বিশ্লেষণ

মুক্তিযুদ্ধ ও আনন্দ-বেদনার স্মৃতি

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২০, ০০:০০

আর কে চৌধুরী

আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ৯টি মাস। এই ৯ মাসকে কেন্দ্র করেই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম আনন্দ-বেদনার স্মৃতি। আমি প্রত্যক্ষ করেছি একটি স্বাধীন দেশের অভ্যুদয়, দেখেছি সহযোদ্ধার লাশ আর আপন সন্তানের নিথর দেহ। যৌবনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থাকার কারণে মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী ঢাকা শহরের গণ-আন্দোলনের অনেক কর্মকান্ডেই ছিল আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ। যে কারণে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেওয়াই ছিল।

২৫ মার্চ ক্র্যাক ডাউনের পর ২৭ মার্চ হেঁটে, রিকশা ও নৌকায় অনেক কষ্টে নরসিংদী পৌঁছালাম। চলতে লাগল মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। যোগাযোগ হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থানরত মেজর নূরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি ক্যাপ্টেন মতিউরকে পাঠালেন যুদ্ধ প্রস্তুতির সার্বিক পরিস্থিতি জানার জন্য। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফিরে গিয়ে ক্যাপ্টেন মতিউর আবার নরসিংদী এলেন ৩০ মার্চ, সঙ্গে বহু ইপিআর সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্রসহ। নরসিংদীর জনগণ উজ্জীবিত হয়ে ঢাকা আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। ২ এপ্রিল ক্যাপ্টেন মতিউরের পরিকল্পনা অনুযায়ী কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম। বিকালে নরসিংদীর পাঁচদোনা পৌঁছালে পাক বাহিনী নৌ, রেল ও স্থলÑ তিন দিক থেকে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে শুরু হয় মুখোমুখি সংঘর্ষ। শত্রু বাহিনী ছিল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। তাদের অতর্কিত আক্রমণে আমরা হতবিহ্বল হয়ে পড়লেও অসীম সাহসিকতায় যুদ্ধ চালাতে থাকলাম। পাক বাহিনীর ৮-১০ জন সৈন্য হতাহত হলো। উড়িয়ে দেওয়া হলো তাদের দুটি গাড়ি। আমাদের কয়েকজন হতাহত হলো। সেই স্মৃতি এখনো আমাকে নাড়া দেয়। মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখলেও কোনো এক আমোঘ আকর্ষণে হৃদয়ে প্রলয় নাচন শুরু হলো। উপলব্ধি করতে লাগলাম সুসংগঠিত মুক্তিযুদ্ধের।

নরসিংদীর স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রস্তুতি নিলাম ভারত যাওয়ার। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধকামীদের প্রথম এবং সহজতম আশ্রয়স্থল ছিল ত্রিপুরার আগরতলা। আগরতলা পৌঁছালাম। পেলাম পরিচিত মুখ মেজর নূরুজ্জামানসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী ও ঢাকার অনেক সংগঠকদের। আগরতলা মুখরিত হলো মুক্তিকামী বাঙালিদের পদভারে। বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাÑ যে মামলাকে কেন্দ্র করেই ফাঁসিতে ঝোলানোর চেষ্টা করা হয়েছিল জাতির পিতাকে। বিস্ময়করভাবে সেই আগরতলাই হয়ে উঠল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ডেডলাইন।

ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা। ত্রিপুরার ভৌগোলিক অবস্থান অদ্ভুতভাবে গাথা বাংলাদেশের সঙ্গে। ভারতের অন্যান্য অংশ যেখানে একদিক থেকে বেঁধে রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ তিন দিক থেকে আলিঙ্গন করে আছে ত্রিপুরাকে। ত্রিপুরার ৯১৭ কিলোমিটার সীমান্তের ৮৩৯ কিলোমিটারই বাংলাদেশের সঙ্গে। রাজধানী আগরতলা, যেখানে আর্যদের পা পড়েনি, আসেনি কোনো বিদেশি। সারা বাংলায় যখন বাংলা ভাষার সরকারি মর্যাদা ছিল না, ইংরেজি ও ফার্সি যখন সব কিছুর ওপর দাঁড়িয়ে ত্রিপুরার রাজভাষা তখনো বাংলা। পাহাড়ি ত্রিপুরার যে হৃদ্যতা, সেই হৃদ্যতা ক্রমেই বাড়া বৈ কমেনি। মহারাজাদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা যেমন ইতিহাস; তেমনি ১৯৭১-এর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে-পরবর্তী প্রজন্মের ত্রিপুরাবাসীর তেমন ইতিহাস। ১৯৭১ সালে সমগ্র ত্রিপুরার জনসংখ্যা ছিল ১৫ দশমিক ৫৩ লাখ অথচ ত্রিপুরা ধারণ করেছিল ১৩ দশমিক ৪২ লাখ বাংলাদেশ ত্যাগী শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধা।

৭১-এর এপ্রিল মাসে আমি আগরতলা যাই। মূলত সেখানেই মিজানুর রহমান চৌধুরী, শেখ জামাল, আবদুস সামাদ আজাদ, গাজী গোলাম মোস্তফা, কর্নেল ওসমানী, মেজর জিয়া, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর হায়দার, মেজর নূরুজ্জামান প্রমুখ নেতাদের সঙ্গে যুদ্ধ বিষয়ে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হয়। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ২ ও ৩নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টার। সে দায়িত্ব থেকেই ২৫ এপ্রিল আমি খালেদ মোশাররফ ও কুমিল্লার হোমনার এমপি মোজাফফর আলী প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করি। তার নির্দেশনা গ্রহণ করে কলকাতা থেকে আগরতলায় ফিরে আসি। সংগঠক হিসেবে সেসময়ে মেলাঘর ট্রেনিং ক্যাম্পসহ ত্রিপুরার অনেক ক্যাম্পেই প্রতিনিয়তই যেতে হতো আমাকে। সূর্যমনিনগর হাসপাতাল যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য। পরিদর্শনে গিয়ে দেখা হলো, আমার স্কুলজীবনের বন্ধু ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরীর। এ সময়ে অর্থাৎ ২৮ মে তৎকালীন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে কথা বলারও সুযোগ হয় আমার।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দেশের অভ্যন্তরে গিয়ে এমপি, মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশ দিলে আমি ১ জুন হোমনার এমপি মোজাফফর আলী ও ছাত্রলীগ নেতা আলীসহ হবিগঞ্জের মাধবপুর বর্ডার দিয়ে দেশে প্রবেশ করি। রাত ২টা ৩০ মিনিটে বর্ডার ক্রস করতে সাহায্য করলেন ক্যাপ্টেন আইন উদ্দিন। সকালে চারগাছ বাজারে চা-নাশতা করার সময় লক্ষ করলাম স্থানীয় লোকজন আমাদের সন্দেহের চোখে দেখছে। সেসময়ে দেশে শত্রু-মিত্র চেনা খুবই দুরূহ ছিল।

সে কারণে দেরি না করে হোমনার উদ্দেশে রওনা হলাম। সারা দিন চলার পর রাতে ঝড়-বাদলে মাঝি পথ হারিয়ে ফেলাতে অনেক কষ্টে ৩ জুন সকালে মোজাফফর আলী এমপির এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠলাম। পরদিন সকালে বাঞ্ছারামপুরের এমপি মহিউদ্দিনের খোঁজে তার এলাকায় গিয়ে তাকে পেলাম ডোমরাকান্দিতে। এরপর রায়পুরার এমপি আফতাব উদ্দিনের সঙ্গে দেখা হলো নিলক্ষীয়ায়। শিবপুর-মনোহরদীর এমপি ফজলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় হাইরমারা গ্রামে। তাদের সবাইকে প্রধানমন্ত্রীর মেসেজ জানাই এবং তারা সবাই আগরতলায় তথা ভারতে যাওয়ার ব্যাপারে একমত হন। এভাবে ২১ জুন পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে এমপি, মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও মুক্তিকামী বাঙালিদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে আলোচনা ও সাক্ষাৎকার কার্যক্রম চালাই। ২২ জুন নিজ গ্রাম নরসিংদীর আলোকবালীতে যাই। অপেক্ষা করছিল দুঃসংবাদ। জানতে পারলাম আমার সন্তান বিপ্লবের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর সংবাদ। চলতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার কাজ। আমাদের বাড়িতে ২৯ জুন রাতে পরিবার-পরিজনসহ এলেন নরসিংদীর এমপি মোসলেহউদ্দিন। তাকে পেয়ে আমার কাজে অনেকটাই সুবিধা হলো। এ সময়ে আলোকবালী নিরাপদ নয় ভেবে পরিবার-পরিজন স্থানান্তর করলাম বাঞ্ছারামপুরে। সেখানেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলো আমার ছোট মেয়ে সুইটি। পরে সেও হোমনায় মারা গেল এক প্রকার বিনা চিকিৎসাতেই। পরিবার-পরিজন রেখে ৩০ জুলাই আবারও ঢাকার পথে রওনা হলাম। হেঁটে, নৌকায়, রেলপথে ও রিকশায় অনেক কষ্টে ঢাকায় পৌঁছলাম ৩ আগস্ট রাতে। ১৬ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মান্ডা, মুরাদপুর ও আশপাশের এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে ১৭ আগস্ট নরসিংদী রওনা হয়ে ১৯ আগস্ট পৌঁছালাম। নরসিংদী তখন ভীষণ উত্তপ্ত। পাক বাহিনী ও রাজাকারদের দৌরাত্ম্য তখন চরমে। এরই মধ্যেই বাড়াইল হয়ে আমার গ্রাম আলোকবালীতে পৌঁছলাম। এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশনা দিয়ে ১১ সেপ্টেম্বর ভোরে আবারও রওনা হলাম আগরতলার উদ্দেশে পাক বাহিনী ও রাজাকারদের চোখ এড়িয়ে দু-এক জায়গায় ছদ্মবেশে অনেক বিপদ এড়িয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সীমানায় প্রবেশ করলাম। ২৫ সেপ্টেম্বর মেজর নূরুজ্জামান ও ২৬ সেপ্টেম্বর গাজী গোলাম মোস্তফাকে দেশের অভ্যন্তরের যুদ্ধ পরিস্থিতি বর্ণনা করলাম, এরপর ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত আগরতলা, কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্প ও শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন এবং অন্যান্য সাংগঠনিক কাজে ভারতেই ছিলাম। দেশে আর আসা সম্ভব হয়নি। দেশে এলাম ১৪ ডিসেম্বর মেজর হায়দারসহ হেলিকপ্টারে কুমিল্লায়। পরে নরসিংদী হয়ে ঢাকায় এলাম ১৫ ডিসেম্বর বিকালে। যাত্রাবাড়ীতে সেদিনই বিজয় উল্লাস। সে স্মৃতি সারা জীবন মনে রাখার মতোÑ জনতা মেজর হায়দার ও আমাকে মাথায় নিয়ে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় নাচতে থাকে। ১৫ ডিসেম্বর কাটল আনন্দ আর উৎকণ্ঠায়। অবশেষে এলো জীবনের শ্রেষ্ঠতম দিন ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকা ক্লাব থেকে আনা হলো চেয়ার-টেবিল; যে টেবিলে স্বাক্ষরিত হলো বাঙালির বিজয়ের দলিল। ১৬ ডিসেম্বরের সেই দৃশ্য সুখ-স্বপ্ন হয়ে আছে এখনো।

১৬ ডিসেম্বর বারবার আসে। আসেন না শুধু হারিয়ে যাওয়া শহিদ মুক্তিযোদ্ধারা- যাদের রক্তে, যাদের আত্মত্যাগে দেশ আজ স্বাধীন। তাদের স্মৃতির স্মরণে এটুকুই বলে শেষ করি। কবির ভাষায়-

এনেছিলে সঙ্গে করে মৃত্যুহীন প্রাণ

মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান রাজউক উপদেষ্টা, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নম্বর সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা

 

 

"