মুক্তমত

স্টে হোম স্টে সেফ

প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

ইয়াসমীন রীমা

করোনার অভিঘাত ইতোমধ্যেই নানা মাত্রার ছন্দপতন ঘটিয়েছে দৈনন্দিন জীবনে। আমাদের এই পৃথিবী এখন একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। একটি আতঙ্কিত ভাইরাসের বায়ু বইছে আজ পৃথিবীব্যাপী। যে ভাইরাসের নাম করোনাভাইরাস বা কোডিভ-১৯। ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, উন্নত-অনুন্নত বলে কাউকে রেহাই দিচ্ছে না এই ভাইরাস। রীতিমতো থমকে দাঁড়িয়েছে এই বিশ^জগত। বিশে^র প্রায় ২০০টি দেশে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে কারণে ১৭০ কোটি বেশি মানুষ গৃহবন্দি অবস্থায় রয়েছে।

করোনার কারণে ঘরবন্দি হয়ে পড়ছে বিশে^র একে পর শহরের বাসিন্দারা। ভাইরাসের কারণে বিভিন্ন দেশের সরকার প্রায় ১৭০ কোটি মানুষকে ঘরবন্দি থাকার নির্দেশ দিয়েছে, যা বিশে^র মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। সংক্রমণ মারত্মক পর্যায়ে পৌঁছানোর সপ্তাহে প্রতি পাঁচজনের মানুষের মধ্যে একজনকেই নিজ বাড়িতে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অথবা আহ্বান জানানো হয়েছে। মারাত্মক ছোঁয়াচে এ ভাইরাসটি প্রথম দৃশ্যমান হওয়ার পর ৬৭ দিনের মাথায় আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়ায়।

সারা দুনিয়ায় মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে এরই মধ্যে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪ লাখের কোটা অতিক্রম করেছে। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৩০ হাজারের বেশি যা কিনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন এই নতুন মহামারিতে নারীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। স্বাস্থ্যগত, অর্থনৈতিক, পারিবারিক সবদিক থেকেই ক্ষতির শিকার হতে পারে নারীরা। বিশ^ব্যাপী একান্তই পারিবারিক ক্ষেত্রে নারীরাই প্রিয়জনদের খাতির-যতœ-সেবা-পরিচর্যা করার দায়িত্বে নিয়োজিত অধিক। ফ্যামিলি কেয়ারগিভার অ্যালায়েন্সের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীতে ৭৫ ভাগ বেশি নারী পরিবারের ক্ষেত্রে এই ভূমিকা পালন করে আসছে। পুরুষরা নারীদের সহযোগিতা করলেও পরিবারের সদস্যদের পরিচর্যা বা সেবা প্রদান করার ক্ষেত্রে নারীদেরই সময়ক্ষেপণ করতে হয় বেশি। হিসাব করে দেখা গেছে পুরুষের তুলনায় নারীরা ৫১ দশমিক ৫০ ভাগ বেশি সময় প্রদান করে থাকে।

করোনাভাইরাসের কারণে বিশ^ব্যাপী বেশ কিছু দেশ সম্পূর্ণ লকডাউন করা হয়েছে। এসব দেশে সবাই গৃহবন্দি অবস্থায় থাকায় গৃহস্থালী কর্মের চাপ এসে পড়েছে গৃহের নারীদের ওপর। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে গ্যালাপের একটি জরিপে দেখা গেছে, সন্তানদের দেখাশোনা খেয়ালখোঁজের ক্ষেত্রে প্রতিদিন পুরুষদের তুলনায় নারীদের প্রায় ৭ গুণেরও বেশি সময় প্রদান করতে হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নারীদের ওপর সেই চাপ আরো বৃদ্ধি পাবে, কিন্তু হ্রাস পাবে না।

এলিভেট নেটওয়ার্ক নামের একটি প্রতিষ্ঠান যারা কেবল নারীদের নিয়ে কাজ করে, এর প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টি ওয়ালেস বলেন, ‘একটি পরিবারে নারীদের সাধারণত প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মুখ্য বিনোদন কর্মকর্তা ও প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তাÑ এই তিন ধরনের কাজই করতে হয়ে। সংকটকালে যখন আমরা কী করব বুঝে উঠতে পারি না, আতঙ্কগ্রস্ত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি তখন এতগুলো ভূমিকা পালন করা নারীদের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে।’

অপরপক্ষে একটি মহামারি নারীদের জন্য পৃথিবীকে আরো বৈষম্যমূলক করে তোলে। যদিও এখন রাজনীতিবিদরা মতে দিচ্ছেন, যেন শুধুই তাৎক্ষণিক সংকটের দিকে মনোযোগ রাখা হয়। কিন্তু মহামারির ইতিহাস বলে, পরবর্তী পরিস্থিতি আরো ভয়ানক হয়ে ওঠে নারীর জন্য। যেমন, ইবোলা ভাইরাস পশ্চিম আফ্রিকায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্লেষকরা বলেছেন, ইবোলা সংক্রমণ একটু থিতিয়ে আসার পরে পুরুষদের পারিশ্রমিক ঠিকই দ্রুততম সময়ে আগের জায়গায় ফিরে গেলেও নারীদের পারিশ্রমিক মহামারি হওয়ার আগের পর্যায়ে ফিরতে ঢের সময় লেগেছিল এবং এই অবস্থা চলেছিল প্রায় বছরখানেক ধরে। এর বাইরে বেড়ে গিয়েছিল নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা ও যৌন নিপীড়ন। সাধারণত লকডাউন পরিস্থিতিতে এসব ঘটনা বেশি ঘটতে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা এর জন্য দায়ী করেছেন উদ্বেগ, মদ্যপান ও আর্থিক সংকটের মতো বিষয়গুলোকে।

এদিকে বেশির ভাগ গৃহকত্রী খ-কালীন গৃহকর্মীকে আসতে নিষেধ করে দিয়েছেন। গৃহকর্মী আসছেন না, ফলে ঘরের কাজ করতে হচ্ছে বাড়ির ওই গৃহকত্রীকেই। অর্থনীতিবিদ হেলেন লুইস সম্প্রতিকালে করোনা দুর্যোগ নিয়ে আটলান্টিক গ্লোবাল পত্রিকায় বলছেন, এটা শুধু একটা জনস্বাস্থ্য ক্রাইসিস-ই নয়, অর্থনৈতিক সংকটও বটে, আর এই ক্রাইসিসে শেষ অবধি সবচেয়ে বেশি ভুগবেন নারীরাই। অধিকাংশ ফেসবুক পোস্টে সন্তানদেরর সঙ্গে সময় কাটানোর অভাবনীয় মুহূর্তগুলোর তুলে ধরেছেন। সেই ছবিতে তার মায়ের উপস্থিতি নেই। স্টে হোম, স্টে সেফÑ সেøাগানও বুঝি নারী-পুুরুষের জন্য আলাদা দ্যোতনা বহন করে।

সম্প্রতি হিউম্যান জিনোমিক্স জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে উল্লেখ, নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণে এখন পর্যন্ত মৃত্যুহার বেশি পুরুষদের মধ্যে। নারীদের মধ্যে মৃত্যুহার অনেক কম। ইতালিতে মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭০ শতাংশ পুরুষ। চীনে কয়েক হাজার মানুষের মধ্যে চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, মোট মৃত মানুষদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ পুরুষ। দক্ষিণ কোরিয়ায় এটি ৫৪ শতাংশ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পুরুষদের বেশি মারা যাওয়ার পেছনের একটি হচ্ছে জীববিজ্ঞানগত। নারীদের দুটি ‘এক্স’ ক্রোমোজম থাকে। এই ‘এক্স’ ক্রমোজোমে রোগপ্রতিরোধী বেশ কিছু জিন থাকে। যেহেতু পুরুষদের একটি ‘এক্স’ ক্রমোজোম থাকে, তাই তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নারীদের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই কম থাকে। ফলে রোগের সঙ্গে লড়াই ও সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার প্রবণতা নারীর বেশি থাকে। সময় এখন সেবা, পরিচর্যা এবং সহানুভূতির মাধ্যমে যুদ্ধজয়ের। বিশ^জুড়ে মানব মাত্রেরই অভিন্ন আবেদন-‘সচেতন সতর্ক থাকি, ভয় না পাই, স্বার্থপর না হই।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

 

"