মুক্তমত

সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা ও কিছু কথা

প্রকাশ | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

ড. সুলতানা আক্তার

কয়েক বছর ধরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা এখনো সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য ১২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ১২/০২/২০২০ তারিখে একটি সভা করেন। এ সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। ইউজিসির চেয়ারম্যান জানান, এই শিক্ষাবর্ষ থেকেই যেন সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন করা যায়, তা নিশ্চিত করতে মার্চ মাসে একটি একাডেমিক কমিটি গঠন করা হবে। এই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতির পক্ষে কেউ কথা বলেছেন, আবার কেউ বিপক্ষে বলেছেন। এখন আসি এই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা আসলে কী, এর থেকে শিক্ষার্থীরা আসলে কতটুকু লাভবান হবেন এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এই পদ্ধতি কী প্রভাব ফেলবে?

সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় মূলত একই প্রশ্নপত্রে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা নেওয়া হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী একটি মাত্র পরীক্ষা দিয়েই কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবেন। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার উদ্যোক্তারা পরীক্ষার্থীদের সময় এবং অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ কমানোর কথা চিন্তা করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আপাতদৃষ্টিতে এই পদ্ধতি খুবই সহজ এবং শিক্ষার্থীদের লাভবান হওয়ার বিষয়টি বোঝা যাচ্ছে। এর মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষার জটিলতা, সময় এবং অর্থের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, এই পদ্ধতি ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থায় মরণফাঁদ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে, তা লোপ পাবে। তখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় না থেকে একটি উচ্চশিক্ষা বোর্ড গঠন করা হবে। এখন আসি এই পরীক্ষা কমিটির নিয়ন্ত্রণে কে বা কারা থাকবেন? ইউজিসি নিয়ন্ত্রণ করবেন? কিন্তু ইউজিসি কি আইন অনুযায়ী এটি করতে পারেন? যদি তারা নিয়ন্ত্রণ করেন তবে কি স্বচ্ছ এবং সঠিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিতে পারবেন? ইউজিসি কি প্রশ্নফাঁস হবে নাÑ এই নিশ্চয়তা দিতে পারবে? পারবে না, কারণ অতীত ইতিহাস থেকে জানি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে ইউজিসির কিছু অসাধু কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। এখন আসি এই পরীক্ষা কমিটির সদস্য কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের করা হবে? অধিকতর ক্ষমতাবান এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষকদের পরীক্ষা কমিটির সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। পরীক্ষা কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য আবার মন্ত্রী, এমপিদের সুপারিশও আসতে পারে। ক্ষমতাহীন দক্ষ শিক্ষকরা পরীক্ষা কমিটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত নাও হতে পারেন। এটি নিয়েও ভবিষ্যতে জটিলতা দেখা দেবে। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস হলে এর দায়ভার কে নেবেন? এ ছাড়া এখানে যেহেতু বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পরীক্ষা কমিটির সদস্য করা হবে; সেহেতু প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি থেকেই যায়। প্রশ্ন ফাঁস হলে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপরে দায়ভার চাপানো হবে? প্রশ্ন ফাঁস ছাড়াও আরেকটি বিষয় থেকেই যাচ্ছে তা হলো, টাকা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ আরো বৃদ্ধি পাবে। যার টাকা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নেই, সে ভর্তি হতে পারবেন না। তাছাড়া কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থতার কারণে নির্দিষ্ট দিনে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পারলে সে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই আর ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবেন না। যে শিক্ষার্থীদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে এই পদ্ধতি করা হচ্ছে, তারা ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাছাড়া এর মাধ্যমে মানহীন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। টাকা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভর্তি হওয়া মানহীন শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটি নিজস্ব ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় স্বচ্ছ এবং সঠিক প্রক্রিয়ায় বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত শিক্ষার্থী ভর্তি করেন। স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইউজিসি কোনোভাবেই এই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি চাপিয়ে দিতে পারে না। উচ্চশিক্ষা ধ্বংসের একটি চক্রান্ত হচ্ছে এই পদ্ধতি। যদি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বঙ্গবন্ধুর যে অর্ডিনেন্সের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসন পেয়েছিল, তা উঠিয়ে নিতে হবে। বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছিলেন, তার বাস্তবায়ন আর হচ্ছে না। অচিরেই আমরা দেখতে পাব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়, একটি উচ্চশিক্ষা বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং ইউজিসি অধ্যক্ষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার জন্য এবং উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য অভিন্ন বা সমন্বিত যাই বলি না কেন, এই ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতির বাস্তবায়ন যাতে না হয়, তার জন্য আমাদের সোচ্চার হতে হবে। এখন আমরা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংস চাই, নাকি বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন চাই? এখন আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চাই, নাকি উচ্চশিক্ষা বোর্ড চাই; তা আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থাই বলে দেবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

"