বিশ্লেষণ

রাতকানা প্রতিরোধে ভিটামিন-এ

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০

ইয়াসমিন রীমা

কুমিল্লার গৌরীপুর উপজেলা অধীন কদমতলী গ্রামের সরকার বাড়ির সামনের বিশাল আম্রতলার আলোছায়ার প্রশস্ত জায়গায় নানা রঙের ও ব্র্যান্ডের গাড়ির পার্কিং সকাল থেকেই। সময়ে সময়ে জনাগমন। উপলক্ষ নাসরিনের পিতামহের ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। তাই নাসরিনের চাচা-মামারা ছাড়া অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন এই দিনটিতে গ্রামের বাড়িতে না আসার কোনো অজুহাত টিকবে না বলেই কেউ অনিচ্ছা প্রকাশ করেনি আসতে। অধিকন্তু এই দিনটিতে জীবনযাত্রার ব্যস্ততার কারণে দীর্ঘদিনের অ-যোগাযোগে ক্ষেত্রটি কিছুক্ষণের জন্য হলেও একত্রিত হয়ে যায়, অনেকের সঙ্গে অনেকের দেখা-সাক্ষাৎ পর্বটিও সম্পন্ন হয়। সম্পন্ন হয় কুশলাদিবার্তা, খোঁজ-খবর হয় সন্তান-সন্তানাদির।

সেই সকাল থেকেই বাড়ির বিশাল আঙিনা উপরে হলুদ-লালের মিশাল সামিয়ানা নিচে কাঙালি ভোজ চলছে। দলে দলে ফকিররা আসছে আর খাচ্ছে। অতিথিদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে নাসরিনের গ্রামের বাড়িতে বসবাস করা ছোট চাচার ঘরে। তক্তপোষের ওপর ফরাস পেতে দেওয়া হয়েছে। পরিচিত-অপরিচিত সব অতিথি একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া সারছে। কেউ কেউ খেয়ে দেয়ে চলেও যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ খোশগল্পে মেতে উঠেছে। এত বড় একটা আয়োজনের মধ্যে নাসরিনের আজ দেখা নেই। সে তার ঘরের চৌকির ওপর দুই হাটুর মধ্যে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সে সবার সম্মুখীন হতে পারছে না। বিশ্রী একটি যন্ত্রণা তাকে সব আনন্দযোগ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। কেবলই ভাবে কী পরিচয় দেবে তার সন্তানদের সবার কাছে। চৌকির ওপর শুয়ে আছে তার তিন সন্তান নাজিয়া (১২), নাবিল (১০) এবং নকিব (৮) যারা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে পর্যায়ক্রমে রাতকানা। অনেক কাক্সিক্ষত প্রথম সন্তান নাজিয়ার জন্য বাৎসল্যের অভাব ছিল না জন্মদাতা ও জন্মদাত্রীর। যখন একপা দুপা হাঁটতে শুরু করল তখন হাঁটতে গেলে হোঁচট খেত যা শিশুসুলভ ছিল না হাতের কাছে কিছু ধরার জন্য কেমন হাতড়াতে থাকত। সন্তানের এমন অবস্থায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে নাসরিন ও তার স্বামী মফিজউদ্দিন। নিয়ে আসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, ডাক্তার জানায় প্রয়োজনীয় ভিটামিনের অভাবে চার বছরের নাজিয়া রাতকানা রোগে পতিত হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে হয় তো দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে। অপারগতায় নাজিয়াকে নিয়ে আসে জেলা শহরে আলেখাচরে অবস্থিত জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতির চক্ষু হাসপাতালে। চক্ষু হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা একই অভিমত ব্যক্ত করেন। হতবিহ্বল নাসরিন তবু আশা ছাড়েনি। দরিদ্রতা তাকে কষ্ট দিচ্ছিল অহরহ। তবু দুই বছরের মধ্যে পরপর আরো দুটি সন্তান জন্ম দেয়। কিন্তু অত্যন্ত সতর্ক থাকা সত্ত্বেও পরের সন্তান দুটিরও একই অবস্থা হয়।

প্রত্যেক বাবা-মা কামনা করেন শিশুর স্বাস্থ্য সুস্থ ও নিরোগ থাকবে। তাই শিশু জন্মের পর থেকেই দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। বাংলাদেশে নাজিয়াদের মতো হাজার হাজার শিশু প্রতি বছর ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে ধীরে ধীরে প্রথমে রাতকানা রোগে আক্রান্ত হয়, ফলাফল অন্ধত্ব। অল্পবয়সি শিশুরাই অর্থাৎ ১ থেকে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্ত হয় অধিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশের শিশুদের বিভিন্ন প্রকার অপুষ্টির মধ্যে ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবজনিত অন্ধত্ব অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। এক তথ্যে জানা যায়, ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে প্রতি বছর দেশে ছয় বছরের কমবয়সি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার শিশু অন্ধ হয়ে যায় এবং ১০ লাখ শিশু রাতকানা রোগে আক্রান্ত হয়। এদের মধ্যে যারা মারাত্মকভাবে ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে আক্রান্ত হয়, কিছুদিনের মধ্যে তাদের অধিকাংশই মৃত্যুবরণ করে। আর দৈব্যক্রমে যেসব শিশু বেঁচে যায়, তারা পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির বোঝা হয়ে বেঁচে থাকে। স্বভাবতই শিশুর এই অপুষ্টিজনিত অন্ধত্বকে প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য জন্ম থেকেই তাদের ভিটামিন ‘এ’ এবং অন্যান্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যদ্রব্য পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়ানোর ব্যাপারে সব বাবা-মারই সচেষ্ট ও সচেতন হওয়া উচিত।

পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, সুস্থ শরীর এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধে শিশুদের প্রতিদিন ১ হাজর ৫০০ আইইউ ভিটামিন ‘এ’ দরকার। আর ৯ থেকে ১২ বছরের ছেলেমেয়েদের জন্য দৈনিক ৪ হাজার ৫০০ আইইউ ১২ বছরের উপরে ছেলেমেয়ে এবং একজন পূর্ণ বয়স্ক লোকের জন্য দৈনিক ৫ হাজার আইইউ, গর্ভবতী মায়ের জন্য প্রতিদিন ৬ হাজার আইইউ এবং প্রসূতি মায়ের জন্য দৈনিক ৮ হাজার আইইউ ভিটামিন ‘এ’ প্রয়োজন হয়। মায়ের বুকের দুধে শিশুর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ থাকে। তাই ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই নবজাত শিশুকে মায়ের বুকের প্রথম দুধ অর্থাৎ শালদুধ খেতে দিতে হবে। জন্মের পর থেকে পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়ালে শিশু ভিটামিন ‘এ’ সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিও লাভ করে। অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও দারিদ্র্যের কারণে আমাদের দেশের অনেক গর্ভবতী মা পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করেন না। যার ফলে গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে ভিটামিন ‘এ’ এর অভাব দেখা দেয়। এর ফলে শিশু জন্মানোর পর মায়ের বুকের দুধে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘এ’ কম থাকে। তাই গর্ভবতী মাকে প্রতিদিন ভিটামিন ‘এ’ এবং অন্যান্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খেতে হবে। এ ছাড়া শিশুর পাঁচ মাস পূর্ণ শরীরে ভিটামিন ‘এ’ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের চাহিদা পূরণ করার জন্য মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি শিশুকে অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারও খাওয়ানো উচিত। এ সময় শিশুকে নরম ভাত, সুজি নরম সিদ্ধ মাংস, মাছ, ডিম, ডাল, শাকসবজি এবং মৌসুমি ফল তার উপযোগী করে খাওয়াতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিভাগের অভিমতে, ভিটামিন ‘এ’ শিশুদের শুধু রাতকানা ও অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করে তাই নয় ভিটামিন ‘এ’ শিশুদের হাম, ডায়রিয়া ইত্যাদি সংক্রামক রোগে জটিলতা কমিয়ে শিশুর মৃত্যুহার হ্রাস করে। চক্ষু বিশেষজ্ঞদের অভিমতে, ভিটামিন ‘এ’ এর প্রধান দুটি কাজ হচ্ছে দুটি রঞ্জক তৈরি করা। অর্থাৎ চোখের দৃষ্টিশক্তি সুস্থ রাখা। ভেতরের এবং বাইরের আবরণীকে সুস্থ রেখে বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। খাদ্যদ্রব্য পরিপাক, হাড়, দাঁত ও ত্বকের গঠন অর্থাৎ শিশুর শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও পুষ্টি বজায় রাখতে ভিটামিন ‘এ’ সহায়তা করে। তা ছাড়া রক্তের স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখতে স্ত্রী-পুরুষের সন্তান ধারণের স্বাভাবিক সুস্থতার জন্য ভিটামিন ‘এ’ কাজ করে থাকে। চোখের রোটিনা অর্থাৎ সবচেয়ে ভেতরের আলোকে সংবেদনশীল পর্দায় রয়েছে অনেক গ্রাহক কোষ। এ কোষের ভেতরে রয়েছে আবার অপসিন বলে পরিচিত এক ধরনের প্রোটিন। অপসিন একা কোনো কাজ করতে পারে না ভিটামিন ‘এ’ ব্যতীত। ভিটামিন ‘এ’ এবং অপসিনের মিলনে তৈরি হয় বড় পনিস। বড় পনিসের ওপর আলো পড়লেই শুরু হয়ে যায় নানা রকম বিক্রিয়া। তার ফলে স্নায়ুতে যে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় তা মানুষকে খোদ অনুভূতি জাগায়। আর ভিটামিন ‘এ’ এর অভাব ঘটলেই বড় অপসিন তৈরি হতে পারে না। অল্প আলোতে দেখার ক্ষমতা কম হয়েই সৃষ্টি হয় রাতকানা রোগ। স্বাস্থ্য বিভাগ ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের মতে, যদি রাতকানার হার ১ শতাংশের উপরে হয় তাহলে জনস্বাস্থ্য সমস্যা। কিন্তু বর্তমানে ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবজনিত রাতকানা রোগের হার দশমিক ৬৬ ভাগ।

শরীরের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় এবং জরুরি অঙ্গের মধ্যে চোখ হচ্ছে সবচেয়ে বড় সম্পদ। আর এর রক্ষায় প্রতিটি মায়ের উচিত বুকের দুধের পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ ও অন্যান্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার অধিক পরিমাণ গ্রহণ করানো। নাসরিনের স্বামী মফিজউদ্দিনের আর্থিক সংকট ছিল ঠিক তাই হয়তো তার সন্তানের প্রয়োজনীয় খাদ্যপুষ্টি সঠিক সময়ে দিতে পারেনি কিন্তু এর চেয়ে বেশি তাদের মধ্যে ছিল অজ্ঞতা ও অসচেতনতা। ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে নাসরিনের সন্তানদের মতো আর কোনো শিশুর জীবনের যাতে এমন অন্ধত্বের শিকার হয়ে চিরদিন অন্ধকারে ডুবে না থাকে এটাই হোক আজকের প্রত্যাশা।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

"