পরিচিতি

প্লাস্টিকের জীবনচক্র বনাম দূষণচক্র

প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

জুবাইর ইসলাম

আমাদের বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে হচ্ছে প্লাস্টিক দূষণ। প্লাস্টিক উৎপাদন বর্তমান বিশ্বকে যতটা না সহজতর করেছে তার চেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন পড়তে হচ্ছে। বর্তমান সময়ে পৃথিবীর মানুষের সামনে অন্যতম একটা চ্যালেঞ্জ হলো এই প্লাস্টিক। প্লাস্টিক কীভাবে তৈরি হয়?

প্লাস্টিক মূলত সিন্থেটিক বা মনুষ্য নির্মিত পলিমার। এই প্লাস্টিক উৎপাদনে প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল; যা ক্র্যাকিং প্রক্রিয়ায় ইথিলিন এবং প্রোপিলিনের মতো মনোমার তৈরি করে বা আরো বিস্তৃত মনোমারের দিকে নিয়ে যায়। এ মনোমারগুলো রাসায়নিকভাবে পলিমার শৃঙ্খলে জমাটবদ্ধ হয়ে তখন মনোমারের বিভিন্ন সংমিশ্রণ বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্যসহ প্লাস্টিক দেয়। প্লাস্টিক মূলত দুটি গ্রুপে বিভক্ত থাকে; যার একটি হলো থার্মোপ্লাস্টিক। আমাদের ব্যবহার করা যার বেশির ভাগ প্লাস্টিক হলো থার্মোপ্লাস্টিক। থার্মোপ্লাস্টিক মানে বোঝায় এটি তৈরি হয়ে গেলে বারবর উক্তপ্ত এবং সংস্কার করা যায়। অপরটি হলো থার্মোসেটস, যার অর্থ হলো পুনরায় ব্যবহার করা য়ায় না। আবার গরম করা হলে উপাদানটি গরম হওয়ার পরিবর্তে পচে যায়।

এই প্লাস্টিক পণ্য দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে এখন রফতানি হচ্ছে পৃথিবীর অনেক দেশেই; যার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় আসছে। আমাদের দেশে ব্যবসায়িক এবং আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য প্লাস্টিক উৎপাদন দিন দিন বেড়েই চলেছে। ভোক্তা সমাজ ও উৎপাদনকারীদের মানসিকতা এবং আচরণের জন্য দায়ী। বাংলাদেশে প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্লাস্টিক দ্রব্যাদির বাজার প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। এখানে প্রায় মাথাপিছু পাঁচ কেজি প্লাস্টিকদ্রব্য উৎপন্ন হয় প্রতি বছর। ঢাকা শহরে প্রতিদিন ১ কোটি ৩০ লাখ পলিব্যাগ ফেলানো হচ্ছে; যা বিভিন্ন নদী, জলাধার ও মহাসাগরে জমা হচ্ছে। সাগর ও নদীর তলদেশে জমার কারণে পানি, মাটি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং সামুদ্রিক জীবের ক্ষতি করে এবং যেসব প্লাস্টিক পুনরায় ব্যবহারের অনুপযোগী, তা মারাত্মকভবে পরিবেশ দূষণ করে। প্লাস্টিক বর্জ্য প্রজনন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে এবং ক্যানসারের কারণ হিসেবে দেখা দেয়।

বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক আমরা ব্যবহার করি যেমন টয়, চামচ, বালতি, চেয়ার, টেবিল, পলিথিন ইত্যাদি। আমরা প্লাস্টিকদ্রব্য ব্যবহার করার পর যেসব পরিত্যক্ত হয়; সেগুলো সাধারণত রাস্তার পাশে বা চোখের সামনেই ফেলে রাখি; যা কোনো রকম ব্যব্যস্থাপনা হয় না। ময়লা প্রথমে যদি চরিত্রানুসারে ভাগ করে আলাদা বক্সে রাখা হতো তাইলেই তাদের যথাযথ নিষ্পত্তি সম্ভব হতো। কিন্তু তা না করে আমরা খাবার ও ভেজা বর্জ্য এবং প্লাস্টিক কাগজ সব একসঙ্গে ফেলে দেই; যার জন্য বর্জ্যদের পৃথক করে বর্জ্যগুলো আমরা ব্যবহার করতে পারি না। বর্জ্যদের পৃথক করার পদ্ধতি আমাদের স্বভাব বানিয়ে ফেলা উচিত। প্লাস্টিক বর্জ্য এবং পৌরসভার বর্জ্য জমা করার পড়ে সব একসঙ্গে হয়ে গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটা গোল বাধে। যখন ময়লদের পৃথকীকরণের পর পুনর্বিন্যাসের যোগ্য বর্জ্যদের নির্দিষ্ট পৌরসভা দ্বারা পরিচালিত হস্তশিল্পের দ্বারা এমন অনেক জিনিস দিয়ে সুন্দর সুন্দর হাতের কাজ তৈরি করা হয়, যাদের ঘর সাজাবার জিনিস হিসেবে ব্যবহার করার জন্য বিক্রি করা যেতে পারে। যে বর্জ্যদের আর ব্যবহার বা পুনর্বিন্যাস করা সম্ভব নয়, তাদের পরিত্যক্ত ফাঁকা জমিতে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু এই বর্জ্যদের সঙ্গে প্লাস্টিক মিশে থাকে তখন তাদের পুনর্ব্যবহার ও পুনর্বিন্যাস সম্ভব হয় না, ফলে পুরো ময়লাটাই প্লাস্টিকসহ ওই জমিতে ফেলে দিয়ে আসতে হয়। এটা একই সঙ্গে জমির উর্বরতা নষ্ট করে, আবার অক্ষত অবস্থায় থাকা প্লাস্টিক ওই জমিতে বছরের পর বছর ধরে অবস্থান করে। নদীনালা, সাগর ও অন্যন্য জলাশয়ে আমরা প্রত্যহই আমাদের দৈনন্দিন ময়লা-আবর্জনা ফেলে আসি। আর এ কারণেই তারা প্লাস্টিকজাত বর্জ্যরে কবলে পরে প্রাকৃতিকভাবে বিপন্ন হয়ে পড়ছে। ক্লোরিন মিশ্রিত প্লাস্টিক বর্জ্যে রাসায়নিক পদার্থ মির্শিত হয়ে নিঃসৃত করে; যা জলজপ্রাণী উদ্ভিদদের প্রাণ সংকটের মুখে ফেলে দিচ্ছে। যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যস্তূপ অবৈজ্ঞানিকভাবে ফেলে ছড়িয়ে রাখা হয়; তখন সেই প্লাস্টিক হতে নিঃসৃত বিষাক্ত মাটিতে মিশে উদ্ভিদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে। প্লাস্টিক নিষ্পত্তি করতে চেয়ে অনেকেই তাকে পুড়িয়ে ফেলে। ফলে ডাই অক্সিন, কার্বন মনো-অক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা বায়ুকে দূষিত করে। খাবার টাটকা রাখতে প্লাস্টিক বাসন ব্যবহার করি। আমরা কিন্তু সেই প্লাস্টিক যদি ঠিকঠাক না হয়; তা থেকে অনেক ¯œায়বিক বিষ নির্গত হয়; যা মানুষের প্রজনন ক্ষমতাকে দুর্বল করে এবং একই সঙ্গে মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রতিহত করে।

২০০২ সালে শুরুতে সরকার ঢাকা শহরে মার্চ মাসে সমগ্র দেশে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল। এপ্রিলে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ২০০২ নামে অভিহিত আইনে বিষয়টি সংযুক্ত হয়েছে। কিন্তু আইন প্রণীত হলেই শুধু হবে না, প্রণীত আইন বাস্তবায়ন হতে হবে। বাজারে গেলেই প্রণীত আইন কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, তা প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে বোঝা যায়। এখন প্রশ্ন ওঠে যে, প্রণীত আইনটি বাস্তবায়নের জন্য কে দায়িত্ব পালন করবেন, তা নির্ধারণ হয়েছে কি না, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে; সে বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে আইন প্রণীত হয়েছে, সেখানে কোথাও উল্লেখ করা হয় নাই। ব্যাপারগুলোর সব দায়িত্ব অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাঁধে রয়ে গেছে। আর তিনি সেটা কাঁধে নিয়ে নিশ্চিন্তে সুখে-শান্তিতে দিন পার করছেন। প্রণীত আইন সম্পর্কে জনগণ যেন সুস্পষ্ট ধারণা পায়, তার প্রচরের দাবি জানিয়েছে পলিথিন ব্যাগ প্রতিরোধ সমন্বয় কমিটিসমূহ। পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধকরণ আইন বাস্তবায়ন করার জন্য আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ হলো পলিথিন ব্যাগের পরিবর্তে জনগণ যা ব্যবহার করবে, তার সহজপ্রাপ্যতা ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। আমাদের সমস্যা ব্যাপক, যার অনেকগুলো আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করেছি। সেগুলোর জন্য অনেক আইন রয়েছে, কিন্তু আমরা তা মান্য করি না। পলিথিন ব্যাগ নিয়ন্ত্রণে যে আইন প্রণীত হয়েছে, তার মধ্যেও এ ধরনের সমস্যা রয়েছে। এ মহামারি দূষণের হাত থেকে রক্ষা পেতে বর্তমানে ব্যবস্থাপনায় যে ধরনের গতি দেখা যাচ্ছে, তা আরো গতিশীল হবে। এই প্রত্যাশা যারা পরিবেশের সুস্থতা আশা করে তাদের সবার।

গত বছরের শুরুতে একটি খবর সব পরিবেশ সচেতন মানুষকে আশাবাদী করেছে। খবরটি হলোÑ পাট থেকে জৈব প্লাস্টিক বা পলিথিন উৎপাদন পক্রিয়া’ আবিষ্কার। কাজটি করেছেন ড. মোবারক আহম্মদ খান, যিনি বাংলাদেশের পাটকল করপোরেশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা (সংগ্রহীত)। নিঃসন্দেহে চমৎকার একটি খবর। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, পাট থেকে উৎপাদিত প্লাস্টিক ব্যাগের খরচ প্রচলিত প্লাস্টিক ব্যাগ চেয়ে কিছুটা বেশি। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধির দ্বারা এ খরচ কমিয়ে আনা সম্ভব। এখানে উৎপাদন কৌশলের বিষয়টি সামনে চলে আসে। উৎপাদন কৌশল জটিল হলে কয়েকটি বিশেষায়িত মিলের উৎপাদন করা উচিত। তখন এর গুরুত্ব চলে যাবে সরবরাহে। আমাদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন, এ সমস্যা শুধু ঢাকার নয়, সমগ্র দেশের। তাই এ জৈব প্লাস্টিক ব্যাগ প্রচলন করা উচিত সারা দেশে। এ ক্ষেত্রে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতি অনুসরণে কোনো লজ্জা নেই। যদি এর উৎপাদন প্রক্রিয়া সহজ হয়, তবে যেসব অঞ্চলে পাট ভালো হয়, সেসব অঞ্চলেই এর উৎপাদন ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন প্লাস্টিক ব্যাগের ভোক্তারা সারা দেশে ছড়ানো। অঞ্চলভিক্তিক উৎপাদন প্রথমদিকে বেশি হবে, তবে পরবর্তী কালে পাট সংগ্রহ ও উৎপাদন পণ্যবাজারে সরবরাহের খরচ কম হওয়ায় অতিরিক্ত খরচ পুষিয়ে নেওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে অনুপ্রেরণা দিতে হবে, তা হতে পারে সহজশর্তে ঋণ বা কারিগরি সহায়তায় সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র থেকে উদ্যোক্তার জন্য আর্থিকভাবে প্রণোদনা থাকতেই হবে। যেটাই করা হোক হিসাব রাখতে হবে বাজারে এর দাম নিয়ন্ত্রণে। জৈব প্লাস্টিকের দাম প্রচলিত প্লাস্টিকের দামের থেকে বেশি কোনো পরিকল্পনাই কাজ হবে না।

লেখক : শিক্ষার্থী

এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

 

"