পর্যালোচনা

বৃক্ষরোপণ আমাদের নৈতিক দায়িত্ব

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

পরিবেশের ক্ষতি করে পৃথিবীতে কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না। তাই উন্নয়নের সঙ্গে আমাদের পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়নের নামে বৃক্ষ নিধন, পাহাড় কাটা, বনভূমি উজাড় ও প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাটের মতো কাজ থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে এবং প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে বৃক্ষরোপণ ও জলাধার নির্মাণকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও সোলার প্যানেল স্থাপনকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। এতে একদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষিত হবে; অন্যদিকে আগুন লাগার মতো দুর্ঘটনা ঘটলেও সহজে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। বৃক্ষ আমাদের ফুল দেয়। ফল দেয়। ছায়া দেয়। জ্বালানি কাঠ দেয়। বৃক্ষ বায়ুমন্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন ত্যাগ করে। অক্সিজেন ছাড়া পৃথিবীতে কোনো প্রাণী বাঁচতে পারে না। বৃক্ষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মানুষকে রক্ষা করে। বৃক্ষ পশুপাখি, কীটপতঙ্গসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীকে খাদ্য ও আশ্রয় জোগায়। মাটি ক্ষয়রোধ করে। বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। মাটির আর্দ্রতা রক্ষা করে। বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা হ্রাস করে। বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ রোধে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষা করতে আরো ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। পরিবেশের দূষণ নিয়ন্ত্রণসহ আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে অধিক পরিমাণে বৃক্ষরোপণ করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ ‘মুজিববর্ষ’ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে আগামী ৫ জুন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারা দেশে ৪৮২ উপজেলায় একযোগে ১ কোটি গাছের চারা বিতরণের এক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের বিপন্নতার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্যারিসে কপ-২১ নামের সম্মেলনে প্রথমবারের মতো একটি জলবায়ু চুক্তির ব্যাপারে সম্মত হন বিশ্ব নেতারা। ২০১৬ সালের এপ্রিলে ১৭৫টি দেশ ওই সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তির আওতায় বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির হার ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে এবং ক্রমান্বয়ে তা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনতে বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। চুক্তির লক্ষ্যমাত্রায় আরো রয়েছে গাছ, মাটি ও সমুদ্র প্রাকৃতিকভাবে যতটা শোষণ করতে পারে, ২০৫০ থেকে ২১০০ সালের মধ্যে কৃত্রিমভাবে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ সেই পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে ১৭০ কোটি হেক্টর জমি বৃক্ষহীন অবস্থায় রয়েছে, যার পরিমাণ বিশ্বের মোট ভূমির ১১ শতাংশ। এসব জমিতে স্থানীয় গাছ লাগানো হলে তা প্রাকৃতিকভাবেই বেড়ে উঠবে। নতুন এ গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন সুইস ইটিএইচ জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টমক্রাউযার। তিনি বলেন, নতুন এই সংখ্যাগত মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে দেখা গেছে, এটি শুধু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট সমাধানের একটি উপায়ই নয়; বরং এটি সর্বোৎকৃষ্ট পথ। নতুন করে বনায়নের বিষয়টি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমাধানের সেরা ১০টি উপায়ের একটি হবে। তবে সব সম্ভাব্য প্রস্তাবের মধ্যে এটি সর্বসম্মতক্রমে সবচেয়ে শক্তিশালী বলে বিবেচিত হয়েছে। এজন্য জলবায়ু সংকট ও উষ্ণায়ন মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে তিন লাখ কোটি গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। জলবায়ু পরিবর্তন রুখতে গাছ লাগানোর কর্মসূচি সবচেয়ে ভালো ও কম ব্যয়বহুল উপায় বলে মনে করছেন তারা। গাছ লাগানোর মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ দুই-তৃতীয়াংশ কমানো সম্ভব হবে।

গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বে উষ্ণতাপ্রবণ এলাকার পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের কথা, বর্তমান হারে নির্গমন হওয়া গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অনেক এলাকার অপেক্ষাকৃত শীতল গ্রীষ্মকালীন ঋতু উষ্ণয়নের দিকে যাবে। বাংলাদেশ বর্তমানে এ অবস্থার শিকার। আর এ ক্ষেত্রে শিল্প-কারখানার জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপন্ন গ্যাস তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এ কারণে অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা ও তীব্র গরমের মতো ঘটনা ঘটছে। আইলা, সিডর, ফণী ও বুলবুলের মতো ঘনঘন ঘটছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নদী ভাঙনের কারণেও নিঃস্ব হচ্ছে অগণিত মানুষ। বাপ-দাদার চিরপরিচিত ভিটামাটি ও বাড়িঘর হারিয়ে মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে শহরের অচেনা-অজানা বস্তিতে। গ্রীষ্মকালে সহনীয় উষ্ণতার কারণে মানুষের জীবন হয়ে উঠছে দুর্বিষহ। গত ২৮ এপ্রিল ২০১৯ সালে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১৪ সালে ২১ মে ওই একই স্থানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১৬ সালের ২৯ এপ্রিল রাজশাহীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ছিল ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকার শহরে বাতাসে এখন দিন দিন কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে এই বায়ুদূষণের অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে কয়লা ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, ইটভাটা, কল-কারখানার বর্জ্য ও ধোঁয়া, যানবাহনের ধোঁয়া, রাস্তার ধুলাবালি ও আধুনিক বর্জা ব্যবস্থাপনার অভাব। এ অবস্থায় আমাদের উচিত হবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রীষ্মকালীন উষ্ণায়ন থেকে রক্ষা পেতে প্যারিসে অনুষ্ঠিত কপ-২১ জলবায়ু সম্মেলনে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তার সফল বাস্তবায়নে কাজ করা। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদের সার্বিকভাবে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নিতে হবে। বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে শুরু করতে হবে সবুজায়ন অভিযান। রাজধানী ঢাকাসহ সব সিটি করপোরেশন, পৌর শহর, উপজেলা পর্যায়ের শহরগুলোতে রাস্তার দুই ধারে, সড়কদ্বীপে, বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, মিল-কারখানার পতিত জমিতে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করতে হবে। করতে হবে ছাদবাগান। যাতে আগামী ৫ বছরে আমাদের শহরগুলো সবুজ বৃক্ষে ভরে ওঠে। সেই সঙ্গে দেশের ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের সরকারি জমির শতকরা ৫ ভাগ এলাকায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) উদ্যোগে এবং ৫ ভাগ জমিতে শিল্প মালিকদের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজ শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে হবে।

জার্মানিতে শতকরা ১২ ভাগ ছাদ সবুজ এবং টোকিও আইনে সব নতুন ছাদের অন্তত ২০ ভাগ সবুজ রাখার কথা বলা হয়েছে। সিঙ্গাপুরের রুফটপ গার্ডেনবিষয়ক এক গবেষণা তথ্যে দেখা যায়, পাঁচ তলা বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে একটি বাগান বছরে জ্বালানি খরচের শূন্য দশমিক ৬ থেকে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ সাশ্রয় করতে পারে। অপরদিকে ঢাকা শহরের দেখা গেছে, যেসব বহুতল ভবনে ছাদবাগান আছে; সেসব ভবনের তাপমাত্রা ছাদবাগানবিহীন ভবনের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকে। তাই নগরবাসীকে গাছ লাগানো কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চীনের উদ্যোগটি অনুসরণ করা যেতে পারে। গ্রামীণজীবন সম্পর্কে ধারণা নিতে এবং জীবনযাত্রার পার্থক্য অনুধাবনের জন্য চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় চংকিং শহর কর্তৃপক্ষ শহরের শিক্ষার্থীদের গ্রামে পাঠায়। গ্রামে অবস্থানের সময় প্রায় সাড়ে সাত লাখ শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে ১০০টি করে চারা গাছ রোপণ করতে হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জীবনবোধ হয় মানবীয়, গ্রামমুখী এবং গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমানোর ব্যাপারে তাদের মধ্যে নতুন চিন্তাচেতনার সৃষ্টি হয়।

গত বছর এক দিনে ৩৫ কোটি গাছের চারা লাগিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়া। ইথিওপিয়ার প্রায় এক হাজারটি স্থানে এই বৃক্ষরোপণ কাজটি সম্পন্ন করা হয়। খরাকবলিত ওই দেশটিতে সম্প্রতি ৪০০ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গাছ লাগানোর কাজে সরকারি কর্মচারীরা যাতে অংশগ্রহণ করতে পারেন; সেজন্য বন্ধ রাখা হয় কিছু সরকারি অফিস। জাতিসংঘের হিসাবে বিংশ শতকের শুরুতে ইথিওপিয়ার বনভূমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৫ শতাংশ। কিন্তু ২০০০ সালের শুরুর দিকে তা কমে আসে ৪ শতাংশের কাছাকাছি। খরাপ্রবণ এই দেশটিতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করা এবং দেশটিকে বন উজাড় হয়ে যাওয়া অবস্থা থেকে বাঁচাতে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর আগে এক দিনে ৫ কোটি গাছ লাগিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ে ছিল ভারত। ২০১৬ সালে ভারতের ৮ লাখ স্বেচ্ছাসেবক এই বৃক্ষরোপণ উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেন।

আমাদের পবিত্র সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে, রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন। সংবিধানের এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্যও আমরা মুজিববর্ষে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিকল্পিতভাবে দেশীয় প্রজাতির পরিবেশবান্ধব বৃক্ষরোপণ করতে পারি। রোপিত গাছের চারাগুলোকে নিয়মিত পরিচর্যা করে বড় করে তুলতে পারি। জানাতে পারি জাতির পিতার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও গভীর শ্রদ্ধা এবং জাগ্রত করতে পারি পরিবেশ ও প্রতিবেশের প্রতি আমাদের মমত্ববোধ।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লিমিটেড, নাটোর

[email protected]

 

"