মুক্তমত

রাঙ্গার ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের বিচার দাবি

প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, দেশের মানুষকে মুক্ত করা এবং স্বৈরাচার এরশাদ শাহীর পতনের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ নূর হোসেন সম্পর্কে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গার একটি মিথ্যাচার নিয়ে দেশব্যাপী চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। দেশের গণতন্ত্রপ্রিয় ও শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ বিস্মিত ও হতবাক। গত ১০ নভেম্বর শহীদ নূর হোসেনের মৃত্যুদিবসে জাতীয় পার্টির বনানী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় রাঙ্গা মন্তব্য করেন ‘অ্যাডিক্টেড একটি ছেলে নূর হোসেন। তিনি ইয়াবাখোর ও ফেনসিডিলখোর তথা মাদকাসক্ত ছিলেন। নূর হোসেনকে নিয়ে নাচানাচি করছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি। তাদের কাছে ইয়াবা-ফেনসিডিলখোর ও ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের গুরুত্ব বেশি। গণতন্ত্রের জন্য শহীদ যুবলীগকর্মী নূর হোসেন সম্পর্কে মশিউর রহমার রাঙ্গার এ মিথ্যাচারে ভরা মন্তব্য নিয়ে দেশব্যাপী সাধারণ মানুষের মাঝে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করেছে।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করেন এইচ এম এরশাদ। ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম ছাত্ররা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এরপর সামরিক সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ছাত্র-শিক্ষক-জনতা-পেশাজীবী ঐক্যবদ্ধভাবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। প্রথমে ১৫ দল ও সাত দল এবং পরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাত দল এবং বামদের নেতৃত্বে পাঁচ দল এই তিন জোট মিলে সামরিক জান্তা এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছিল ছাত্রদের প্রতিরোধ। এইচ এম এরশাদের প্রায় ৯ বছরের শাসনামলের পুরো সময়ই রাজপথ ছিল প্রতিবাদে উত্তাল। তবে সামরিক জান্তা এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের চূড়ান্ত গতি পায় ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে।

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগঠিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন অটোরিকশা চালক মো. মুজিবুর রহমান ও মরিয়ম বিবির ছেলে ঢাকা জেলা আওয়ামী মোটর চালক লীগের বনগ্রাম শাখার প্রচার সম্পাদক ও যুবলীগকর্মী নূর হোসেন। তিনি শহীদ হওয়ার পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়। শহীদ নূর হোসেনকে গুলি করে হত্যার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ বিরোধী দলগুলো ১১ ও ১২ নভেম্বর সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ঘোষণা করে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে, ফলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আরো ত্বরান্বিত হয়। সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে নূর হোসেন জীবন বিলিয়ে দেওয়ার পর থেকেই কাউন্ট-ডাউন শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর মধ্য দিয়েই স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এ কারণেই নূর হোসেনের নাম মনে হলেই স্বৈরাচারের দোসরদের পিত্তি জ¦লে ওঠে। অথচ রাঙ্গা যে দলের মহাসচিব, সে দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে এরশাদ নূর হোসেনের মৃত্যুর জন্য অফিশিয়ালভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

গণতন্ত্রের জন্য শহীদ নূর হোসেন সম্পর্কে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা আজগুবি মিথ্যাচার করে নিজেকে রাজনীতির মাঠে আলোচনায় আনার চেষ্টা চালিয়েছেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল। মশিউর রহমান রাঙ্গা তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন ‘অ্যাডিক্টেড একটি ছেলে নূর হোসেন। তিনি ইয়াবাখোর ও ফেনসিডিলখোর ছিলেন’। নূর হোসেন শহীদ হন আজ থেকে ৩২ বছর আগে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর। ওই সময়ে দেশে ‘ইয়াবা’ নামের কোনো মাদক ছিল না। আর ‘ফেনসিডিল’ ছিল কফের ওষুধ।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমদাদুল ইসলাম দক্ষিণ এশিয়ায় মাদকের বিস্তার নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণালব্ধ তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রথম মরণনেশা ইয়াবার বিস্তার ঘটে ১৯৯৯ সালে। আর আজ থেকে প্রায় ২৫-২৬ বছর আগেও ফেনসিডিল ছিল কেবলই একটা সাধারণ কাশির ওষুধ। ফেনসিডিল তৈরি করছে ভারতস্থ ‘রোন-পোলেনক’ নামক একটি ওষুধ কোম্পানি। তবে এটা কাশির ওষুধ ব্যবহার হওয়ার কথা, কিন্তু এখন সেটি ব্যবহৃত হচ্ছে নেশাকর বস্তুরূপে। যদিও ওই ‘রোন-পোলেনক’ (বাংলাদেশ) আমাদের দেশে রয়েছে এবং ব্যান্ড মেডিসিন হিসেবে ওই ফেনসিডিল প্রস্তুত এবং সরবরাহ করে না।

উপরোক্ত তথ্য উপস্থাপনের কারণ একটাই। জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা দাবি করেছেন শহীদ নূর হোসেন ইয়াবা-ফেনসিডিল আসক্ত ছিলেন! তিনি এ আজগুবি তথ্য কাথায় পেলেন? ১৯৯৯ সালের আগে এ দেশে ইয়াবা কী জিনিস, তা কেউই জানতেন না। ফেনসিডিলও পাওয়া যেত কাশির ওষুধ হিসেবে। নেশাজাতীয় পণ্য হিসেবে ফেনসিডিলের প্রচলন ছিল না। এখন প্রশ্ন হলো, ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর স্বৈরশাসক লে. জে. (অব.) হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতন আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ নূর হোসেন কীভাবে ইয়াবা পেতেন? আর শহীদ নূর হোসেন ইয়াবা সেবন করতেনÑ এ কথা শুধু মশিউর রহমান রাঙ্গাই জানতেন! তিনি যে গণতন্ত্রের জন্য একজন বীর শহীদ সম্পর্কে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে রাঙ্গার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি।

শহীদ নূর হোসেনের পৈতৃকবাড়ি পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার ঝাটিবুনিয়া গ্রামে। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের পর তার পরিবার ঢাকার ৭৯/১ বনগ্রাম রোডে বসবাস শুরু করে। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে নূর হোসেন বেশি দূর পড়ালেখা করতে পারেননি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়ার পর তার শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটে। এরপর তিনি গাড়িচালক হিসেবে পরিবারের হাল ধরেন। শহীদ হওয়ার সময় পর্যন্ত নূর হোসেন আওয়ামী রাজনীতির একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন।

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর দেশের দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একত্রিত হয়ে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের লক্ষ্যে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা করে। এর আগে এরশাদ ১৯৮২ সালে একটি সেনা উত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এরপর সারা দেশে বিরোধী দলের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন শুরু হয়। বিরোধী দলগুলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকায় একটি মিছিলে নূর হোসেন অংশ নেন। তার বুকে ও পীঠে সাদা রঙে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। শান্তিপূর্ণ মিছিলটি ঢাকা জিপিওর সামনে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি এলে স্বৈরশাসকের মদদপুষ্ট পুলিশ বাহিনীর গুলিতে নূর হোসেনসহ মোট তিনজন আন্দোলনকারী শহীদ হন, এ সময় বহু আন্দোলনকারী আহত হন। শহীদ অপর দুজন হলেন যুবলীগ নেতা নুরুল হুদা বাবুল এবং আমিনুল হুদা টিটু।

স্বৈরাচার এরশাদ পদত্যাগ করলে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকারব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এর এক বছর পর নূর হোসেনের মৃত্যুর দিনটি সরকারিভাবে পালনে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। দিনটিকে প্রথমে ঐতিহাসিক ১০ নভেম্বর দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হলেও আওয়ামী লীগ এটিকে শহীদ নূর হোসেন দিবস করার জন্য সমর্থন প্রদান করে এবং এই নামটি এখন পর্যন্ত বহাল রয়েছে। এরপর যেখানে নূর হোসেন শহীদ হয়েছিলেন; সে স্থান অর্থাৎ ঢাকার জিরো পয়েন্টকে নূর হোসেন চত্বর নামে নামকরণ করা হয়।

শহীদ নূর হোসেন সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেদিন আমরা যখন মিছিল শুরু করছিলাম; তখন নূর হোসেন আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি তাকে কাছে ডাকলাম এবং বললাম, তোমার গায়ের এই লেখাগুলোর কারণে পুলিশ তোমাকে গুলি করতে পারে। তখন সে তার মাথা আমার গাড়ির জানালার কাছে এনে বলল, আপা আপনি আমাকে দোয়া করুন। আমি গণতন্ত্র রক্ষায় আমার জীবন দিতে প্রস্তুত।’

নূর হোসেন শহীদ হওয়ার পর তৈরি করা হয়েছে নূর হোসেন ভাস্কর্য। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার নামে স্মারক ডাকটিিেকট প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতি বছরের ১০ নভেম্বর বাংলাদেশে নূর হোসেন দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এ ছাড়া তিনি যে স্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তার নামানুসারে সেই জিরো পয়েন্টের নামকরণ করা হয়েছে নূর হোসেন চত্বর। ১০ নভেম্বর তার মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে তোলা তার গায়ে লেখাযুক্ত আন্দোলনরত অবস্থার ছবিটি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে আজ অবধি বিবেচনা করা হয়।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

"