বিশ্লেষণ

করোনায় কাঁপছে চীন দুশ্চিন্তায় বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

বিশ্বজিত রায়

করোনায় কাঁপছে চীন। ভাবনায় ফেলেছে বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বকে। এতে আক্রান্ত হয়ে চীনে মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। করুণাহীন করোনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে অধিক জনসংখ্যার এই দেশটি। চীন ছাড়িয়ে পাশের দেশসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। প্রতিদিনই করোনার উদ্বেগজনক খবর পত্রিকান্তরে ছাপা হচ্ছে। এতে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছে দেশের মানুষ। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে। তার পরও আতঙ্ক কাটছে না।

খবরে বলা হয়, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা হুহু করে বেড়েই চলেছে। কোনো মতেই থামানো যাচ্ছে না এ মৃত্যুর মিছিল। গতকাল মঙ্গলবার চীনের হুবেই প্রদেশে ভাইরাসটিতে নতুন করে ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশটিতে করোনাভাইরাসে ১ হাজার ১১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, ১১ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার পর্যন্ত চীনে ৪৪ হাজার ৬৫৩ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ৫৬ মিলিয়ন মানুষ করোনাভাইরাস আতঙ্কে রয়েছে। এতে আতঙ্কিত বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্ব। করোনার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতির ভীতকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের এক নম্বর রফতানিকারক দেশ চীনে করোনাভাইরাস যতই ছড়িয়ে পড়ছে, বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কপালের ভাঁজ ততই বাড়ছে। চীন থেকে কাঁচামাল আর যন্ত্রাংশ আমদানি না করে শিল্প চালু রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম। এতে করে অর্থনীতিতে ক্ষতির সম্মুখীন বাংলাদেশ ভোগছে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কায়। গেল বছরের মাঝামাঝি সময়ে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা মোকাবিলা করে ক্লান্ত বাংলাদেশ তাই চিন্তিত।

গ্রিক শব্দ করোনে মানে মুকুট এবং লাতিন শব্দ করোনা মানে মালা থেকেই করোনাভাইরাস পরিবারের নামটি এসেছে। ১৯৬০ সালে খুঁজে পাওয়া এই ভাইরাস পরিবারে দুই শতাধিক সদস্য আছে, তবে মানুষের ভেতর সংক্রমণের জন্য আগে ছয়টি ভাইরাস চিহ্নিত হয়েছিল। ২০১৯ সালে চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া আলোচিত এই ‘নোবেল করোনাভাইরাস (২০১৯ এনসিওভি)’ হলো মানুষে সংক্রমিত হওয়া করোনার সপ্তম প্রজাতি। আর এ প্রজাতিই চীনসহ বাংলাদেশ ও বিশ্বকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রায় মুমূর্ষু অবস্থায় পতিত সদ্য গত হওয়া বছরটি সাবধানি সুর শুনিয়ে যাচ্ছে। তখন ডেঙ্গুবাহী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পাশাপাশি হাসপাতালমুখী হয়েছিল অসংখ্য মানুষ। ভাইরাসবাহিত এ ব্যাধিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল ঢাকাসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি জেলা। ডেঙ্গুর রুগ্ণদশা কাটিয়ে ওঠা বাংলাদেশ বর্তমান করোনার করুণ খবরে তাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। আমাদের চেয়ে বহু গুণ সামর্থ্যশালী দেশ চীন থেকে যেভাবে করোনার মরণঘাতী বাস্তবতার খবর পাওয়া যাচ্ছে; তাতে চিন্তিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই ডেঙ্গু সদ্য সামাল দেওয়া বাংলাদেশের জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকা জরুরি।

চীনফেরত বাংলাদেশিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি করোনা বিতাড়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব প্রয়োজন। দরকার হলে চীন বাংলাদেশ বিমান যোগাযোগ সাময়িক বন্ধের যে দাবি উঠছে; তা আমলে নিতে হবে। যদিও এতে উন্নয়ন কর্মকান্ডসহ নানা ক্ষেত্রে স্থবিরতা দেখা দেবে, তার পরও সময় থাকতে সাবধান হওয়াটা হবে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। কারণ ছোঁয়াচে ভাইরাস করোনা যদি কোনো মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করতে পারে; তাহলে দেশব্যাপী মড়ক সৃষ্টির শঙ্কা তৈরি করবে। প্রতিষেধকবিহীন এ ভাইরাস এক দেহ থেকে অন্য দেহে সংক্রমিত হয় বিধায় মানুষের মধ্যে একটু বাড়তি আতঙ্ক বিরাজ করছে। এই আতঙ্ক দূর করতে চীনফেরত প্রবেশদ্বারটি যেভাবে সুরক্ষিত ও শঙ্কামুক্ত থাকে; সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেও ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীনফেরত যাত্রীদের পরীক্ষায় গলদের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তার কম থাকায় রাতের শিফটে কিছু যাত্রী পরীক্ষা ছাড়াই বেরিয়ে এসেছে। বিমানবন্দরের হেলথ ডেস্ক ফাঁকা থাকায় চীনফেরত এক যাত্রীর ফেসবুক লাইভের পর টনক নড়েছে কর্তৃপক্ষের। এমন সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে ঝুঁকি আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চীনে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসবাহী করোনা শুধু চীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে তা নয়, এশিয়াসহ সমগ্র বিশ্বে এর ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়েছে। মৃত্যুর পাশাপাশি চীন যেমন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে; তেমনি সেই আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে সারা বিশ্ব। এমন খবর পত্রিকান্তরে উঠে আসছে। খবরে বলা হয়, প্রাণঘাতী এ ভাইরাস ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে গেছে চীনের সব প্রদেশে। এসব শহরে যেমন বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন, রেল ও বিমান চলাচল; তেমনি বন্ধ রয়েছে অনেক বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ভাইরাসটি চীন থেকে বিশ্বের ২৮টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় এ নিয়ে বিশ্ববাসী এখন ভুগছে মহামারির আতঙ্কে। ফলে অন্য দেশগুলোও ক্রমেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক দেশ চীনে সরাসরি বিমান পরিচালনা বন্ধ করেছে। অনেক দেশ ঘোষণা দিয়েছে চীনা নাগরিকদের ভিসা না দেওয়ার। অ্যাপলসহ বিভিন্ন বড় বড় প্রতিষ্ঠানও চীনে তাদের সব আউটলেট বন্ধ ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশ প্রত্যাহার করছে চীনাপণ্য আমদানির অর্ডার। ফলে সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ সব দিক থেকেই এক মহাইমেজ সংকটে পড়েছে এশিয়ান ইকোনমিক জায়ান্ট চীন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। আর্থিক ক্ষতি পৌঁছে যেতে পারে ছয় হাজার কোটি ডলারে। কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের চলমান বাণিজ্যযুদ্ধেও অর্থনীতির এতটা ক্ষতি হয়নি, যতটা না করেছে করোনা। করোনার প্রভাবের কারণে অনেকটাই থমকে গেছে চীনের অটোমোবাইলসহ নির্মাণশিল্প। হুবে প্রদেশে গড়ে ওঠা নিশান, হোন্ডা ও জেনারেল মোটরসসহ আরো বেশ কয়েকটি দামি ব্র্যান্ডের গাড়ির প্রতিষ্ঠানের কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই অবস্থা দেশটির আরেক লাভজনক খাত পোশাকশিল্পেও। তৈরি পোশাকশিল্পে অনেক দিন ধরেই চীন শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এরই মধ্যে অনেক আমদানিকারক তাদের অর্ডার বাতিল ও স্থগিত করায় বিপাকে পড়েছেন গার্মেন্ট মালিকরা। ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে কার্যত ধস নেমেছে চীনের অর্থনীতির আরেক লাভজনক খাত পর্যটনেও। ইতোমধ্যেই দেশটির সব প্রদেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ায় অনেক শহর অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ফলে আতঙ্কে পর্যটকরা আর চীনমুখী হচ্ছেন না। এমনকি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে অভ্যন্তরীণ পর্যটনও। এরই মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই একের পর এক বিমান পরিবহন সংস্থা চীনে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রাখার কথা জানাচ্ছে। ইতোমধ্যেই চীনের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা বেড়েছে। গত ১৩ মাসের মধ্যে বিশ্ববাজারে সর্বনিম্নে নেমে গেছে তেলের দাম। চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আতঙ্কে ভুগছেন অনেক বিনিয়োগকারী। বাংলাদেশে প্রভাব পড়েছে অনেক বড় বড় প্রকল্পের কাজে। এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান মুডিস ইনভেস্টরস সার্ভিস বলেছে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কোম্পানিতে চীনের প্রভাব থাকায় তাদের অর্থনীতির দুরাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিরও বিপদ ঘটাবে। করোনামুক্ত থাকতে বাংলাদেশকে সদা সতর্ক থাকতে হবে।

 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

 

"