মতামত

প্রাণঘাতী করোনায় কাঁদছে বিশ্ব

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

ডা. এস এ মালেক

মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের দোর্দ- প্রতাপে অসহায় বিশ্ব যেন কাঁদছে। কোনো কিছুতেই বাগ মানানো যাচ্ছে না। স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে শুরু করে তাবৎ সামাজিক, অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ বন্ধ রেখে কারফিউ-লকডাউন পালন করেও কাজ হচ্ছে না। এক দেশ, দুই দেশ, ১০ দেশ থেকে শুরু করে এই প্রাণঘাতি ভাইরাস এখন গোটা বিশ্বকে গ্রাস করছে। বিজ্ঞানীরা আত্মরক্ষার নিশ্চিত কোনো ওষুধ আবিষ্কার করতে না পারায় মানুষ চরম অসহায় অবস্থার মুখোমুখি। বিভীষিকা সামনে রেখে তাদের শুধুই ঘরবন্দি জীবন কাটাতে হচ্ছে। অনবরত মৃত্যু আর ঘায়েল হতে থাকায় প্রতিটি দিন ও রাত হয়ে ওঠেছে শোক আর আতঙ্কের।

অতি সূক্ষ্মতম একটা কীট প্রচ-তম বিধ্বংসী ক্ষমতার অধিকারী কোভিড-১৯ ভাইরাসটি গোটা বিশ্বকে কাঁপিয়ে তুলেছে। এ যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও সম্মিলিতভাবে এত বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়নি। এমন এক যুদ্ধ যেখানে প্রতিপক্ষকে চেনা সম্ভব নয়। কোন সময়, কীভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে এই ভাইরাস আক্রমণ করে চলেছে। শত্রুকে যদি চেনা না যায়, তবে তাকে প্রতিঘাত করা যাবে কীভাবে। তাই সম্ভব হচ্ছে না এই ভয়াবহ ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে। চীনে হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান থেকে উৎপত্তি এই ভাইরাস সেই দেশে দুই মাস তা-বলীলা চালাল। মৃত্যুবরণ করেন ৩ হাজার ৩২৮ জন ও আক্রান্ত ৮১ হাজার ৩২০ জন, সুস্থ ৭৬ হাজার ৫৭১ জন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নত দেশ চীন হিমশিম এই ভয়াবহ শত্রু দমনে। তারপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসল। ভয়াবহ এই যুদ্ধের সফলতার মুখ দেখতে শুরু করল। সেখানে প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকা- সচল ছিল। গোটা দেশের মানুষ ঘরে আবদ্ধ ছিল। এই হলো মহাচীনের অবস্থা। দেশের মানুষের জন্য সুসংবাদ এই যে, চীনের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ও জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়েছে। বিশ্বের ক্ষমতাধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাকে ট্রেডওয়ার্কে পরাজিত করতে পারেনি, সেই চীন ও সাময়িকভাবে পরাজিত হয়েছে এই ভাইরাসে। এরপর ছড়িয়ে পড়ল গোটা বিশ্বে। আক্রান্ত হলোÑ এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এর কালো থাবা থেকে রক্ষা পায়নি। ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, জার্মানি, ইরান প্রভৃতি দেশের অবস্থা খুবই খারাপ। এসব দেশের আক্রান্ত ও মৃত মানুষের পরিসংখ্যান খুবই ভয়াবহ। পৃথিবীর উন্নত ও জ্ঞান-বিজ্ঞানসমৃদ্ধ দেশগুলো এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি কোনোদিন হয়নি। মানবসভ্যতার অস্তিত্ব সেখানে বিলীন হতে চলেছে। শুধু লাশের মিছিল। এই যেন মৃত্যুপুরী। থামছেই না মৃত্যুর মিছিল। এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে, পৃথিবীর প্রভাবশালী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ল-ভ- করে দিয়েছে নিউইয়র্ক শহরকে। এত উন্নত দেশ, তারপরও সে দেশের চিকিৎসাসেবা ভেঙে পড়েছে। হাসপাতালে ঠাঁই নেই, শুধু করোনার রোগীতে ভর্তি। ডাক্তার, নার্সও আক্রান্ত হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটিতে চিকিৎসা করেন এমন এক বাঙালি বললেন, ৭০ শতাংশ লোক করোনায় আক্রান্ত। এত বহুসংখ্যক রোগীর পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই বিনা চিকিৎসায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন অনেক রোগী। এত বড় দেশের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশঙ্কা করছেন আগামী কয়েক সপ্তাহে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। উপায়ান্ত না দেখে শত্রুতা ভুলে গিয়ে কথা বলেছেন, চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে। বোধহয় চীনের করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা জানতে চেয়েছেন। আজ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আক্রান্ত, অসুস্থ হয়েছেন মন্ত্রী, সচিব। কী হবে, কে জানে। পৃথিবীর কয়েকজন বিখ্যাত মানুষের মৃত্যু হয়েছে এই ভাইরাসে।

এ এমন এক যুদ্ধ যে পৃথিবীর একটা দেশ বা জনগোষ্ঠীর যুদ্ধ করে বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়। শত বিভক্ত এই বিশ্বকে বোধহয় এক প্লাটফর্মে আনার জন্য ঈশ্বরীয় শক্তির এক মহাবার্তা। মানুষ এখন বুঝতে শিখেছে এ বিশ্বে এমন সংকটও আসতে পারে। যা মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হলে সামগ্রিক ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই এবং পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে বিজয় করেই তা অর্জন করতে হবে। বর্তমান জাতিসংঘের মহাসচিবও বিশ্ববাসীর করণীয় সম্পর্কে যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তা বাস্তবসম্মত ও দিক-নির্দেশনামূলক। তিনি বলেছেন, ‘১০০ বছরে পৃথিবীর মানুষ এমন বিপদে পড়েনি। এ মহামারি অবসান ঘটাতে অবিলম্বে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। সংহতির মধ্য দিয়েই কেবল দৃঢ় ও অনেক বেশি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। রাজনৈতিক খেলা ভুলে সবাইকে একত্রিত হতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে মানবজাতি এখন চরম হুমকির মধ্যে আছে।’

বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতিসংঘকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ জাতি সংঘের সৃষ্টিই হয়েছে মহাসংকটকালে প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা হিসেবে কাজ করতে। করোনাভাইরাস একটা ওছিলামাত্র। শিক্ষাগ্রহণের একটা উপকরণ। বিশ্বের সব দেশ আজ বুঝতে পেরেছে যে, এমনও অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে ঐক্যবদ্ধ ছাড়া তা মোকাবিলা করা যাবে না। যে ট্রাম্প বলেছিলেন, করোনা চাইনিজ ভাইরাস, সেই ট্রাম্পকেই চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে হলো। এ সংকট মোকাবিলার জন্য।

একটু দেরিতে হলেও করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)-এর প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে দেখা দিয়েছে। ইতালিফেরত একজন প্রবাসীর মাধ্যমে এই সংক্রমণ শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত এই রোগে ছয় মৃত্যু ও ৬১ জন আক্রান্ত ও সুস্থ হয়েছেন ২৬ জন। কয়েক হাজার মানুষ কোয়ারেন্টাইনে রয়েছে। বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মানুষ। এদের অধিকাংশই গ্রাম-বাংলার মানুষ। এরা করোনাভাইরাস সংক্রমণের নিয়মনীতি মানছে না। ফলে আমাদের দেশে এই রোগের ব্যাপক বিস্তার হতে পারে ভেবে গোটা দেশের মানুষ আতঙ্কিত।

তবে কিছুটা আশ্বস্ত এই যে বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিদেশে থাকা প্রবাসীরা যেভাবে দেশে এসেছে, তাতে সংক্রমণের মাত্রা ব্যাপক বিস্তার লাভ করার কথা ছিল। সেই তুলনায় বলা যায় আমরা ভালো আছি। বিবিসি গণমাধ্যম তো বাংলাদেশের করোনাভাইরাস সংক্রান্ত প্রতিবেদন নিয়ে অবাক হয়েছে। শুধু বাংলাদেশই নয়, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়া এখনো সংক্রমণ বিস্তার বাড়েনি। হয়তো দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু এর রক্ষাকবচ। তবে আত্মোতুষ্টির কারণ নেই।

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। সব মন্ত্রণালয়কে এ কাজে যুক্ত করা হয়েছে। ভাইরাসের আগ্রাসন ঠেকাতে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এটি যাতে জানা হয় সেজন্য সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মাঠে নামানো হয়েছে। করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে প্রাধান্য দিয়ে মুজিববর্ষের কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান বাতিল হয়েছে। পহেলা বৈশাখ কর্মসূচি নেই। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রশাসনকে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। মানুষ বাঁচানোকে এই যুদ্ধের লক্ষ্য হিসেবে নেওয়া হয়েছে। মানুষ বাঁচলে দেশ বাঁচবে, মানুষ বাঁচলে সবকিছু ঠিক থাকবে। এ পণ সামনে রেখে পুরো সরকার ব্যবস্থাকে সক্রিয় করা হয়েছে করোনা যুদ্ধে। বাংলাদেশে টাকার অঙ্কে করোনার থাবা সীমিত। কিন্তু সরকার একে আত্মতুষ্টিতে দেখছে না। দেশবাসীকে আরো সচেতন করতে উদ্বুদ্ধ করছে। যাতে মানুষ করোনা নামক দৈত্য-দানবের হাতে থেকে রক্ষা পায়। সরকারের বিশ্বাস দেশবাসী নিয়ম মেনে চললে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। এটি বাস্তবায়নের পাশাপাশি অর্থনীতির ভয়াবহ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠতে আগামীতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে সেই ছকও তৈরির চেষ্টা করছে সরকার। সরকারের এ পর্যন্ত গৃহীত পদক্ষেপ বুদ্ধিদীপ্ত ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। এক্ষেত্রে সমন্বয়ের কাজটি জরুরি। সেক্ষেত্রে সরকার যদি সক্ষমতা দেখাতে পারে, তার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল সফলতার বিষয়টি।

এই যখন দেশের সার্বিক কার্যক্রমের চিত্র, দুঃখজনক হলেও সত্য কিছু মানুষ মাঠে নেমেছেন সরকার করোনা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ এটা প্রমাণ করার জন্য। বলছেন সরকার দেরি করে পদক্ষেপ নিয়েছেন, সময় মতো সতর্ক ও ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। গৃহীত ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয় ইত্যাদি ইত্যাদি কত কথা। আমরা সবাই জানি, করোনাভাইরাস আজ বৈশ্বিক সমস্যা। সরকারের দোষ দিয়ে লাভ নেই।

আন্তর্জাতিকভাবেই এটাকে মোকাবিলা করতে হবে। সরকার ব্যর্থ হয়েছে, সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। এইসব দাবি অমূলক ও অগণতান্ত্রিক। প্রধানমন্ত্রী ভালো কাজ করলেও এই সব ব্যক্তিদের চোখে পড়ে না। সত্যি কথা পৃথিবীর আর কোনো দেশ আছে সেই দেশের জনগণের জন্য সরকার প্রধান এমন বিচলিত; কিন্তু শেখ হাসিনার এই সংকটময় মুহূর্তে প্রতিটি ক্ষণে তিনি দেশবাসীর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, সব দলকে এক হয়ে করোনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম করার। কথাটা শোনায় ভালো কিছু যারা দেশত্যাগী, খুনি তারেক জিয়াকে মহাত্মা গান্ধির সঙ্গে তুলনা করেন, তাদের আহ্বানে কি ঐক্য প্রতিষ্ঠা কোনো সম্ভাবনা আছে? আসলে ওদের উদ্দেশে সরকারকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে না দেওয়া। অতীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিরোধী দল কাজ করনি? সুযোগ পেলেই যারা শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে চায়, তাদের ঘাড়ে হাত দিয়ে কথা বললে কি জনগণ ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করবে? উদ্দেশ্য তো জনগণের রক্ষা করা। হৃতদরিদ্র প্রায় দেড় কোটি দিন এনে দিন খাওয়া মানুষকে এই দুর্যোগে বাঁচিয়ে রাখা। যার যার অবস্থান থেকে সাহায্যের হাত প্রসারিত করলেই চলে। সরকারের লেজে যুক্ত হওয়ার দরকার নেই।

পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের প্রধানমন্ত্রী দুঃখী মানুষের নেত্রী। তিনি দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছেন বলে আমরা ভরসা পাই। অতীতের মতো সব দুর্যোগ যেমন তিনি সফলভাবে মোকাবিলা করেছেন, আজকের বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে সবকিছু মোকাবিলা করে জাতিকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দিবেন। এই প্রত্যাশা সাধারণ জনগণ করতেই পারে।

লেখক : বিশিষ্ট রাজনীতিক ও কলামিস্ট

 

"