বিশ্লেষণ

অধিনায়ক মাশরাফি ও আমাদের ভবিষ্যৎ ক্রিকেট

প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০২০, ০০:০০

সাহাদাৎ রানা

সময়টা ১ অক্টোবর, ২০১৬। ঢাকায় আফগানিস্তানের বিপক্ষে তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে মাঠে ঢুকে পড়েন এক ভক্ত। আবেগী সেই ভক্ত সোজা ছুটে যান প্রিয় ক্রিকেটার মাশরাফির কাছে। সেই দর্শকের পেছনে ছুটে পুলিশ। আসেন বিসিবির নিরাপত্তাকর্মীরাও। শুরুতে মাশরাফি কিছুটা হচকচিয়ে গেলেও নিজেই সুন্দরভাবে পরিস্থিতি সামাল দেন। পুলিশকে থামান। প্রথমে ওই তরুণ ভক্তের সঙ্গে হাত মেলান। তারপর বুকেও জড়িয়ে নেন ভক্তকে। শুধু তাই নয়, যখন নিরাপত্তাকর্মীরা টানাটানি করছিলেন সেই যুবককে; তখন তাকে বুকে ধরে রেখেই তাদের হাত থেকে ছুটিয়েছেন। এই ভক্তকে কোনোভাবে যাতে শারীরিকভাবে কিছু না করা হয়; সেই নির্দেশনা ও অনুরোধও করেন মাশরাফি। পাশাপাশি নিজেই ভক্তকে এগিয়ে দেন কিছুটা পথ। এমন ঘটনা ক্রিকেটবিশে^ বিরল উদাহরণ। মাঠে ভক্তদের ঢুকে যাওয়া নতুন কিছু নয়। তবে সেই ভক্তকে এমনভাবে রক্ষা করার উদাহরণ নেই বললেই চলে। আর সেই কাজটি করেছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের মহানায়ক মাশরাফি। মাশরাফির পক্ষে এমন কাজ করাই সম্ভব। কারণ তার মনটা অনেক বড়।

এ প্রসঙ্গে মাশরাফি সব সময় বলেন, ভক্তদের জন্যই তিনি আজকের অবস্থানে। তাই ভক্তদের কোনোভাবেই তিনি কষ্ট দিতে পারেন না। তবে এবার মাশরাফি সত্যি সত্যি ভক্তদের কষ্ট দিলেন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সদ্য সমাপ্ত শেষ ওয়ানডের মধ্য দিয়ে অধিনায়কের পদ ছেড়ে দিলেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। যার শুরু আছে তার শেষও আছে, এটাই স্বাভাবিক। তাই মাশরাফি র অধিনায়ক থেকে বিদায় নেওয়া ঠিকই আছে। তবে প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। মাশরাফির মতো অধিনায়ক কি আগামীতে পাবে বাংলাদেশ? হয়তো পাবে, হয়তো না। এটা সত্যি আরো একজন অধিনায়ক মাশরাফিকে পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘদিন। কারণ, মাশরাফি শুধু দলের অধিনায়কই নন, তিনি সব সময় ছিলেন মাঠে দলের অভিভাবক। যার ওপর নির্ভর করা যেত।

অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফির সরে যাওয়ায় ইতোমধ্যে তামিম ইকবালকে ওয়ানডের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এখানে প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। বাংলাদেশের প্রধান পাঁচজন ক্রিকেটার মাশরাফি, সাকিব, মুশফিক, তামিম ও মাহমুদুল্লাহ অবসর নিলে অনেকটা সংকটে পড়বে দেশের ক্রিকেট। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। এক সঙ্গে পাঁচ ক্রিকেটার নয়, তিনজন ক্রিকেটার সম্প্রতি পাকিস্তান সফরে যাননি, এতেই ফুটে উঠেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের আসল চিত্র। ব্যক্তিগত কারণে পাকিস্তান যাননি মুশফিকুর রহিম। এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ হওয়ায় যেতে পারেননি সাকিব আল হাসান। শুধু এ দুজনের অনুপস্থিতিতে টেস্টে বাংলাদেশ যা খেলেছে তা এক কথায় করুণ। লজ্জাজনকভাবে হেরেছে টাইগাররা। তাদের বিকল্প হিসেবে যারা খেলেছেন তারাও নিজেদের প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের পাইপলাইন নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই আর কিছুদিন পর এই পাঁচজন ক্রিকেটার বিদায় নেবেন। তাই প্রশ্ন হলো, তাদের বিদায়ের পর কারা দায়িত্ব নেবেন দলের। বিশেষ করে ভবিষ্যতে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন পাইপলাইনে মানসম্পন্ন পর্যাপ্ত ক্রিকেটার নেই; যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য একটা হুমকি। এ বিষয় নিয়ে আলোচনা বর্তমান সময়ে একটি অতি কমন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলোচনাটা কতটুকু প্রাসঙ্গিক, তা নিয়ে হয়তো কারো দ্বিমত থাকতে পারে, তবে পাকিস্তান সফরের পর তা আর একেবারে অপ্রাসঙ্গিক নয় প্রসঙ্গটি। যদিও দুর্বল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলেছে টাইগাররা। কিন্তু জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পারফরম্যান্স দিয়ে সব কিছু বিচার করলে চলবে না।

এবার ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে এ বিষয়টির ওপর একটু আলোকপাত করা যাক। একটা দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সে দেশের উঠতি ক্রিকেটারদের পাইপলাইন কতটা শক্তিশালী বা সমৃদ্ধ তার ওপর। পাইপলাইনের ওপর নির্ভর করে তারা তাদের ভবিষ্যৎ ক্রিকেট নিয়ে কতটা ভাবছে। আগামীতে সে দেশ ক্রিকেটবিশ্বে কতটা রাজত্ব করবে, তারও পূর্বাভাস পাওয়ার সংকেতের নাম ‘পাইপলাইন’। এ কারণে দেখা যায়, যেসব ক্রিকেট দল প্রভাবশালী তারা দীর্ঘদিন আগে থেকেই তাদের পাইপলাইন নিয়ে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। ক্রিকেটের পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডের দিকে দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায় তারা পাইপালাইন নিয়ে কতটা সচেতন। সচেতন বলেই দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেটবিশ্বে তাদের রাজত্ব চলমান। পাইপলাইনকে কাজে লাগিয়ে এর ফলাফলও তারা পেয়ে যায় প্রত্যাশা অনুযায়ী। শুধু ক্রিকেট নয়, যেকোনো খেলাধুলার ক্ষেত্রে পাইপলাইনে কী পরিমাণ খেলোয়াড় আছে, তা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ প্রথম ওয়ানডে খেলে ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাত্রা করে। এর প্রায় ১৪ বছর পর ২০০০ সালে টেস্ট ময়দানে পদার্পণ টাইগারদের। ওয়ানডের হিসাবে সময়টা ৩৪ বছর। সময়ের হিসাবে কিন্তু কম নয়। তবে টেস্টের হিসাবে প্রায় ২০ বছর। এখন প্রশ্ন হলো, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশ কি তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী নতুন ক্রিকেটার উপহার দিতে পেরেছে? পারলেও কতটা সফল বাংলাদেশ? এর উত্তর অবশ্য মোটা দাগে দেওয়া কঠিন। তবে বাস্তবতা হলো, ১৯৮৬ সালে ওয়ানডে খেলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাত্রার পর থেকে নিয়মিতভাবেই নতুন নতুন ক্রিকেটার এসেছে। এবং এখনো আসছে। তবে প্রসঙ্গটা অন্য জায়গায়। প্রসঙ্গটা মানসম্পন্ন ক্রিকেটারের বিষয়ে। ১৯৮৬ সালের পর ২০০০ সাল পর্যন্ত যে পরিমাণ ক্রিকেটার এসেছে, তা ছিল সেসময়ের বিবেচনায় প্রত্যাশিত। নবীন একটা দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে সেসময় প্রতিনিয়ত শিখেছে বাংলাদেশ। সেসময় ক্রিকেটার পাওয়া নিয়ে অর্থাৎ জাতীয় দল গঠন নিয়ে কখনো সেভাবে ভাবতে হয়নি নির্বাচকদের। তবে ধীরে ধীরে সেই অবস্থা থেকে মনে হয় কিছুটা সরতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেই অর্থে টেস্ট ক্রিকেটার উঠে আসেনি। এখন প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্রিকেটার পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে। ২০ বছরের পথ চলায় যা পর্যাপ্ত নয়। আর বর্তমান সময়ে, বিশেষ করে দু-তিন বছর ধরে যা অপর্যাপ্ত। টেস্ট অঙ্গনে নতুন ক্রিকেটারদের ঘাটতির কারণ কী? দু-একটা সিরিজে নতুন ক্রিকেটারদের সুযোগ দিলেও তা কাজে লাগিয়ে দলে নিয়মিত হতে পারছেন না। এই সংকট যে শুধু টেস্টে, তা কিন্তু নয়, ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটেও প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্রিকেটার নেই। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে, টি-টোয়েন্টি মানের ক্রিকেটারের বড় অভাব। মাঠের পরিংখ্যানই এর প্রমাণপত্র।

এখন একটু আলোচনা করা যাক, পাইপলাইন আসলে কী? পাইপলাইনের কাজটা কেমন? পাইপলাইন বলতে মূলত সে দেশের অনূর্ধ্ব-১৯ ও ‘এ’ দলকে বোঝায়। যারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের তৈরি করে হয়ে উঠেন, জাতীয় দলের সম্ভাব্য প্রতিনিধি। যাদের ওপর দায়িত্ব বর্তায় জাতীয় দলের। সে হিসেবে বাংলাদেশেও রয়েছে অনূর্ধ্ব-১৯ ও ‘এ’ দল। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে সে অর্থে কোনো ‘এ’ দল নেই। কয়েক বছর আগে ‘এ’ দল থাকলেও এখন ‘এ’ দলের বিকল্প হিসেবে আছে হাইপারফরম্যান্স দল। যাকে ‘এ’ দল হিসেবে গণ্য করা হয়। অনূর্ধ্ব-১৯ আর ‘এ’ দল বিবেচনায় বাংলাদেশের পাইপলাইনে অনেক ক্রিকেটার আছেন। এবার অনূর্ধ্ব-১৯ দল বিশ্বকাপ জিতে সেই সম্ভাবনার কথা জানান দিয়েছে। এটা আমাদের জন্য আশার খবর।

ফিরে যাই মূল প্রসঙ্গে। অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফি সরে গেলেও সকলের চাওয়া খেলোয়াড় হিসেবে দলকে আরো কিছুদিন সাপোর্ট দেবেন তিনি। এরপর অবসর নিলে বোর্ডের সঙ্গে কাজ করে দেশের ক্রিকেটের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবেন। কারণ মাশরাফিকে আমাদের বড় প্রয়োজন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"