মুক্তমত

শিশুমন ও তার স্বাস্থ্য

প্রকাশ | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

ড. ফারাহ দীবা

এক দশকের বেশি সময় মানুষের মনবিষয়ক জ্ঞানাহরণ করতে গিয়ে লক্ষ করেছি, কোনো এক অজানা কারণে আমাদের মাঝে একটি প্রবণতা কাজ করে। আর সেই প্রবণতা হলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ভুলে যেতে থাকি শিশুদের ‘মন’ বলে একটা কিছু থাকতে পারে। কিন্তু চোখ বন্ধ করে এক মিনিট নিজের শিশুকালের কোনো একটি ঘটনা মনে করুন তো। পাঁচ-ছয় বছরের আপনি। একা অন্ধকারে থাকার কষ্ট, বন্ধুদের কাছে পাত্তা না পাওয়া, শিক্ষকের কাছ থেকে বিনা অপরাধে শাস্তি পাওয়া ইত্যাদি। আজও মনে হলে নিজের জন্য কি কষ্ট হয় না আপনার? এমন ছোট ছোট অনেক স্মৃতি, দুঃখ-কষ্ট-বেদনাই দিন দিন তৈরি করেছে আজকের আপনার ভেতরকার আপনাকে। মানবজীবনে শিশুকাল তাই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু শিশুকালের অভিজ্ঞতাসমূহ থেকেই ধীরে ধীরে একজন মানুষের সব ধরনের সামাজিক, মানবিক, বিবেক, বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতাটি নির্দিষ্ট ধরনের হয়ে প্রতিষ্ঠা পায়, তাই খুব সহজেই অনুমেয় যে, এ সময় শিশুর চারপাশে, ভালো অনুভূতি তৈরির আবহ থাকার প্রয়োজনীয়তা কতখানি। আর আমাদের মতো অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশে এর প্রয়োজনীয়তা আরো অনেক বেশি। এর কারণ ব্যাখ্যা করা আসলে খুব বেশি প্রয়োজন নেই, সেগুলো সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত আছি। তবু কিছু বিষয় এ লেখায় অবতারণা করছি।

ধরুন, রিকশা, অটোরিকশা বা গাড়িতে আপনি কোথাও বের হয়েছেন। আপনি গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত সড়ক দূর্ঘটনার আশঙ্কা ছাড়াও কতগুলো ছোটখাটো বিষয় নিয়ে পুরোটা পথ আতঙ্কিত থাকেন। আবার গন্তব্যে পৌঁছে বিষয়টা আপনি আপনাআপনিই ভুলে যান!!! যেমন কোনো সিগন্যালে দাঁড়ানো মাত্র কিছু শিশু আপনাকে ঘিরে ধরতে পারে চকলেট বিক্রির নামে, গাড়ি পরিষ্কারের নামে আপনাকে প্রথমে তার অসহায় শৈশবকে ব্যবহার করে আপনাকে দুর্বল করতে চাইবে এবং আপনি যদি তাকে তার আশানুরূপ প্রতিদান না দেন, তবে সে এমন একটা কিছু করে বসবে যা আপনার দিনের বাকি সময়টার মানসিক প্রশান্তি কেড়ে নিতে পারে। হয়তো আপনি অবাক হয়ে ভাবছেন একই বয়সি নিজ পরিবারের শিশুদের প্রতি চারপাশের সবাই তার শিশুতোষ সারল্যেই আকৃষ্ট হই। তাহলে কেন ওইসব শিশু তাদের সারল্য হারাচ্ছে।

এর উত্তর আমরা সবাই জানি। ওরা আসলে পরিস্থিতির শিকার। ওরা ভালো বিষয় যত না দেখে, শোনে নির্মম কথা-আচার-আচরণের অভিজ্ঞতায় পূর্ণ হয় তার চেয়ে বেশি। সেটাই তাদের মানসিকতায় ছাপ ফেলছে এবং দিনের পর দিন তাদের মনের এ অবস্থাগুলো যখন এভাবেই চলতে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এরা বড় হয় অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি-মায়া-দয়াহীন এক একজন মানুষ হয়ে ওঠে। আজ ১২ বছরের শিশুটি আপনার কাছে কিছু চেয়ে না পেয়ে (আপনি যদিও দিতে বাধ্য নন) আপনাতে হয়তো ভেঙচি কেটে একটা বাজে কথা বলে চলে যাচ্ছে, কিন্তু সামনে এই শিশুটি যখন ১৫-১৭ বছর হয়ে আমার বা আপনার টাকার ব্যাগটি কেড়ে নিতে গলায় ছুরি ধরবে না বা ধরাটা তার জন্য অস্বাভাবিক হবে তার নিশ্চয়তা কী?

আমরা ভাবি, তাহলে হয়তো ঘরের শিশুরা ভালো আছে? কিন্তু আসলে কি তাই? হতে পারে আবার নাও হতে পারে। আমাদের অনেককেই শিশুদের ঘরে রেখে যেতে হয়, কাজের লোকের কাছে। স্কুল-কলেজ-কোচিং ইত্যাদি নিয়ে যেতে বা আসতে ছেড়ে দিতে হয় ড্রাইভারের ভরসায়। কখনো রেখে আসতে হয় প্রতিবেশীর বাড়িতে। কিশোরী মেয়েটিকে প্রয়োজনেই কিনে দিতে হয় মোবাইল ফোন, রাত জেগে যে কারো সঙ্গে ফ্রি অফারে কথা বলার ভয় থাকার পরও। কলেজপড়ুয়া ছেলেটিকে কিনে দিতে হয় ল্যাপটপ, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় এক নিমেষে পনোগ্রাফির জগতে প্রবেশের দরজাটি খোলা জেনেও। এগুলো খুব সাদামাটা ঘটনা প্রাত্যহিক জীবনে, কিন্তু আমাদের অগোচরে প্রতিদিন এসব বিষয়ের ভেতর দিয়েই কোনো না কোনো মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটে যাচ্ছে অনেক সাবধানে রাখা শিশুদের জীবনে। শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন ঘটে যায়, হয়তোও আমরা জানতেও পারি না। আমাদের সঙ্গে পরিবারের শিশুটির বয়স উপযোগী সত্যিকার সম্পর্ক আসলে আছে কি বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে? ভালো জামা-কাপড়, ভালো স্কুল, ভালো অবস্থা শিশুর জীবনে সুনিশ্চিত করাই তার পরিপূর্ণ বিকাশকে সুরক্ষিত বা সুসংগঠিত করা নয়।

উদাহরণস্বরূপ ২০১১ সালে দেশের ছয় জেলার ৫৮১ জন স্কুলগামী শিশু নিয়ে আমার করা একটি ছোটখাটো গবেষণার কথা বলতে চাই। ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ মেয়ে এবং ৬ দশমিক ৬ শতাংশ ছেলেশিশু (৯-১৭ বছরের) নানা ধরনের (স্পর্শহীন থেকে স্পর্শযুক্ত) যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। এবার হয়তো মনে হতে পারে যে, সেজন্যই আসলে মায়েদের উচিত শিশুদের সঙ্গে সারাক্ষণ সময় দেওয়া। কারণ আমাদের সমাজে এটি আরেকটি অদ্ভুত ধারণা প্রচলিত যে, লেখাপড়া শেখা, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করা উচিত মেয়েদের, কিন্তু যখনই একটি সন্তান তার জীবনে আসলে সবকিছু ছেড়ে তাকে ঘরের ভেতর সমগ্র পৃথিবী বানানো উচিত। কিন্তু তাই যদি ঠিক হতো তবে কেন গ্রামাঞ্চলে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ মেয়ে ও ৫ দশমিক ৭ শতাংশ ছেলেশিশু এসব নির্যাতনের শিকার হচ্ছে অথচ শহরের একই বয়সি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ মেয়ে এবং দশমিক ৯ শতাংশ ছেলে এসব নির্যাতনের শিকার হচ্ছে! তবে কি আজকাল গ্রামীণ মায়েরা সব বাইরের কাজে চলে যাচ্ছেন? বাবা-মা দুজনের সঙ্গে শিশুর বন্ধনের প্রকৃতিই মূলত তাকে একজন মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করে। আমাদের সবকিছুর ওপরে শিশুদের গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মানে শুধু আমাদের শিশুটি নয়। ১৪ কোটি বাংলাদেশির ছয় কোটি শিশুই আমাদের নিজেদের পরিবারের এবং আমাদের বিশাল নিম্ন আয় পরিবারের ভবিষ্যৎ। তাই আমরা যারা শিক্ষার কারণে জীবনের ভালো কথাগুলো জানতে পারি তাদেরই দায়িত্ব এসব এক-দুজন করে ওদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কারণ তারা এসব মানসিক বিষয় নিয়ে ভাবে না, ভাবার মতো অবস্থা তাদের নেই।

পরিশেষে আবারও বলতে চাই, শিশুর সঙ্গে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা অপরিহায। শিশুর পরিপূর্ণ সুস্থতা তথা শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক বিকাশে শুধু উপস্থিত থাকাটাই সবকিছু নয়। প্রয়োজন প্রকৃত মনোযোগের এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের; যার মাধ্যমে আপনার সন্তানের সঙ্গে আপনি বন্ধু হয়ে উঠতে পারেন এবং নানা রকম সমস্যা থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হতে পারেন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

"