পর্যবেক্ষণ

মৃত্যুর মুখে বাগেরহাটের নদ-নদী

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

সাধন সরকার

দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা বাগেরহাটের নদ-নদীগুলো মরে যেতে বসেছে! স্বাধীনতার পর বাগেরহাটের নদ-নদী কেমন ছিল আর এখন কেমন আছে একটু চিন্তা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। বাগেরহাটের একটির পর একটি নদী দখল, দূষণ আর পলি পড়ে ভরাট হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু নদ-নদীগুলো বাঁচাতে পরিকল্পনামাফিক যেভাবে খনন করা ও ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার ছিল; সেভাবে নেওয়া যায়নি। চোখের সামনে জীবন্ত নদীগুলো তিলে তিলে মরে যেতে দেখলেও কর্তৃপক্ষ থেকে সেভাবে এগিয়ে আসা ও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বাগেরহাটের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নদ-নদীগুলো হলোÑ পুঁটিমারী, চিত্রা, কালীগঙ্গা, কুমারখালী, যুগীখালী, দোয়ানিয়া, কলমী, বেতিবুনিয়া, রাওতি, ছবেকী, কুচিবগা, বেমরতা, ভাষা, তালেশ^র, ভৈরব, বলেশ^র, রায়েন্দা, খোন্তাকাটা, কালীগঞ্জ, ভোলা, মংলা, দাউদখালী, বিশনা, পানগুছি, পশুর, বিশাখালী, দড়াটানা, ঘোসিয়াখালী, চাঁদপাই, কাকশিয়ালী, আঠারোবাঁকি। উল্লিখিত এসব নদ-নদীর অধিকাংশই পলি পড়ে ভরাট হয়ে শেষ প্রহর গুনছে! সত্যি বলতে, বাগেরহাটের এখনকার স্থানীয় তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসব নদ-নদীর নাম জিজ্ঞেস করলে অনেকেই বলতে পারবেন না! চিত্রা, পশুর, মংলা, ভৈরব, কালীগঙ্গা নদ-নদীগুলো শুধু বাগেরহাটের ওপর দিয়ে নয়, আশপাশের অন্যান্য জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং দখল, দূষণ আর পলি পড়ে ভরাট হওয়া সত্ত্বেও বয়ে চলেছে।

দক্ষিণাঞ্চলের একটি নদীর সঙ্গে আগে আরেকটি নদীর সংযোগ ছিল। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব, বাঁধ দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষ ও সময়মতো খনন না করার কারণে নদীগুলো ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে গেছে। অস্তিত্ব সংকটে ভুগতে থাকা বাগেরহাটের কোনো কোনো নদীতে হাঁটুপানি, কোনো নদীর বুকে এখন ধানখেত। নদী দখল করে চিংড়ি খামারসহ বাড়িঘর তৈরি করা হয়েছে এবং হচ্ছে। আবার কোনো কোনো নদ-নদীতে দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য ফেলার কারণে নদী খালে রূপ নিয়েছে! পলি পড়ে নদীর দুপাশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় সুযোগ কাজে লাগিয়ে নদীতীরের বাসিন্দারা চরের জমি যে যেভাবে পারছেন দখলে নিয়েছেন। অধিকাংশ নদীতে চর পড়ায় নদীর সঙ্গে সংযোগ থাকা বাগেরহাটের ছোট-বড় তিন শতাধিক খালও শুকিয়ে গেছে। খালগুলো শুকিয়ে যাওয়ার কারণে দেশি প্রজাতির অনেক মাছ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অধিকাংশ নদ-নদী ও তার সঙ্গে সংযোগ থাকা খালগুলো ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য যেমন নষ্ট হচ্ছে; তেমনি জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নদ-নদী ও খাল শুকিয়ে যাওয়ার কারণে স্থানীয় কৃষক চাষাবাদ করতে শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছেন না। আবার বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় প্রতি বছর কৃষকের ফসল পানিতে ডুবে যাওয়াসহ বাড়িঘরও তলিয়ে যাচ্ছে। যেসব নদ-নদী এখনো সচল আছে সেসব নদীতেও ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে উজানের পানি না আসায় জোয়ার-ভাটার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পলি পড়ে নদ-নদীগুলো ভরাটের কবলে পড়ছে। আবার অনেক সময় সমুদ্রের লোনা পানি দ্রুত ভাটায় নেমে গিয়ে চারপাশের ফসলি জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে ফসলি জমিতে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে। এতে করে ফসলি জমির উর্বরতা শক্তিও বিনষ্ট হচ্ছে। ফসলি জমি ও খাল ঘিরে বাঁধ দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষের ফলে আশপাশের ফসলি জমিতে স্বাভাবিকভাবে জোয়ারের পানি যাওয়ার পথও বন্ধ হয়ে গেছে।

একসময় বাগেরহাটের নদ-নদীর ওপর হাজার হাজার পরিবার নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে নদ-নদীগুলো পলি পড়ে ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়ায় জেলেরা তাদের দীর্ঘদিনের পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। একসময় এই নদ-নদীর সঙ্গে আশপাশের প্রায় সব জেলার নদ-নদীর সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সচল ছিল, লঞ্চ-স্টিমার চলত, কিন্তু নদ-নদী ভরাট হওয়ার কারণে আগের মতো অন্যান্য জেলার সঙ্গে নৌকা, লঞ্চ ও স্টিমার চলাচলে সংযোগ কাটা পড়েছে। একসময় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নৌবন্দর মোংলার সঙ্গে সারা দেশের সহজে কার্গো ভ্যাসেলসহ নৌ-চলাচল ছিল। কিন্তু নাব্য সংকটে এখন তা বন্ধ প্রায়! ঢাকার সঙ্গে বাগেরহাটের সরাসরি লঞ্চ সার্ভিস চালু ছিল। কিন্তু তা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। স্থানীয় এ জনপদের মানুষ এখন শুধু অতীত হাড়তে দীর্ঘশ^াস ছাড়েন! কেননা, যে বাগেরহাট একসময় নদ-নদী আর খাল-বিলে ভরপুর ছিল; সে জনপদ এখন জলাশয়হীন হতে চলেছে! সবুজ জনপদ এখন ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে! নদ-নদী, খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ার কারণে প্রকৃতি-পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। লবণাক্ততা বেড়ে কৃষিজমিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সব ধরনের জলাশয় আমাদের অর্থনীতি ও সার্বিক পরিবেশ টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদ-নদী দখল ভরাট করে কিছু লোক এর থেকে ফায়দা লুটতে সব সময় তৎপর! কিন্তু জাতীয় সম্পদ নদ-নদী টিকিয়ে রেখে সবারই সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা। এখন সারা দেশে নদ-নদী দখল-দূষণকারীদের তালিকা সরকারের কাছে রয়েছে। এখনই বাগেরহাটের নদ-নদী দখল-দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ধুঁকতে থাকা নদ-নদীর নাব্য সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পিতভাবে এখনই খননকাজ শুরু করতে হবে। তা না হলে সবুজ জনপদ ধীরে ধীরে শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হবে।

লেখক : পরিবেশকর্মী ও কলামিস্ট

সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

[email protected]

"