শিক্ষা

টেলিভিশনে বিকল্প পাঠদান‘আমার ঘরে আমার স্কুল’

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

সাহাদাৎ রানা

করোনাভাইরাসের কারণে নতুন এক চ্যালেঞ্জের সামনে পুরো বিশ্ব। সেই চ্যালেঞ্জের মধ্যেই যেন প্রতিদিন দিন পার করছে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। তাই সারা বিশ্বে এখন আলোচনার প্রধান ও একমাত্র বিষয় হলো করানোভাইরাস। কেননা এর বিরূপ প্রভাবে প্রায় থমকে সবকিছু। যেন থেমে গেছে প্রায় ৬০০ কোটি মানুষের জীবনযাত্রাও। দেশে দেশে চলছে লকডাউন ও কারফিউ। বন্ধ হয়ে গেছে অফিস-আদালত থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। সীমিতভাবে চলছে দোকানপাট। বন্ধ রয়েছে প্রায় সব দেশের বিমানবন্দরও। এ কারণে এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের যোগাযোগও প্রায় বিচ্ছিন্ন। এমন পরিস্থিতির মূল কারণ প্রতিদিনই সারা বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। কঠিন এমন অবস্থা থেকে বিশ্ববাসী কবে নাগাদ মুক্তি পাবেন তা কেউ বলতে পারছে না। কারণ এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। তাই করোনাভাইরাস বিষয়ে সবার মধ্যে কাজ করছে ভয়। আপাতত করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ঘরে থাকাটা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। এটাই একমাত্র পথ। তাই সেই পথেই হাঁটছে পুরো বিশ্ব। বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন অনেকে। এমন খবরে সবার মধ্যে কাজ করছে অস্বস্তি।

তবে এমন অস্বস্তির মধ্যেও জীবন চলা থেমে নেই। সবাই বাড়িতে থেকে যার যার কাজ করে যেতে চেষ্টা করছেন। নিত্যদিনের কাজ করতে না পারার কারণে ক্ষতির সামনে সবাই। করোনাভাইরাসের কারণে তাই কম বেশি সবাই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। তবে ক্ষতির বিষয়ে এক্ষেত্রে একটি বিষয় আড়ালে চলে যাচ্ছিল। শিক্ষার্থীদের ক্ষতির বিষয়টি। কেননা স্কুুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির তালিকায় রয়েছে তাদের নামও। করোনাভাইরাসের কারণে এরই মধ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা অন্তত বলা যায় ঈদুল ফিতরের আগে স্কুল-কলেজ আর খোলার সম্ভাবনা নেই। দীর্ঘ এই সময়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষতির বিষয়টিও অনেক বড়। বিশেষ করে যখন আমাদের দেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক। করোনাভাইরাসের কারণে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাসূচিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে এটাই স্বাভাবিক। এরই মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষাসহ অনেক পরীক্ষা স্থগিত হয়ে গেছে। তাই সবার মধ্যেই কাজ করছে উৎকণ্ঠা। তবে এমন সংকটের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের ঘরে বসে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সরকার এসব ছাত্রছাত্রীদের কথা বিবেচনা করে নিয়েছে সেই উদ্যোগ। যার নাম দেওয়া হয়েছে বিকল্প পাঠদান। এই বিকল্প পাঠদান টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হচ্ছে। ফলে ছাত্রছাত্রীরা ঘরে বসেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বিকল্প উপায়ে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া চালু রাখার উদ্যোগ নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের উদ্যোগে সংসদ টেলিভিশনে এরই মধ্যে ‘আমার ঘরে আমার স্কুল’ নামে শ্রেণিভিত্তিক ক্লাস কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ২৯ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে এ কার্যক্রম। যেখানে পঞ্চম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণির ক্লাস প্রচারিত হচ্ছে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে এসব ক্লাস। এই সময়ে যারা দেখতে পারবে না তাদের জন্যও রয়েছে ব্যবস্থা। প্রতিদিন আবার সেই ক্লাসগুলো পুনঃপ্রচার করা হয় দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। এখানে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো ক্লাস দেখে বুঝার উপায় নেই ক্লাসগুলো দূরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। টিভির সামনে বসে মনে করছে যেন শিক্ষকরা তাদের সামনে ক্লাস নিচ্ছেন। কেননা শিক্ষকরা ক্লাসের শেষের দিকে দেন বাড়ির কাজ। মূলত এখানে রেকর্ড করা বিষয়ভিত্তিক লেকচারগুলো টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হচ্ছে। এসব রেকর্ডগুলো শুধু টেলিভিশনের মধ্যে সীমাবন্ধ থাকছে না। পাশাপাশি ইউটিউব ও অনলাইনে আপলোড করা হচ্ছে লেকচারগুলো। বাড়ির কাজ তৈরি করে পর দিনের ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা তাদের সমস্যার সমাধানও করতে পারছে।

এখানে সবচেয়ে স্বস্তির খবর হলো এসব ক্লাস নেওয়ার মধ্যদিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্পর্কটা বজায় থাকছে, যা স্কুল খোলার সময় বজায় ছিল। ক্লাসের মতো বাস্তব অভিজ্ঞতা না হলেও বিকল্প একটা শিক্ষা ঠিকই পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে অবশ্য এখানে অভিভাবকদেরও বাড়তি দায়িত্ব রয়েছে। এসব ক্লাস যখন শুরু হবে তখন যেন অভিভাবকরা মনে করিয়ে দেন তাদের সন্তানদের। শিক্ষার্থীরা যেন মনোযোগ দিয়ে এসব ক্লাসগুলো দেখেন সে বিষয়ে তাদের সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি ক্লাসে যেসব বাড়ির কাজ দেওয়া হবে তা যেন সঠিক ও সময়মতো করে তাও খেয়াল রাখতে হবে অভিভাবকদের। এখানে কোনো শিক্ষার্থী ইচ্ছা করলে তার মোবাইলে শিক্ষকের ক্লাসটি রেকর্ড করে আবার পুনরায় দেখতে পারেন, যা যতবার খুশি ততবার ইচ্ছা করলেই দেখা সম্ভব। তবে এখানে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো শিক্ষকদের উপস্থাপন। এখানে অবশ্যই ভালো শিক্ষকদের যুক্ত করতে হবে ক্লাস নেওয়ার ক্ষেত্রে। সবার আগে শিক্ষক যাতে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে লেকচার দেন সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষক ভালোভাবে বোঝাতে পারেন। পাশাপাশি যাদের উচ্চারণ শুদ্ধ ও স্পষ্ট তাদের এসব ক্লাস নিতে হবে। কারণ উচ্চারণ যদি স্পট না হয় তবে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে এসব করা হচ্ছে তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি আলাদাভাবে ভেবে দেখতে হবে।

টেলিভিশনে বিকল্প পাঠদানের বিষয়টি এখন অনেকে জানেন না। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে টিভিতে পাঠদান কার্যক্রমের বিষয়ে আরো বেশি করে প্রচারণা চালানো। দেশের সব টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে এ কাযক্রমটি সবাইকে জানাতে হবে। তবেই টেলিভিশনে প্রচারিত ক্লাস ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক সবার কাছাকাছি পৌঁছে যাবে এবং এর সুফল পাবে সারা দেশের ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকরা। তবে বিপরীতে কিছু সমস্যাও রয়েছে। আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। তারা সেখানে বসবাসরত শিক্ষার্থীরা এমন কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই যেসব অঞ্চলে বিদ্যুৎ নেই সেই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কথা আলাদাভাবে ভাবতে হবে। এছাড়া রয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। এই বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। এই সময়ে যতটা সম্ভব লোডশেডিং কম হয় সে বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে কর্তৃপক্ষকে।

এত গেল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের বিষয়টি। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিষয়গুলোও আলাদাভাবে ভাবতে হবে। অবশ্য ভালো খবর হলো- দেশের বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে তাদের পাঠদান কার্যক্রম শুরু করেছে। শুধু তাই নয় অনলাইনে কুইজ, ক্লাস টেস্ট ও অ্যাসাইনমেন্টও জমা নেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি এমন কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয় তবে উপকৃত হবে শিক্ষার্থীরা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"