মুক্তমত

চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

অসুস্থ হয়ে বিনাচিকিৎসায় মারা গেছেন ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি বাসাবো মাঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে অস্ত্র সমর্পণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলমাছ উদ্দিন। একডজনেরও বেশি হাসপাতাল ঘুরে স্বজনরা তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেননি। একজন মুক্তিযোদ্ধা বিনাচিকিৎসায় চিরবিদায় নিলেন স্বাধীনতার মাসে। ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হলেও বিনাচিকিৎসায় তিনি মারা গেছেন বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বজনরা। গত রোববার সকালে রাজধানীর মুগদা হাসপাতালে তিনি মারা গেছেন। করোনা সন্দেহে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে বারডেম হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পপুলার হাসপাতাল ও কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল ভর্তি করেনি বলে জানান মরহুমের স্বজনরা।

মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলমাছ উদ্দিনের ঘটনাটি একমাত্র দৃষ্টান্ত নয়। রোগী দেখলেই না নেওয়ার এই প্রবণতা কোনো সুস্থ স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষণ নয়। আমরা বুঝতে পারছি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে। তাদের এই নিরাপত্তাহীনতা এতটাই প্রকট যে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নন, এমন রোগীরাও হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। করোনাভাইরাসের প্রকোপে বিশ্বজুড়েই এখন হাহাকার। শত চেষ্টা করেও তা আটকানো যাচ্ছে না। চীনের উহান থেকে শুরু হওয়া এই মৃত্যু মিছিল ইতালি, স্পেন ও ইরানকে বিধ্বস্ত করে এখন আমেরিকায় পৌঁছে গিয়েছে। পরিস্থিতি দেখে ভয়ে আঁতকে উঠছে সারা পৃথিবীর মানুষ। কিন্তু মৃত্যুর এই ভয়াবহ সফরের মধ্যেও জীবনের জয়গান গাইছেন পুরো দুনিয়ার চিকিৎসকরা। আক্রান্তদের চিকিৎসা করার ফাঁকে সাধারণ মানুষকে এই অসম যুদ্ধে লড়াই করার জন্য উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। প্রতিবেশী ভারতে এমনটা দেখছি, এমনকি পাকিস্তানেও চিকিৎসকদের স্যালুট করছে রাষ্ট্রীয় সব বাহিনী।

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে কেন এখনো সেই চিত্রটি উপস্থিত হলো না? এ মুহূর্তে চিকিৎসকরাই আমজনতার শিক্ষকের ভূমিকায়।? তারা বলে দিচ্ছেন কী করতে হয় এ সময়টায়। তারা বলছেন পরিচ্ছন্নতার কথা। এক ঘণ্টা পরপর স্যানিটাইজার বা সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। মুখে হাত না দেওয়া। ভিড় এড়ানো। তারাই বলছেন কোনো উপসর্গ দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে, প্রয়োজনে পরীক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ সতর্কতার বার্তাগুলো আসছে চিকিৎসকদের কাছে থেকেই। আবার হাসপাতালে গিয়ে মানুষ চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না। করোনা ছাড়াও মানুষ অন্য রোগে আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু ভয়ে হাসপাতাল বা ক্লিনিক রোগী না নিলে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা যে আরো বাড়ে, সেই ভাবনাটা আসা দরকার।

চিকিৎসকরা বলছেন, করোনাভাইরাসের যেসব লক্ষণ থাকে সেগুলো হলো সর্দি-কাশি, হাঁপানি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ইত্যাদি। তবে এসব থাকা মানেই কোনো একজন করোনা আক্রান্ত রোগী নন। পরীক্ষা করেই কেবল নিশ্চিত হতে হবে। এমনিতে এসবের রোগী বাংলাদেশে অনেক। সারা বছরই মানুষ এসব রোগে ভোগে এবং মানুষজন এসব রোগ নিয়ে চিকিৎসকদের কাছে যান। বিশেষ করে শিশুরা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে এগুলো বেশি দেখা যায়। এর বাইরে আমাদের দেশে অ্যাজমা রোগীও প্রচুর। এই বাস্তবতায় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা মানে করোনা ঝুঁঁকিকেই আরো বাড়িয়ে তোলা। এসব উপসর্গ করোনাভাইরাসের কারণে হয়েছে নাকি সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি বা শ্বাসকষ্ট, তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষা জরুরি। কিন্তু অধিকাংশ হাসপাতালে এ ধরনের রোগীদের গ্রহণই করছে না। ফলে স্বাস্থ্যসেবা প্রার্থীরা এক মহাসংকটে পড়েছেন। অনেকেই বলছেন অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, করোনা না হলেও অন্য রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা না পেয়ে মরে যেতে হবে এখন।

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পিপিইসহ সুরক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা এখন বাধ্যতামূলক। চিকিৎসাসেবা না পেয়ে মুক্তিযোদ্ধা আলমাছ উদ্দিনের হওয়া এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। টেলিভিশনে বহু মানুষ বলছেন তারা হাসপাতাল থেকে সেবা পাচ্ছেন না। একটি হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত একজনকে নিয়ে গেলে রাজধানীর কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল তাকে ফিরিয়ে দেয়। হাসপাতালগুলোর স্পষ্ট কথা, সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) কোভিড-১৯ টেস্ট রিপোর্ট ছাড়া রোগীকে ভর্তি করা হবে না। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আইইডিসিআরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছে। বিদেশফেরতদের সংস্পর্শে আসেনি এমন কারো টেস্ট করার প্রয়োজন মনে করছে না আইইডিসিআর। ফলে সবাইকে পরীক্ষা করাও সম্ভব হচ্ছে না।

সর্দি-জ্বর ও নিউমোনিয়ার রোগীকে এত দিন কোনো সংকোচ ছাড়াই চিকিৎসা দেওয়া হতো, ভয়-আতঙ্কে সেসব সাধারণ রোগীও চিকিৎসা পাচ্ছে না এখন। দেশে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই সাধারণ সর্দি-জ্বর নিয়ে চিকিৎসা নিতে গেলে এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে মানুষকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে নানা প্রশ্নের।

হাসপাতাল ফিরিয়ে দিলে রোগীরা যাবে কোথায় এবং একই সঙ্গে রোগী ফিরিয়ে দিয়ে এসব হাসপাতাল কীভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে হবে। এর সমাধানও খুঁজতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ হবে এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখা। প্রাইভেট হাসপাতালগুলো কেন তাদের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পিপিইসহ সুরক্ষা উপকরণ দিচ্ছে না, সেই জবাবদিহি প্রয়োজন। দেশের এমন এক পরিস্থিতিতে এসব হাসপাতাল কেন এতটা দায়িত্বহীন, সেটা জানা দরকার। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা উপকরণ দেবে সরকার, তেমনি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা সরঞ্জাম সেসব হাসপাতালকেই দিতে হবে। মানুষ চিকিৎসা চায় এবং তারা চায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেরা সুরক্ষিত হয়ে যেন চিকিৎসাসেবায় এগিয়ে আসতে পারেন।

লেখক : সাংবাদিক

 

"