নিবন্ধ

প্রকৃতি সংরক্ষণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

বাংলাদেশের প্রকৃতি আর নৃগোষ্ঠী যেন একে অপরের পরিপূরক। প্রকৃতি ছাড়া নৃগোষ্ঠীর অস্তিত্ব কল্পনা করারও কোনো সুযোগ নেই। নৃগোষ্ঠী পরিবারে একটি শিশু জন্মগ্রহণ করার পরপরই তার বন্ধুত্ব তৈরি হয় প্রকৃতির সঙ্গে। এ যেন হাজার বছরের চিরাচরিত নিয়ম। নৃগোষ্ঠীর প্রতিটি মানুষ প্রকৃতির কাছেই লাভ করে তার বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে জীবনধারণের সবকিছুই। নৃগোষ্ঠীর লোকজন তাদের চাষাবাদ, ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, ওষুধপত্র, খাবার-দাবার, জ্বালানিসহ সবকিছু সংগ্রহ করে প্রকৃতি থেকে। বাংলাদেশ সরকারের তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ৫০ জাতের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে। তারা হলো ওরাঁও, কোচ, কোল, খাসিয়া বা খাসি, খিয়ং, খুমি, গারো, চাক, চাকমা, ডালু, তঞ্চঙা, ত্রিপুরা, পাংখোয়া বা পাংখো, বম, বর্মণ, মণিপুরি, মারমা, পাহাড়ি বা মালপাহাড়ি, মুন্ডা, ম্রো, রাখাইন, লুসাই, সাঁওতাল, হাজং, মাহাতো বা কুর্মি মাহাতো বা বেদিয়া মাহাতো, কন্দ, কড়া, গঞ্জু, গড়াইত, গুর্খা, তেলি, তুরি, পাত্র, বাগদি, বানাই, বড়াইক বা বাড়াইক, বেদিয়া, ডিল, ভূমিজ ভুইমালী, মালো বা ঘাসিমালো, মাহালি, মুসহর, রাজোয়াড়, লোহার, শবর, হুদি, হো, খারিয়া বা খাড়িয়া এবং খারওয়ার বা খেড়োয়ার। এসব নৃগোষ্ঠীর লোকজনের প্রায় ৮০ শতাংশই পাহাড়ে ও ২০ শতাংশ সমতলে বসবাস করছে। পাহাড় বা সমতল যেখানেই বসবাস করে না কেন, তারা যুগ যুগ ধরে নানা বঞ্চনা ও হয়রানির শিকার হয়ে আসছে। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে তাদের নিগূঢ় সংযোগ কখনোই বিচ্ছিন্ন হয়নি। প্রকৃতি তাদের দিচ্ছে অঢেল। প্রকৃতির এ দান তারা যেমন গ্রহণ করছে; তেমনি এ দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, জীব ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা এবং বৃদ্ধিকল্পে নৃগোষ্ঠীর লোকজনও নীরবে-নিভৃতে অবদান রেখে চলেছে। প্রকৃতির কোলে জন্ম নেওয়া নৃগোষ্ঠীর লোকজন শিশুকাল থেকেই নিজেদের অস্তিত্বের জন্য প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর সংগ্রাম করে যাচ্ছে। নৃগোষ্ঠীর লোকজন আর প্রকৃতির এ নিগূঢ় বন্ধুত্ব পথচলা হাজার বছরের।

‘সিলভানুস লামিন’ লিখিত একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বিশ্বের প্রায় ৩৭০ মিলিয়ন নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসী স্থায়িত্বশীল, কার্বন নিরপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে কার্বন-নেতিবাচক জীবনযাত্রা পরিচালনা করে। যার কারণে তারা হাজার হাজার বছর টিকে আছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারছে। প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে আলোচনায় নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের একটি স¤পর্ক রয়েছে। কেননা বিশ্বের বেশির ভাগ নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের ‘বাস’ খুবই প্রকৃতি ঘনিষ্ঠ। তাদের জীবন ও জীবিকা প্রকৃতিনির্ভর। বিভিন্ন পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে এই নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসী মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ৩০-৩২ লাখ। নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি, জীবনপ্রণালি প্রকৃতির সঙ্গে রয়েছে অবিচ্ছেদ্য স¤পর্ক।’

নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদর তাদের বসবাস ও চাষাবাদের জমির জন্য এবং তাদের নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি সংগ্রাম ও লড়াই করতে হচ্ছে। নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীরা কখনোই প্রকৃতিতে বেড়ে ওঠা কোনো গাছ কাটে না। গাছকে তারা তাদের মায়ের মতোই শ্রদ্ধা করে। তারা তাদের জমিতে কোনো ধরনের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে না! কৃষিকাজের জন্য তারা অব্যবহৃত অবস্থায় পতিত নেড়া পাহাড়ে গাছ রোপণ করে। তারা তাদের জমিতে জৈব সার ব্যবহার করে। কখনোই কোনো নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীর লোকজন তাদের জমিতে বা ফসলে কোনো প্রকার কীটনাশক ব্যবহার করে না। বর্তমানে মনুষ্যসৃষ্ট কারণে কোনো না কোনোভাবে প্রকৃতি বিনষ্ট বা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেখানে নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসী জনগোষ্ঠী পাহাড়ি এলাকায় বসবাসপূর্বক জীবন সংগ্রাম করে প্রকৃতি ও পরিবেশকে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় করে তুলতে অবদান রেখে চলেছে। নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের এলাকায় লাখ লাখ দেশি গাছপালা, গুল্ম ও লতা আমাদের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীরা তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই এসব গাছপালা ও গুল্ম সংরক্ষণ করে রেখেছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে প্রমাণিত হয়, যে এলাকায় নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের আবাস রয়েছে; সে এলাকায় এখনো বন টিকে আছে, সেখানে টিকে আছে পাখি, পোকামাকড়, ক্ষুদ্র প্রাণ ও জীবন। শহুরে বা শহরসংলগ্ন গ্রামীণ ব্যবস্থাপনায় খাদ্য শৃঙ্খলে অশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ায় অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে খাদ্যাভাবের কারণে। কিন্তু নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের বাস এলাকায় পশু ও প্রাণীদের খাদ্য সংকট না থাকায় এখনো অনেক প্রাণী ও ক্ষুদ্র প্রাণ টিকে আছে।

নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীরা যে কৃষিচর্চা করে তাদের জীবিকা পরিচালনা করছে; সেগুলো পরিবেশবান্ধব এবং কম কার্বন নিঃসৃত হয়। নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীরা নিরন্তরভাবে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে অবদান রেখে চলেছে। নৃগোষ্ঠী খাসিয়া সম্প্রদায়ের একমাত্র জীবিকার উৎস পানচাষ। পানগাছ বড় গাছকে জড়িয়ে ধরে বেড়ে ওঠে। তাই পানচাষের জন্য খাসিয়ারা প্রচুর পরিমাণে গাছপালা সংরক্ষণ করে। তারা প্রতি বছর তাদের জীবিকার প্রয়োজনে প্রচুর বৃক্ষরোপণ করে। যা দেশের পরিবেশ ও প্রকৃতিকে করছে সমৃদ্ধ। শুধু খামিয়া নয়, বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীও তাদের প্রয়োজনে প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ করে চলেছে।

নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীরা বন রক্ষা করতে প্রয়োজনে নিজেদের জীবন অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে। কারণ প্রকৃতি ও বন না থাকলে তাদের বেঁচে থাকাই দায়। বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব অঞ্চলে নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীরা বসবাস করে; সেসব অঞ্চলে এখনো বন টিকে আছে। জীবিকার তাগিদে নতুন বন সৃষ্টি করছে তারা। এসব বন এবং বনের বিভিন্ন উপাদান দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণকর।

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আলোচিত সমস্যা জলবায়ু পরিবর্তন। বন উজাড় ও প্রকৃতি এবং পরিবেশ বিনষ্টের কারণে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাসহ এ দেশের মানুষের অভিযোজনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশ সরকার ২০০৮ সালে জলবায়ু পরিবর্তন কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে; যা hv Bangladesh Climate Change Strategy and Action Plan (BCCSAP) নামে পরিচিত। সরকারের এই কৌশলপত্র প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের অভিযোজনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া। এ প্রশিক্ষণের সঙ্গে দেশের নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে একদিকে রক্ষা পাবে তাদের জীবন ও জীবিকা; অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে সফল হবে সরকার।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

 

 

"