বিনীত প্রার্থনা

এক অসহায়ের খোলা চিঠি

প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২০, ০০:০০

এ কে এম সামিউল হাসান ভূঞা

অনেক দিন থেকেই ভাবছি একটা কিছু করা উচিত। কিন্তু কী করব? কার কাছে যাব? কীভাবে অগ্রসর হলে প্রকৃত অর্থে আমাদের কাজ হবে, তা ভাবতে ভাবতে অনেক দিন চলে গেল। কেউ পরামর্শ দিচ্ছেন বিষয়টি নিয়ে মিছিল মিটিং করার। কেউবা বলছেন অনশন করার। আবার কেউ বলছেন সংবাদ সম্মেলন করার। কেউবা বলছেন সচিব, মন্ত্রীকে বলে কাজ না হলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সব কিছু তাকে অবহিত করার।

এসব পরামর্শের যেকোনোটি করতে গেলেই প্রয়োজন সবাইকে সংগঠিত করা। দেখলাম এটা আমার জন্য এত সহজ কাজ নয়। চাকরি শেষে অনেকেই দূর-দূরান্তের বিভিন্ন ঠিকানায় চলে গেছেন। সবার ঠিকানা সংগ্রহ করে একত্রিত করা চাট্টিখানি কথা নয়। চাকরি শেষে দীর্ঘদিন যাবত কোনো টাকা-পয়সা না পাওয়ার কারণে অনেকের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। ঢাকায় আসা-যাওয়া করার ভাড়াটা পর্যন্ত অনেকের কাছে নেই। নানা চিন্তায় আমার এই পরাস্ত মন আজ যেন আশার ক্ষীণ আলো দেখতে পাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে চারদিকে কত কিছুই না হচ্ছে। আজ চাকরিতে থাকলে আমাকেও রেলি করতে হতো। বিভিন্ন আলোচনা সভায় যোগ দিতে হতো। জাতীয় শিল্পীদের কবিতা আবৃত্তি, গান, নাচ আরো কত কী দেখে বেড়াতে পারতাম। আজ চাকরিতে নেই বলে অনেক কর্মসূচিতে ইচ্ছা থাকলেও অংশগ্রহণ সম্ভবপর হচ্ছে না। তাই বলে কি আমি কিছুই করব না?

অবশ্য আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আমাদের আব্বা-আম্মা জন্মদিনের উৎসব করতেন না এবং আমরাও আশা করতাম না। যখন ছেলেমেয়ের বাবা হলাম, তখন ঠিকই তাদের জন্মদিন সাধ্যের মধ্যে পালন করে তাদের আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করতাম। ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে, বিয়ে হয়েছে, এখন আর জন্মদিনের উৎসব করতে হয় না। তারা নিজেরাই করে, আর আমরা মোবাইলে অভিনন্দন জানাই।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু বলতে কথা। তাও আবার তার শততম জন্মবার্ষিকী। এই মহান মানুষটার জন্ম না হলে বাংলাদেশেরই জন্ম হতো না। একজন কৃষিবিদ হওয়া এবং সরকারের উচ্চ পদে চাকরি করাও হয়তো ভাগ্যে কোনো কিছুই জুটত না। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির এই জন্মদিনে অবসরে যাওয়ার কারণে সরকারের প্রোগ্রামে অংশগ্রহণে বঞ্চিত হয়েছি সত্য, তাই বলে এমন একটা দিনে আমি নিজেকে কি সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারি? বাসায় কয়েকজন মেহমান ছিল, আশপাশের কয়েকজন মেহমানকে দাওয়াত দিয়ে আনলাম। মধ্যবিত্তের আয়োজন পোলাও ভাতই অনেক কিছু। তা-ই আয়োজন করলাম। সবাইকে নিয়ে দুপুরে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী আমার বাসায় আমার মতো করে পালন করলাম। সে যে কী তৃপ্তি ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। এখন থেকে প্রতি বছরের ১৭ মার্চ আমার বাসায় অগ্রিম দাওয়াত দিয়ে রাখলাম। আল্লাহ সামর্থ্য দিলে ধীরে ধীরে এর কলেবর বৃদ্ধি করার ইচ্ছাও মনে পোষণ করি। বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষের মুক্তির মহানায়ক, তিনি বিশ্বের বুকে বাঙালিকে দিয়েছেন অনন্য মর্যাদা। এখন দেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু যেন একটি বাতিঘর।

বিশাল মনের অধিকারী বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের উৎসব পালন করার সময় একটা বিষয় উপলব্ধিতে আসে আর তা হলো আমাদের এই দুরবস্থার কথা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনতে পারলে অবশ্যই আমরা আমাদের এই দুরবস্থা থেকে উদ্ধার পাব। তিনিও তো তার বাবার মতোই বিশাল হৃদয়ের মানুষ। মানুষের দুঃখ, কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারেন না। আমাদের কথা জানতে পারলে নিশ্চয়ই তিনি দ্রুত আমাদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন। এই চিন্তা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গে কাগজ-কলম নিয়ে বসে পড়লাম।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি স্বপ্ন এক এক করে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী। তার নির্ভীক ও দৃঢ়চেতা মানসিকতার কারণে উন্নয়নের পথে কোনো বাধা, বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। দুর্বার গতিতে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের ছোঁয়া শহর থেকে গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। যত দেখছি ততই অবাক হচ্ছি, মুগ্ধ হচ্ছি। কী দেশ আমরা দেখেছি, এখন কী দেখছি। প্রধানমন্ত্রী, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আপনাকে জানাতে বাধ্য হচ্ছি, উন্নয়নের এই জোয়ারে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত কিছু কর্মচারী তাল মিলিয়ে চলতে পারছেন না। দিন দিন আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি, বড্ড অসহায়বোধ করছি।

চাকরি থেকে অবসরের আজ প্রায় দু-তিন বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও আমরা গ্র্যাচুইটির টাকা পাচ্ছি না। এই টাকা না পাওয়ার কারণে বৃদ্ধ বয়সে অর্থের অভাবে আমাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। টাকার অভাবে অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারছি না। সঠিক বা সুষ্ঠু চিকিৎসার অভাবে অনেকেই ইতোমধ্যে মারা গেছেন এবং মারা যাওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে। টাকার অভাবে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিবাহযোগ্য ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হতে হচ্ছে। যেখানে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ছে; সেখানে আমরা দিন দিন অসহায়বোধ করছি। বৈষম্যের এই জাঁতাকলে আমরা যেন হারিয়ে যাচ্ছি। অথচ

আমাদের ন্যায্য পাওনাদি পরিশোধ করলে আমরাও উন্নয়নের অংশীদার হতে পারতাম। আজ অংশীদার হওয়া

তো দূরের কথা ধীরে ধীরে আমরা এক এক করে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছাচ্ছি।

সামনে পহেলা বৈশাখ। আমরা আজও জানি না বৈশাখী ভাতা পাব কি না। বৈশাখের রং কি তাহলে আমাদের মনে লাগতে নেই? পবিত্র ঈদ আসাটা কি আমাদের জীবনে অভিশাপ মনে করব? কী দোষ করেছি আমরা? জীবন-যৌবন সব এই করপোরেশনে কাটিয়েছি। দিয়েছি সব মেধা ও শ্রম। আপনিই বলে থাকেন সততা এবং একাগ্রতা থাকলে কোনো শ্রমই বৃথা যায় না। সারাটা জীবন সৎ থেকে অমানুষিক শ্রম দিয়ে বিনিময়ে কী পেলাম? পেয়েছি শুধু বঞ্চনা এবং হয়েছি শুধু বৈষম্যের স্বীকার। প্রধানমন্ত্রীর গ্র্যাচুইটির টাকা পাচ্ছি নাÑ এ দুঃখ তো আছেই, তার ওপর গ্র্যাচুইটির টাকা প্রাপ্তির হিসেবেও আমাদের বঞ্চনার মাধ্যমে চরম বিবেকহীনতার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। এই বৈষম্যের কারণে অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মতো আমরা গ্র্যাচুইটির টাকা না পেয়ে অনেক কম টাকা পেতে যাচ্ছি। আমরা তাহলে কোন পাপের শাস্তি পাচ্ছি? আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী মায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি উপলব্ধিপূর্বক বিচার করবেন। সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ন্যায় আমাদের পাওনা নিশ্চিত করবেন অর্থাৎ সব বৈষম্য দূর করার নির্দেশ দেবেন এবং দ্রুত আমাদের অর্থের সংস্থান করে এহেন দুরবস্থা থেকে আমাদের রক্ষা করবেন।

পাশাপাশি আপনার নেতৃত্বে এবং আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণীতে দেশের জনগণ করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পাক, পৃথিবী থেকে করোনাভাইরাস দূরীভূত হোক, ভাইরাসটির ভ্যাকসিন অতিদ্রুত আবিষ্কার হোকÑ এই কামনা করছি। উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশে রূপান্তরিত হওয়ার যাত্রা আমরা শুরু করেছি। উন্নয়নের এই যাত্রায় আমরা যেন তলিয়ে না যাই, তাতো আপনাকেই দেখতে হবে, প্রধানমন্ত্রী।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত চিফ (এমআইএস)

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন

[email protected]

 

"