পর্যালোচনা

ভাষা থেকে স্বাধীনতা চিন্তা-চেতনা ও বাস্তবতা

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০১:২৭

আবু আফজাল সালেহ

বাংলা ভাষার অর্জন কিন্তু কম নয়। বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে আমরা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সেভাবে এগিয়ে যাচ্ছি না। বরং পিছিয়েই যাচ্ছি। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত ‘

The Summer Institute of Linguistics

’-এর তথ্যানুসারে ব্যবহারকারীর সংখ্যা হিসাবে বাংলা বাষার অবস্থান চতুর্থ। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ভারতের আসাম, বিহার, ওড়িশা, ঝাড়খ- প্রদেশ, মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের রোহিঙ্গাদের কিছু অংশ বাংলা ভাষায় কথা বলে (যদিও রোহিঙ্গাদের একটি অংশ বাংলাদেশে)। বাংলা ভাষার বিরাট অর্জন আছে। ভাষাশহিদদের স্মরণে এবং সব মাতৃভাষা বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে ২১ ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে। ‘সিয়েরা লিয়ন’-এর দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। জাপানি ভাষার পর বাংলা ভাষার সাহিত্যে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল জয়ী হয়েছেন।

আজ আন্তর্জাতিকতার মর্যাদা পেয়েছে বাংলা। অত্যন্ত গর্বের বিষয় এটি। কিন্তু বাংলা ভাষার মর্যাদা আমরা কতটুকু রাখতে পারছি, সেটাই প্রশ্ন! সর্বত্র বাংলা ভাষা প্রচলনে আদালত পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হয়। এটা আমাদের জন্য লজ্জার। ফেব্রুয়ারি এলে এ নিয়ে আলোচনা বেশি হয়। অন্য মাসে প্রায় ঝিমিয়ে থাকে এ বিষয়। শুরু থেকে এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা অর্জনে যাদের অবদান রয়েছে আমরা বাঙালিরা কী করতে পেরেছি বা কী করছি? অথবা এ ব্যাপারে যারা আগ্রহী তাদের আমরা কীভাবে সাপোর্ট দিচ্ছি! ইতিবাচক উত্তর খুব কমই আসবে মনে হয়। তার মানে আমরাই উন্নত অবস্থান চাই কি না! অন্তর, অবস্থান আর বাস্তবায়নের মধ্যে মিল বা সমন্বয় আছে বলে মনে হয় না! আমরা সরে এসেছি একুশের চেতনা থেকে বহুদূর। বাহান্নতে ও একাত্তরে যতটা বাঙালি ছিলাম, আজ তার সিকিভাগও চেতনতা এখন নেই। অথচ আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।

বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ ছিল ভাষা আন্দোলন। নিজের ভাষায় কথা বলার, লিখতে পারার, গান গাইতে পারার স্বাধীনতার লড়াইয়ের নাম ভাষা আন্দোলন। তাই বলা হয়, একুশ মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করা। একুশ মানে বিজয়ের লক্ষ্যে আত্মত্যাগ। একুশ মানে শাসকের অপতৎপরতা প্রতিরোধ করার অপ্রতিরোধ্য সংগ্রাম, শক্তি, সাহস। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির মহিমার পথ ধরেই আজকের মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ।

বিশ্বজুড়েই বাঙালির মধ্যে বাংলার চর্চা উল্লেখযোগ্য। তাহলে আমাদের ভাষার সংকটটা ঠিক কোথায়? সংকটটা হচ্ছে বাংলা আজও ‘কাজের ভাষা’ হয়ে উঠতে পারেনি। আমরা এখনো সার্থক বাংলা অভিধান করতে পারেনি। বারবার পরিবর্তন করতে হচ্ছে। অফিস আদালতে শতভাগ বাংলা ভাষা চালু করতে পারেনি। এর জন্য আদালতের নির্দেশনা পর্যন্ত দিতে হয়! বিজ্ঞান বা চিকিৎসাশাস্ত্রের বিভিন্ন টার্মের পরিভাষা বাংলা করতে পারেনি। ইংরেজি বা পরিভাষা ব্যবহার করছি। চাকুরি পাবার ক্ষেত্রে বাংলার চেয়ে ইংরেজিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির চর্চায় বাঙালির কাছে আজও বাংলাই মূল ভাষা। সাহিত্যচর্চার বাংলা আজও প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে সমৃদ্ধ হচ্ছে, শব্দকোষ রোজ পরিমার্জিত হচ্ছে আপন ছন্দে। সাহিত্য-সংস্কৃতি বা শিল্পচর্চার বাইরে যে বৃহত্তর পেশার জগৎ, সেখানে বাংলা ভাষাকে খুব বেশি কাজে লাগাতে পারছি না আমরা। আমরা দেখতে পারি অন্য জাতির ক্ষেত্রে। চীন, জাপান, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানিতে মাতৃভাষার এই সংকট কিন্তু নেই। কারণ নিজেদের মাতৃভাষাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভাষা করে তুলতে পেরেছেন। আমরা পারিনি।

দেশভাগের পর বাংলা ভাষায় পূর্ববাংলার ৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলতেন এবং ভাষা হিসেবে পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশি মানুষ বাংলা ভাষাতেই কথা বলতেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের করাচিতে জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা এবং স্কুল ও মিডিয়ায় ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সাল থেকে সেসময়ের সরকারি কাজকর্ম ছাড়া সব ডাকটিকিট, পোস্টকার্ড ও ট্রেনের টিকিটে উর্দু ভাষায় লেখা থাকত। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালি সংস্কৃতিকে এবং ভাষাকে হিন্দুয়ানি আখ্যা দিয়ে বিষয়টিকে পাকিস্তানীকরণের চেষ্টা চালাতে থাকে। সে সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে একটি সভা হয়। সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিষয়ে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। একই বছর পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের সভাতেও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপিত হয়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার জন্য শত শত নাগরিকের স্বাক্ষর নেওয়া স্মারক জমা দেওয়া হয় সেসময়ের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে।

১৯৪৮ সালে জন্ম হলো পূর্ব পাকিস্তান স্টুডেন্ট লিগের। সভাপতির দায়িত্ব নিলেন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ স¤পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। তাদের উদ্যোগেই ঢাকায় সাত দিনের এক কর্মী ক্যা¤প অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মুসলিম লিগ বাঙালি সংস্কৃতি ও ভাষার বিরুদ্ধে ধর্মের অজুহাত তুলে যে নিচুস্তরের প্রচারণা ও অজুহাত চালাচ্ছিল তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার কৌশল আলোচনা হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বিভিন্ন সময়ে তিরবার সংশোধনীসহ বিলটি সংসদে উত্থাপন করেছিলেন। ক্রমেই পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হলো স্টুডেন্ট সেকশন কমিটি। ১১ মার্চ তারিখে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ডাক দেওয়া হলো ধর্মঘটের। সেদিন সমাবেশ শেষে মিছিলে মুসলিম লিগের গুন্ডারা এবং পুলিশ যৌথ হামলা চালাল। গ্রেফতার হলেন শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, কাজী গোলাম মাহবুব, শওকত আলি, অলি আহাদসহ আরো কয়েকজন।

পৃথিবীতে ছয়টি ভাষার জন্য আলাদা আলাদা আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস আছে- (১) ২০ মার্চ আন্তর্জাতিক ফরাসি ভাষা দিবস (২) ২০ এপ্রিল ‘আন্তর্জাতিক চীনা ভাষা দিবস’ চীনা বর্ণমালার প্রতিষ্ঠাতা সং জি হৈ কে স্মরণ করে। (৩) ২৩ এপ্রিল ‘আন্তর্জাতিক ইংরেজি ভাষা দিবস’ শেক্সপিয়রের মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে। (৪) ৬ জুন ‘আন্তর্জাতিক রুশ ভাষা দিবস’ আলেকজান্ডার পুশকিনের জন্মবার্ষিকী স্মরণে। (৫) ২১ অক্টোবর ‘আন্তর্জাতিক ¯প্যানিশ ভাষা দিবস’ (৬) ১৮ ডিসেম্বর ‘আন্তর্জাতিক আরবি ভাষা দিবস’। ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হলেও বাঙালিরা পৃথিবীর সব মাতৃভাষাকেই সম্মান জানায়। ১৯৬১ সালের ১৯ মেতে আসামের শিলচর শহরে অসম রাইফেলসের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১১ জন ভাষাবিপ্লবী। যার পরিণামে ওই রাজ্যে এখন বাংলা হয় দ্বিতীয় রাজ্য ভাষা। আসামের শিলচরের একটি রেলস্টেশনের নাম ভাষাশহিদ করা হয়েছে।

বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি মানুষের ভাষা হলো বাংলা। বাংলা ভাষার মর্যাদার বিশ্বায়ন ঘটেছে। বাংলা ভাষা বিশ্বের অনেক ভাষা থেকে সমুন্নতও হয়েছে। আন্তর্জাতিক মর্যাদাও পেয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা পেয়েছে। ভাষার ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম অর্জন ১৯৫৬ সালে। ২৩ মার্চ, যেদিন পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। দ্বিতীয়বার হচ্ছে ১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভের পর। বাংলা ভাষার বিশ্বায়নের সত্যিকারের স্বীকৃতি পায়। এ ভাষার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অমর কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’ রচনা করে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন ১৯১৩ সালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিয়ে বাংলাকে নিয়ে গেছেন বিশ্বে। ১৯৯৮ সালে কানাডায় বসবাসকারী দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম প্রাথমিক উদ্যোক্তা হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানিয়েছিলেন সেই সময়ের জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে ইউনেসকোর অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি সদস্য দেশগুলোতেও পালিত হতে শুরু করে। ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘এখন থেকে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হবে’ মর্মে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এভাবেই বাংলা ভাষার বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া চলমান। এখন অমর একুশে আর শুধু বাংলাদেশ বা বাঙালির না, বিশ্বের প্রতিটি দেশে পালিত হওয়া একটি দিন। যা বাঙালির গর্বের। যে গর্ব থাকবে হাজার বছর। দিনটি শুধু বাংলাদেশের নয়। বাংলা ভাষার। পৃথিবীর যে প্রান্তে যে বাঙালি আছে, তাদের সবারই গর্ব করার দিন একুশে ফেব্রুয়ারি।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"