ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী মণিপুরি সম্প্রদায়

প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

বাংলাদেশের সিলেট বিভাগে আদিবাসী মণিপুরি সম্প্রদায়ের বসবাস। মণিপুরিরা ভাষার দিক থেকে দুটি বৃহৎ শাখায় বিভক্ত। দুটি ভাষাবাসী হলো ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’ ও ‘মৈতৈ’। এক ও অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উভয় সম্প্রদায়ের। সিলেট বিভাগের চারটি জেলা সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় মণিপুরি উভয় সম্প্রদায়ের অধিকাংশেরই বাস। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে মণিপুরি সম্প্রদায়ের অবদান অবিস্মরণীয়। এর আগে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও ভাষা-আন্দোলনসহ এ দেশের সব আন্দোলন-সংগ্রামে মণিপুরি সম্প্রদায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, বার্মা থেকে মণিপুরিরা সিলেট অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য হতে আগত মণিপুরিদের বড় অংশ আশ্রয় নেয় মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ভানুগাছর ভানুবিলে। পর্যায়ক্রমে তাদের বংশবৃদ্ধি হতে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে কয়েক হাজার মণিপুরির বসবাস। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে মণিপুরি সম্প্রদায় বিশেষ করে ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’ সমাজের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অবদান জাতি কৃতজ্ঞতাচিত্তে স্মরণ করে। এ দেশের মুক্তি সংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করতে হলে মুক্তিযুদ্ধে মণিপুরিদের অবদানের কথা অবশ্যই লিখতে হবে।

সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারী মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া সম্প্রদায় দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে এ দেশের সাধারণ মুক্তিকামী জনতার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধের ময়দানে সরব থেকেছে। পাকিস্তান শাসনামলে মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া সম্প্রদায় শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ নানা ক্ষেত্রে উপেক্ষা ও বঞ্চনার শিকার হয়। মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া সম্প্রদায়ের কোনো লোক চাকরি পেতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো। ফলে পাক সরকারের প্রতি মণিপুরি সম্প্রদায় বিশেষ করে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের চাপা ক্ষোভ বিরাজমান ছিল। একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে পাক হায়েনারা পূর্ব পাকিস্তানে হত্যা, নির্যাতন শুরু করে। সিলেট বিভাগের মণিপুরি অধ্যুষিত মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ভানুগাছ, হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট, সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক ও সিলেট জেলার কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় মণিপুরি পাড়াগুলোতেও শুরু হয় পাক হানাদার বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন।

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার কামারছড়া চা বাগানে পাক বাহিনী যুদ্ধের শুরুতেই তাদের ক্যাম্প স্থাপন করে। এখানে পাক বাহিনী ব্যাংকার খনন এবং ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য মণিপুরি সম্প্রদায়ের পাড়া থেকে তাদের ধরে এনে কাজ করতে বাধ্য করা হতো। বিনিময়ে তাদের কোনো অর্থ বা খাবার দেওয়া হতো না। দিনের পর দিন এভাবে মণিপুরিদের বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করানো হতো জোরপূর্বক। এ কাজে ব্যত্যয় ঘটলে বা প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর নেমে আসত অমানুষিক নির্যাতনের খড়গ। এরই মধ্যে একাত্তরের ১২ আগস্ট পাক হানাদার বাহিনী আকস্মিকভাবে কমলগঞ্জের ভানুবিল গ্রামে প্রবেশ করে মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া ব্রাহ্মণ সার্বভৌম শর্মাকে কোনো কারণ ছাড়াই গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। ১৪ আগস্ট একই এলাকার মণিপুরি নেতা রতন সিংহের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক লোটপাট করা হয়। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে পাক বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা। এ অবস্থায় ভানুবিল গ্রামের অসংখ্য মণিপুরি যুবক সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যোগ দেন মুক্তি বাহিনীতে।

আলোচ্য প্রতিবেদনে কয়েকজন মণিপুরি যোদ্ধার বীরত্বগাথা উপস্থাপন করা হলোÑ

নিমাই সিংহ : কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর গ্রামের মণিপুরি মুক্তিযোদ্ধা নিমাই সিংহ। ছাত্রাবস্থায় ছাত্রলীগের কর্মী নিমাই সিংহ একাত্তরের মার্চ মাসের শেষ দিকে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। হাফলং লেয়ার বনে ভারতের সামরিক অফিসার হনুমান সিংহের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ৪নং সেক্টরে ক্যাপ্টেন সাজ্জাদুর রহমানের অধীনে কমলপুর সীমান্তে যুদ্ধে নিয়োজিত হন। নিমাই সিংহ ধলাই সীমান্তঘাঁটি, কুমারঘাট, শ্রীমঙ্গল, আখাউড়া, খোয়াই প্রভৃতি অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন।

কৃষ্ণ কুমার সিংহ : কমলগঞ্জ উপজেলার উত্তর ভানুবিল গ্রামের রতন সিংহের ছেলে কৃষ্ণ কুমার সিংহ। তার পূর্বপুরুষ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। মুক্তিকামী পরিবারের সন্তান কৃষ্ণ কুমার সিংহকে যুদ্ধের শুরুতে পাক হানাদার বাহিনী কামারছড়া চা বাগান এলাকার ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়ে ক্যাম্পসংলগ্ন ঘন জঙ্গল পরিষ্কারের কাজে বাধ্য করে। পর পর চার দিন অন্যান্য মণিপুরি যুবকের সঙ্গে তাকে বিনা পারিশ্রামিকে ঘন জঙ্গল পরিষ্কার ও বাংকার খননের কাজ করতে হয়েছে। ১৪ আগস্ট পাক সৈন্যরা কৃষ্ণ কুমার সিংহের বাড়িতে ব্যাপক লুটপাট করে। ১৫ আগস্টও পাক বাহিনী কৃষ্ণ কুমার সিংহকে জঙ্গল পরিষ্কারের কাজে নিয়োজিত করে। ওইদিন দুপুরের দিকে কাজ করার একপর্যায়ে কৃষ্ণ কুমার সিংহ পাহাড়ি পথ ধরে পালিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাশহর মহকুমার ডলুগাঁও গ্রামে চলে যান। সেখান থেকে তিনি ভারতের জলাইগ্রামের পলটি বাজারে গিয়ে পৌঁছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক রাজা সাহেবের সহচার্যে হাফলং-এ মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। হাফলং-এ এক মাস প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে ক্যাপ্টেন সাজ্জাদুর রহমানের অধীনে কমলপুর সীমান্তে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে সিলেট অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ছিল ধলাই ক্যাম্প। ধলাই ক্যাম্প অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধে শাহাদাতবরণ করেন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান। ধলাই সীমান্তের অপাড়ে ছিল কমলপুর। কমলপুর থেকে ধলাই সীমান্তের পাক হানাদারদের ক্যাম্পে কৃষ্ণ কুমার সিংহের দল অসংখ্য মাইন নিক্ষেপ করে। এতে অনেক পাক সৈন্য হতাহত হয়। এর পরপরই কৃষ্ণ কুমার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে চলে আসেন তিলকপুর গ্রামে। ওই দলটি কামরছড়া পাক বাহিনীর ক্যাম্পে বেশ কয়েকটি চোরাগোপ্তা আক্রমণ করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই বীর সেনানী বাংলাদেশ সরকারের রেভিনিউ বিভাগে চাকরি পান।

বাবু সেনা সিংহ : কমলগঞ্জ উপজেলার উত্তর ভানুবিল গ্রামের বাবু সিংহ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরের এপ্রিলে শমসেরনগরের নিকটস্থ কামারছড়ায় পাক বাহিনী ক্যাম্প স্থাপনের পর ভানুবিল গ্রামের অন্যান্য যুবকের সঙ্গে পাক সৈন্যরা বাবু সেনা সিংহকেও জোর করে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। তাদের প্রতিদিন বাংকার খননের কাজে লাগানো হয়। এক দিন সুযোগ বুঝে বাবু সেনা সিংহ আরো দুজনকে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে যান ভারতে। তিনি শিলচর লেয়ার বনে তদানীন্তন মেজর সি আর দত্তের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষ করে ক্যাপ্টেন সাজ্জাদুর রহমানের অধীনে কমলপুর ধলাই সীমান্তে পাক বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ করে। এখানে যুদ্ধে মাইন বিস্ফোরণে বেশ কজন পাক সৈন্য হতাহত হয়। বাবু সেনা সিংহ এ অপারেশনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও অপারেশনেও অংশগ্রহণ করেন।

সতীশ চন্দ্র সিংহ : কমলগঞ্জ উপজেলার তিলকপুর গ্রামের মুরুলী চান সিংহের ছেলে সতীশ চন্দ্র সিংহ। একাত্তর সালে তিনি শ্রীমঙ্গল কলেজে বিএ ক্লাসের ছাত্র ছিলেন। শ্রীমঙ্গল শহরে পাকিস্তানি বাহিনী অবস্থান গ্রহণের পরদিন সতীশ চন্দ্র সিংহ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারতে চলে যান। ভারতের ত্রিপুরায় বিদ্যানগর হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে এসে ইন্টারভিউ দেন মুজিব বাহিনীতে ভর্তি হওয়ার লক্ষ্যে। সেখানে ১৪০ জন ইন্টারভিউ প্রদানের পর ৪০ জনকে মুজিব বাহিনীর জন্য বাছাই করা হয়। এরমধ্যে একজন সতীশ চন্দ্র সিংহ। মি. ভি কৃষ্ণন নামে ভারতীয় সামরিক অফিসারের অধীনে আসামের লোয়ার হাফলং-এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। গেরিলা প্রশিক্ষণে তিনি এলএমজি চালনা, গ্রেনেড নিক্ষেপ, এসএলআর, টাইম বোমা, স্টেনগান, অ্যামবুশ ও রাইফেল চালানোর শিক্ষা নেন। জুলাইয়ে ক্যাপ্টেন ফখরুলের অধীনে মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। পাত্রখোলা সীমান্তে তারা পরপর তিন রাত যুদ্ধ করেন। এ যুদ্ধে অনেক পাক সৈন্য হতাহত হয়। ২৮ জুলাই সতীশ চন্দ্র সিংহসহ মুজিব বাহিনী কমলগঞ্জ উপজেলার শসসেরনগর এলাকার একটি অপারেশনে অংশ নেন। বীর মুক্তি সেনানী সতীশ চন্দ্র সিংহ দেশের অভ্যন্তরে আরো বেশ কিছু স্থানে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

ব্রজমোহন সিংহ : কমলগঞ্জ উপজেলার ছড়া পাথারি গ্রামের শ্রীবটা সিংহের ছেলে ব্রজমোহন সিংহ। একাত্তরে ব্রজমোহন সিংহ তার নিজস্ব যৎসামান্য জমিতে কৃষিকাজ করে জীবনযাপন করতেন। একাত্তরের মে মাসের এক দিন ব্রজমোহন সিংহ নিজের জমিতে হাল চাষ শেষে বাড়ি ফেরার পথে পাক বাহিনী তাকে আটক করে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পুরো দিন তাকে ক্যাম্পে আটকে রাখার পর পাক অধিনায়ক তাকে গুলি করে হত্যার আদেশ দেয়। ব্রজমোহন সিংহকে হত্যার উদ্দেশ্যে পাক বাহিনী তার চোখ বেঁধে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে গাড়িযোগে একজন পাক একজন মেজর সে স্থানে উপস্থিত হয়। মেজর গাড়ি থামিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বুঝতে পারে ব্রজমোহন একজন মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া সম্প্রদায়ের লোক। মেজর তাকে গুলি করে হত্যা না করে তাকে দিয়ে বাংকার খননের নির্দেশ দিয়ে ছেড়ে দেন। কিন্তু পরদিন তিনি ছনগাঁও হয়ে জঙ্গলের পথে ভারতের উদ্দেশে রওনা দেন এবং মুক্তি বাহিনীতে যোগদান করেন। ব্রজমোহন সিংহের মুক্তি বাহিনীতে অংশগ্রহণের কথা শুনে শত্রুরা তার বাড়ি দখল করে নেয়।

ব্রজমোহন সিংহ লোয়ার হাফলং-এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ক্যাপ্টেন আবদুস সালামের অধীনে সিলেট শহরে অপারেশনে অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ক্যাপ্টেন সাজ্জাদুর রহমানের অধীনে কৈলাশহর ও কমলপুরে বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নেন।

বিশ্বম্ভর সিংহ : কমলগঞ্জ উপজেলার বালিগাঁও গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা বিশ্বম্ভর সিংহ। একাত্তরের এপ্রিলে তিনি ভারতে গিয়ে মিত্র বাহিনীর ক্যাপ্টেন ধীর সিং-এর তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি কমান্ডার হাবিবুর রহমানের অধীনে চাতলাপুর সীমান্তে অপারেশন ডিফেন্সে কাজ করেন। বিওপি কামারছড়া চাতলাপুরে তিনি অপারেশন ডিফেন্সের গুরুদায়িত্ব পালন করেন।

মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়াদের মধ্যে আরো যারা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন কমলগঞ্জ উপজেলার তিলকপুর গ্রামের রবীন্দ্র সিংহ, ভানুবিল গ্রামের কুলেশ্বর সিংহ, মানত্রী সিংহ, মাধবপুর গ্রামের কুষ্ণু সিংহ, গিরিন্দ্র সিংহ, বালিগাঁও গ্রামের বাপ্পী সিংহ, আনন্দ সিংহ, সুরমনি সিংহ, ব্রজেন্দ্র সিংহ, গোলের হাওর গ্রামের পদ্মাসন সিংহ, ছড়া পাথারি গ্রামের দিলীপ সিংহ ও তেইগাঁও গ্রামের নন্দেশ্বর সিংহ।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

 

"