই সঙ্গে ফ্যাভিপিরাভিরের মতো ভাইরাসনাশক ওষুধ এবং উপরোক্ত চিকিৎসা আমাদের জন্য ভরসা। রোগের ব্যাপকতা পরীক্ষা এবং এর বিস্তার প্রতিরোধ

করা আমাদের আশু লক্ষ্য। নতুন করে আরো ভয়াবহ ভাইরাস যেন ছড়িয়ে না পড়ে, তার জন্য দৃষ্টি ফেরাতে হবে কার্বন নিঃসরণসহ বৈশ্বিক দূষণ প্রতিরোধ ও ব্যাপক বনায়নের দিকে।

লেখক : ইমার্জিং ডিজিজ ও অ্যাজমা বিশেষজ্ঞ ও আহ্বায়ক

ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি

[email protected]

 

"