মুক্তমত

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২০, ০০:০০

আবুল কাসেম ফজলুল হক

স্বাধীনতা দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি যারা সাধনা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধ কোনো আকস্মিক ব্যাপার ছিল না। এর পেছনে প্রত্যক্ষভাবে ছিল ৬ দফা আন্দোলন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্ব। তাছাড়া অনেক আগে থেকেই শেরেবাংলা ফজলুল হক ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আন্দোলন পরিচালিত হয়ে আসছিল। ‘বঙ্গভঙ্গ’-বিরোধী আন্দোলন থেকে আমাদের ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এক ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ। মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র ভূমিকা অবশ্যই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়, তবে ভুললে চলবে না যে, মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি রাজনৈতিক ঘটনা।

প্রথম বাংলাদেশ সরকার ও তাজউদ্দীন আহমদের ভূমিকার বিবেচনা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুল হয়ে যায়। তাছাড়া এই গোটা প্রক্রিয়ার মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আবুল ফজল, সিকান্দার আবু জাফর, জহুর হোসেন চৌধুরী এবং আরো অনেক লেখক, চিন্তাবিদ ও সাংবাদিকের ভূমিকা ছিল অসাধারণ গৌরবজনক। ছয় দফা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এই সমগ্রতার মধ্যে দেখতে হবে। সেই সঙ্গে এই মর্মান্তিক ঘটনাও আমাদের বুঝতে হবে যে, স্বাধীন বাংলাদেশে অল্প সময়ের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামারুজ্জামান ও এম মনসুর আলী প্রাণ হারিয়েছিলেন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনে স্বাধীন বাংলাদেশের বিশৃঙ্খল অবস্থার কারণও আমাদের খুঁজতে হবে স্বাধীনতা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে।

সত্য কথা বলতে গেলে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ও সেই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে সার্বিক প্রস্তুতি দরকার ছিল তার অনেক কিছুই তখন করা হয়নি। গণতন্ত্রের জন্য যে শিক্ষা, প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক দল দরকার সেই পর্বে তা গড়ে তোলা হয়নি। যে অপূর্ণতা প্রথম ছিল তাই পরবর্তীকালে নানা দুর্ঘটনার কারণ হয়েছে। স্বাধীনতা দিবসে আবেগ ও উত্তেজনার মধ্যে সেগুলোর বিবেচনা যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। আসলে বাংলাদেশকে আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠা করা ও উন্নতির জন্য বছরের প্রতিটা দিনকেই স্বাধীনতা দিবসরূপে উপলব্ধি করা ও কাজ করা উচিত। স্বাধীন বাংলাদেশে গত প্রায় ৫০ বছর ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এমন অনেক কাজ করছে, যেগুলো আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার পরিচায়ক নয়। যদি আমাদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার চেতনা নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলেই বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে টিকবে।

বাংলাভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে হবে। যে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার সংগ্রামে ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে অসাধারণ গৌরবময় ভূমিকা পালন করেছে সেই আওয়ামী লীগকে গণতান্ত্রিক দলরূপে গড়ে তোলা দরকার। এটা সমগ্র জনগণের দাবি। বিএনপি, জাতীয় পার্টি প্রভৃতি দলকেও গণতান্ত্রিক চরিত্র অর্জন করতে হবে। কেবল ধনিক শ্রেণির গণতন্ত্র নয়, সময়ের দাবি সর্বজনীন গণতন্ত্র বা শতভাগ মানুষের গণতন্ত্র। বামপন্থি দলগুলোকে তাদের আদর্শ ও কর্মসূচি নিয়ে জনসাধারণের সামনে আসতে হবে। জনসাধারণের মধ্যে আগ্রহ আছে সমাজতন্ত্র অভিমুখী গণতন্ত্রের।

স্বাধীনতা দিবসে অবশ্যই আমাদের স্মরণ করা দরকার যে, রামমোহন, বিদ্যাসাগর থেকে বেগম রোকেয়ার সময় থেকে বাংলাভাষায় চিন্তা চর্চার, সমাজ সংস্কারের ও পরবর্তীকালের রাজনৈতিক আন্দোলনের গৌরবজনক সময় গেছে। হিন্দু-মুসলিম বিরোধ অপঘাতরূপে দেখা দিয়েছিল; কিন্তু উভয় সম্প্রদায়ের মহৎপ্রাণ মণীষীরা জনসাধারণকে পরিচালনা করেছিলেন সভ্যতা ও প্রগতির পথে। আজ দুনিয়াজুড়ে সভ্যতা ও প্রগতির পথ বুদ্ধিজীবীরা সন্ধান করবেন এটা আশা করি। অবস্থা এমন হয়েছে যে, বাংলাদেশের কোনো প্রগতিশীল শক্তিরই সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। ধর্ম নিয়ে যে বিরোধ গত প্রায় ৪০ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যে প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার প্রকাশ নেই। আজ প্রগতির দাবি সর্বজনীন গণতন্ত্রের আদর্শকে উদ্ভাবন করা। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী নীতির অন্ধ অনুসরণের দ্বারা আমরা বিপথগামী। পশ্চিমের প্রগতিশীল দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সাহিত্যকে অবশ্যই আমাদের গ্রহণ করতে হবে; কিন্তু পশ্চিমা উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের নীতিগুলোকে অবশ্যই আমাদের পরিহার করে চলতে হবে। আমাদের আত্মশক্তি বাড়াতে হবে। চলতে হবে আত্মনির্ভর হয়ে। এটাই স্বাধীনতার দাবি।

বুদ্ধিগত, চিন্তাগত উন্নতি ছাড়া রাজনৈতিক উন্নতি সম্ভব হবে না। রাজনীতিতে চাই আদর্শগত অনুসন্ধান ও চিন্তাগত উৎকর্ষ। শক্তি প্রয়োগ নয়, বুদ্ধি ও নৈতিক শক্তি প্রয়োগের দ্বারা উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিটা অঙ্গকে সংস্কারের মাধ্যমে সুস্থ, স্বাভাবিক ও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বব্যাংক দ্বারা পরিচালিত হলে আমরা পরনির্ভর থাকব। নিজেদের বুদ্ধিতে এবং নিজেদের শক্তিতে, নিজেদের নেতৃত্ব নিয়ে চললে আমরা উন্নতি করব।

আবার আমরা আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ও মুক্তি সংগ্রামের মহান নেতৃত্ব ও শহিদদের কথা স্মরণ করছি।

লেখক : গবেষক ও চিন্তাবিদ

 

 

"